বহুমাত্রিক প্রতিভা : কবি সাংবাদিক ফখরে আলম

আপডেট: 06:43:09 01/06/2020



img

মো. মনিরুজ্জামান

বহুমাত্রিক প্রতিভায় ভাস্বর হয়ে উঠেছিলেন কবি ফখরে আলম। শুধু কবি নন, সমাজে তিনি সাংবাদিক, গবেষক, লেখক হিসেবেও সমধিক পরিচিত। তাঁর গ্রন্থ, কবিতায় দক্ষিণের মানুষকে ধারণ করেছিলেন, তাঁর প্রতিবেদনগুলোয় ছিল এ অঞ্চলের গণমানুষের কথা। ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা। বাংলাদেশে একজন সাংবাদিকের যশ, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা অনেকাংশেই নির্ভর করে রাজধানীকেন্দ্রিকতার ওপর। কিন্তু ফখরে আলম ছিলেন তার ব্যতিক্রম। তিনি শুধু দক্ষিণবঙ্গকে ভালই বাসেননি; আজীবন দক্ষিণজনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেছেন। আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লিখেছেন। কলম ধরেছেন এই জনপদের মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ, উন্নয়নের অসঙ্গতি, অচ্ছুৎ শ্রেণীর দুঃখ দুর্দশা নিয়ে।
সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মপরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। একদিকে মানুষের সমস্যাকে যেমন হৃদয় দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন-নিজের লেখনির মাধ্যমে সেগুলো তুলে ধরেছেন দেশ বিদেশের মানুষের কাছে, অন্যদিকে তাঁর সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু হয়েছে প্রকৃতি। ২০০২ সালে বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন নিয়ে একটি বহুমাত্রিক প্রতিবেদন করে তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর প্রতিবেদনে সর্বপ্রথম বিস্তারিতভাবে সুন্দরবনের ভূমি দখল, বৃক্ষ নিধন, বনদস্যু সমস্যা, প্রাণী পাচারসহ বন ধ্বংসের বিবিধ কার্যকরণের আদ্যোপান্ত প্রকাশ করেন। তাঁর দুঃসাহসিক লেখার মাধ্যমেই সুন্দরবনকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতার প্রকৃত চিত্র বাংলাদেশের মানুষের সামনে আসে।
সংবাদ যে শুধু প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া চমকপ্রদ বিষয়াবলী নয়, প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া অতি সাধারণ ঘটনাবলীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সামাজিক অসঙ্গতি, জনমানুষের নিরন্তর দুর্ভোগের করুণ চিত্র তা তাঁর তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলো দেখলেই বোঝা যায়।
এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৯৭ সালে প্রকাশ পাওয়া ঝিনাইদহ জেলার সুরাট নামক গ্রাম নিয়ে তাঁর প্রতিবেদনটি। সুরাট গ্রামের নারীদের অস্বাভাবিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করে রুঢ় সত্যকে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। একসময় বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে পর্যাপ্ত স্যানিটারি ল্যাট্রিনের অভাব ছিল। গ্রামের মানুষ জঙ্গলে ‘প্রকৃতির ডাকে’ সাড়া দিত। স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাব এবং গ্রামে জঙ্গল না থাকার কারণে সুরাট গ্রামের নারীরা প্রয়োজনের থেকে কম পানি পান করতো। ফলে তারা আক্রান্ত হতো নানা রকম শারীরিক জটিলতায়। এভাবেই ফখরে আলম সমাজের মধ্যে মিশে গিয়ে সমস্যাকে ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন। মানুষের কষ্টকে হৃদয়ে ধারণ করে তা পৌঁছে দিতেন দেশবাসীর কাছে। সুরাট গ্রামে তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি পরিবার পরিকল্পনা পুরস্কার ১৯৯৭ পান। সরকার গ্রামের সমস্যা সমাধানেও উদ্যোগী হয়।
এ তো গেল গ্রামীণ নারীর দুর্ভোগের কথা। আবহমান বাংলার নারীদের বৈষম্যের নানা দিক নিয়েও তিনি সোচ্চার ছিলেন। তাঁর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে দক্ষিণবঙ্গের একটি ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের কোন নারী কোনদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেনি। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকার ভোটাধিকারবঞ্চিত নারীদের ভোট প্রদান নিশ্চিত করে; তিনি লাভ করেন মোনাজাত উদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটে উৎপাদিত বাগদা চিংড়ির নামডাক বিশ্বজোড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে নোনা পানির এই চিংড়ি 'হোয়াইট গোল্ড' বা সাদা সোনা নামে সমাদৃত। অথচ বহুদিন আগে ফখরে আলম দেখিয়েছিলেন কৃষি জমিতে চিংড়ি চাষ কীভাবে দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে; যা আজ নিদারুণ বাস্তবতা। এভাবেই তিনি একদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে ঘটনার পিছনের ঘটনাকে উন্মোচন করেছেন। অন্যদিকে সন্ত্রাস, যৌতুকের মতো সামাজিক ঘুণপোকার বিরুদ্ধে লড়েছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রায় সব-কয়টা প্রথম সারির পত্রিকায় কাজ করেছেন।
কর্মজীবন শুরু করেছেন ১৯৯১ সালে আজকের কাগজ পত্রিকার যশোর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে। তারপর ভোরের কাগজ, যায়যায়দিন, বাংলাবাজার পত্রিকা, মানবজমিন, আমাদের সময়ে কাজ করেছেন। আমৃত্যু কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন। ফখরে আলম বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। সাংবাদিকতা তাঁর পেশা হলেও কবিতা ও গবেষণা তাঁর প্যশন (অনুরাগ)। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৪টির মতো। বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী এবং প্রাচীনতম জেলা যশোর। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। 'যশোরের ভাষা আন্দোলন' নামক গবেষণা গ্রন্থে তিনি ভাষা আন্দোলনের এক অজানা অধ্যায়কে পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসেন। ভাষা আন্দোলনের প্রচলিত ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি দেখান- দেশভাগের ঠিক আগে ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত 'স্বাধীনতা' পত্রিকায় চিঠি লিখে প্রস্তাবিত স্বাধীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার প্রস্তাব করেন তৎকালীন মাইকেল মধুসূদন (এম এম) কলেজের শিক্ষার্থী হামিদা রহমান। অর্থাৎ হামিদা রহমানই রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রথম প্রস্তাবক।
১৯৪৮ সালের মার্চে ছাত্র ধর্মঘট, হরতাল ও পুলিশের গুলির মাধ্যমে যশোর থেকেই সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলনের শুরু হয়। এ প্রেক্ষাপটে পরবর্তীতে উর্দুর পক্ষে কার্জন হলে জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভাষা আন্দোলন প্রকৃত রূপ লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও তিনি বিস্তর লেখালিখি করেছেন। কিন্তু, তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রাজা মহারাজাদের বদলে স্থান পেয়েছে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার চঞ্চলা কিশোরী আসমার কাহিনী। সেই আসমা যে একাত্তরের মার্চে ভালবেসে ওহিউদ্দিন নামক এক যুবককে বিয়ে করেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন যোদ্ধা ওহিউদ্দিন যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর ১৬ ডিসেম্বর আসমা মা হয়। স্বামীকে ভালবেসে বিধবা আসমা আজীবন ওহিউদ্দিনের ছবির সাথে সংসার করেছে। ফখরে আলমের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আছে একাত্তরের ছোট্ট রাহেলার গল্প- যাকে রাজাকারেরা গুলি করলে তা শিশুটির মুখে লাগে। যার ফলে দীর্ঘ ৪৪ বছর রাহেলা আর হা করতে (মুখ খুলতে) পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধ কোন ঐতিহাসিক কালপরম্পরা নয়, মুক্তিযুদ্ধ শত সহস্র বিভৎস ঘটনাপঞ্জির জীবন্ত ক্ষত। ফখরে আলমের লেখায় তা ফুটে উঠেছে নিদারুণভাবে।
তাঁর মতে "মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাস অনেক বড়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শেষ নেই। একাত্তরের নয় মাসের সেই কাহিনী মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে লেখা রয়েছে। আমি সেই কাহিনী জানবার চেষ্টা করেছি। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে জানতে পেরেছি, গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের জানা অজানা নানা বিষয়।" তিনি কুষ্টিয়ার কোহিনুর ভিলার কথা বলেছেন; যে বংশের সবাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তিনি বলেছেন বিদেশি মুক্তিযোদ্ধা উডারল্যান্ড, মারিনো রিগান, মোহাম্মদ আলীর কথা; বাঙালি জাতি যাঁদের বীরত্বের কাছে চিরঋণী।
কবিতা নিয়ে স্বতন্ত্র ভাবনা ছিল কবি ফখরে আলমের। আবহমান বাংলার রূপ, রস, যশ, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ফিকে হয়ে আসা- কবি হৃদয়ের ক্ষত হয়ে অসহায় আকুতির মতো ঝরে পড়েছিল তাঁর ছন্দময় মাতৃভাষায়; যশুরে বাংলায়। তাঁর ভাষায়, "বাঙালি কনে হারালি সেই হণ্যের বিল, হারায় গেল কুঁকড়োর ছা হারামজাদা চিল।" তিনি ধ্বংসাত্মক সভ্যতার অগ্রগতিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন, "চুচড়ো মাছ কনে পাব গাঙে পানি কই? ও পিরিতির সই" যশোরের চাঁচড়ার মুক্তেশ্বরী পাড়ে জন্ম নেওয়া কবি কবিতার মাঝেই খুঁজতে চেষ্টা করেছেন বহমান নদীর লুপ্ত স্রোত। তাঁর মতে, "কবিতা কবিতাই। কাছে দূরের আকাশে কবিতা নক্ষত্রের মতো জ্বলে। রাতেও জ্বলে, দিনেও জ্বলে। অনেকে কবিতায় সঞ্জিবনী সুধার স্বাদ পান। নিজের ভিতর জেগে ওঠেন।" স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় কবি তাঁর ব্যাঙ্গাত্মক শেল ছুঁড়ে দিয়েছিলেন স্বৈরাচারী গণহন্তারকের দিকে। আবার তীব্র হৃদয় দহন নিয়ে যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধার মতো খুঁজে ফিরেছিলেন পাতাসীদের। "তুই কনেরে পাতাসী তুই কনে? সেই কাটাল চাপায় ফুলির উৎসোব জুট শালিকির বাসায় নতুন কুটুম মাইকি নেতাইগের ভাষণ ঘরের কানাচি সুনাইর নোইদ তুই কনেরে পাতাসী তুই কনে?" পাতাসী সাড়া দেয় না, পাতাসীর মতোই নিঃসাড় হয়ে যান কবি। রৌদ্রস্নাত এক বৈশাখী সকালে চিরস্তব্ধ হয়ে যান দক্ষিণের জানালা বহুমাত্রিক লেখক ফখরে আলম।

[লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক]