বাইডেন জমানায় বিশ্বব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হবে কি?

আপডেট: 12:55:54 10/11/2020



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনামলে আমেরিকার সঙ্গে বাকি বিশ্বের সম্পর্ক ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরান, সৌদি আরব, ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন নিয়ে মি. ট্রাম্পের নীতি কি বদলে দেবেন জো বাইডেন? ওই দেশগুলোই বা যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পট পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছে?

চীন
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বড় গলা করে বলেছিলেন কীভাবে চকলেট কেক খাওয়ার ভেতর দিয়ে তিনি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন। কিন্তু দ্রুত কথিত এই বন্ধুত্ব ধসে পড়ে, এবং কয়েক দশকের মধ্যে চীন-মার্কিন সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
চীনকে এক হাত নেওয়ার কোনো সুযোগ সাম্প্রতিক সময়ে মি. ট্রাম্প ছাড়েননি। করোনাভাইরাস প্যানডেমিকের জন্য এককভাবে তিনি চীনকে দায়ী করেছেন। করোনাভাইরাসের নাম দিয়েছেন ‘চায়না ভাইরাস' এবং চীনের ওপর একের পর এক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জো বাইডেন কি আলাদা কিছু করবেন? যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বিষয়ক বিবিসির সংবাদদাতা বারবারা প্লেট উশের মনে করেন, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং চীনের “অন্যায় বাণিজ্য নীতির'' শক্ত বিরোধিতার নীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে তার মতে, ‘সুর এবং কৌশলে' হয়ত কিছু বদল দেখা যেতে পারে।
বারবারা প্লেট বলছেন, মি ট্রাম্প যেমন এককভাবে চীনকে চাপে রাখার চেষ্টা করে গেছেন, চাপ দিয়ে বাণিজ্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, জো বাইডেন হয়তো চীন বিরোধিতায় মিত্রদের আরো সম্পৃক্ত করতে চাইবেন। একইসঙ্গে তিনি হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার রাস্তা খুঁজবেন।
বেইজিং থেকে বিবিসির জন সাডওয়ার্থ বলছেন, চীনা নেতাদের জন্য জো বাইডেনের বিজয় আরেকটি চ্যালেঞ্জ সামনে এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক চীনা বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্পের পরাজয়ে হয়তো চীনা নেতৃত্ব ভেতরে ভেতরে কিছুটা অখুশি। এটা নয় যে, তারা মি ট্রাম্পকে পছন্দ করেন, কিন্তু চীনা নেতারা মনে করেন তিনি আরো চার বছর ক্ষমতায় থাকলে আমেরিকার ভেতর বিভেদ বাড়তো এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে আমেরিকা আরো বিচ্ছিন্ন হতো।''
তবে মি. সাডওয়ার্থ বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় ইস্যুতে জো বাইডেন সহযোগিতার যে কথা বলছেন, সেই সুযোগ হয়তো চীন নেওয়ার চেষ্টা করবে, কিন্তু বিশ্বজুড়ে নতুন করে মিত্রদের সাথে শক্ত জোট তৈরির যে প্রতিশ্রুতি মি. বাইডেন দিয়েছেন সেটা চীন তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসাবে দেখছে।
মি. ট্রাম্পের “একা চলো'' নীতিই চীনা নেতাদের কাছে কম বিপজ্জনক ছিল। আর এ কারণেই হয়তো এখনো তারা মি. বাইডেনকে অভিনন্দন বার্তা পাঠাননি।

রাশিয়া
চীনের মতো রাশিয়াও এখন পর্যন্ত মি. বাইডেনের বিজয় নিয়ে চুপ।
বিবিসির বারবারা প্লেট মনে করেন, মি. বাইডেনের বিজয়ের ফলে শীর্ষ নেতৃত্ব স্তরে রুশ-মার্কিন সম্পর্ক বদলে যাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর অনেক নিষেধাজ্ঞা চাপালেও ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যাপারে চুপচাপ থাকতেন। একাধিকবার খোলাখুলি বলেছেন তিনি পুতিনকে পছন্দ করেন।
কিন্তু পুতিন সম্পর্কে বাইডেনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই অন্যরকম হবে।
সিএনএন টিভিকে তিনি বলেছেন, রাশিয়াকে তিনি “বিরোধী পক্ষ'' বলে মনে করেন, এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যদের টার্গেট করার জন্য তালেবানকে পয়সা দেওয়ার যে অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে উঠেছে তার শক্ত জবাব তিনি দেবেন।
বারবারা প্লেট বলেন, “রাশিয়ার ওপর মি. ট্রাম্পের চাপানো নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত তো থাকবেই সেই সঙ্গে মি. বাইডেন রাশিয়ার নীতিতে আরো স্পষ্ট হবেন।''
তবে অস্ত্র সীমিতকরণ চুক্তিতে মি. বাইডেন মস্কোর সঙ্গে কথা বলার পক্ষে।
কিন্তু রাশিয়া মি. বাইডেনের বিজয়কে কীভাবে দেখছে?
মস্কো থেকে বিবিসির স্টিভেন রোজেনবার্গ এ প্রসঙ্গে রুশ একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় উদ্ধৃত করেন : “ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা-রাশিয়া সম্পর্ক সাগরের তলে গিয়ে ঠেকেছে। আর মি. বাইডেন হলেন ড্রেজারের মতো, যিনি সাগরের তল খুঁড়ে ওই সম্পর্ক আরো নীচে নিয়ে যাবেন।''
স্টিভেন রোজেনবার্গ বলেন, মি. বাইডেনের বিজয়ে “মস্কো একবারেই খুশি নয়।''
তবে ওই সংবাদদাতার মতে, অনেক রুশ বিশ্লেষক বলছেন, একটি ইতিবাচক দিক হলো, মি. বাইডেনকে বোঝা সহজতর হবে। এবং সে কারণে নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির মতো ইস্যুতে আপস-মীমাংসা করাটা সহজ হবে।
“মস্কো হয়তো চেষ্টা করবে ট্রাম্প জমানা পেছনে রেখে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে একটি কাজের সম্পর্ক তৈরি করতে, তবে তাতে সাফল্যের কোনোই গ্যারান্টি নেই।''

ভারত
ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত কমলা হ্যারিসের মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় ভারত গর্বিত, উল্লসিত, কিন্তু দিল্লিতে বিবিসির রজনী বৈদ্যনাথন বলছেন, ট্রাম্পের কাছ থেকে যেমনটা পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি, হয়তো জো বাইডেনের কাছ থেকে তিনি তেমন উষ্ণ আচরণ দেখবেন না।
তবে ভারত বেশ অনেকদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সহযোগী, এবং সেই নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। চীনের মোকাবেলাসহ আমেরিকার ভারতও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশল বাস্তবায়নে এবং সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান একটি সহযোগী দেশ হিসেবেই থাকবে বলে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন।
তারপরও মিজ বৈদ্যনাথনের মতে, মি. বাইডেন ও নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নে অস্বস্তি থাকবে।
ভারতে মুসলিমদের বিষয়ে বিতর্কিত নীতি নিয়ে মি. মোদিকে সরাসরি কোনো কথা বলেননি মি. ট্রাম্প। কিন্তু মি. বাইডেন হয়তো এ ব্যাপারে সরব হবেন। জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণা সম্পর্কিত ওয়েবসাইটে ভারতে বিতর্কিত এনআরসি এবং নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) সমালোচনা রয়েছে। এছাড়া, কাশ্মীরিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে।
এমনকি আধা-ভারতীয় কমলা হ্যারিসও ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন দলের অনেক নীতির খোলাখুলি সমালোচনা করেছেন।

ইরান
নির্বাচনের আগে থেকেই জো বাইডেন বলছেন, জিতলে তিনি ইরানের সঙ্গে ছয় দেশের করা পারমাণবিক চুক্তিতে আবারো যোগ দেবেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার উদ্যোগে এই চুক্তি হলেও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তি থেকে বের হয়ে আসেন। তার যুক্তি, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে নিরস্ত করা সম্ভব নয়।
মি. ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকেই শুধু আমেরিকাকে বের করে আনেননি, সেই সঙ্গে ইরানের ওপর একের এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছেন, যার ফলে ইরান ওই চুক্তির অনেক শর্ত বাতিল বলে গণ্য করছে।
জো বাইডেন বলছেন, ইরানের ওপর এই চাপের কৌশল কাজে লাগেনি এবং মি. ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় আসেন তখনকার চেয়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে আরো অগ্রসর হয়েছে।
বিবিসি ফারসি ভাষা বিভাগের কাসরা নাজি বলছেন, নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও ইরানি জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে হত্যার পর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো মীমাংসায় বসা ইরানের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। তিনি মনে করেন, মি. বাইডেনের বিজয়ে সেই সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি।
তবে কাসরা নাজি বলেন, ইরানের কট্টরপন্থীরা খুব সহজে টেবিলে বসতে চাইবেন না। নির্বাচনের আগে আয়াতোল্লাহ খামেনি বলেন, মার্কিন নির্বাচনে ইরানের কিছু যায় আসে না।
তিনি বলেন, “ইরান একটি যৌক্তিক এবং সুচিন্তিত নীতি অনুসরণ করছে, ওয়াশিংটনে ব্যক্তির পরিবর্তনে সেটা বদলাবে না।''

সৌদি আরব
ওয়াশিংটন থেকে বিবিসির বারবারা প্লেট বলছেন, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বে যুদ্ধের প্রতি আমেরিকার সমর্থন প্রায় নিশ্চিতভাবে প্রত্যাহার করবেন জো বাইডেন।
"বেসামরিক লোকজনের মৃত্যু, মানবিক বিপর্যয়ের কারণে ইয়েমেনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।''
ওয়াশিংটনে গবেষণা সংস্থা আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনসটিটিউটের মেরি ড্যানিয়েল প্লেটকা বলেন, “ মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়তো দেখা যাবে না, কিন্তু সৌদি আরবের কাছ থেকে একটু দূরে সরে যাওয়া এবং ইরানের সঙ্গে আলাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।''
জো বাইডেন সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়াতে পারেন এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে আমেরিকার সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারেন।
ঢাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. আব্দুর রব খানও মনে করেন, জো বাইডেন সৌদি আরবের ব্যাপারে একটি শক্ত অবস্থান নেবেন।
“ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে একরকম মাথায় তুলে রেখেছিলেন, যে কারণ মধ্যপ্রাচ্যে একটা শক্ত মেরুকরণ শুরু হয়েছে। মি. বাইডেন সেটা বদলের চেষ্টা করবেন,'' বলেন তিনি।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন
জো বাইডেন ইসরায়েল এবং ইউএই-এর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের চুক্তিকে সমর্থন করেছেন। তিনি সবসময়ই ইসরায়েলের বড় একজন সমর্থক। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নীতি বিষয়ক নথিপত্রে ‘দখল' (ফিলিস্তিনি জমি) শব্দটি ব্যবহার হয়নি কখনই।
তবে বিবিসির বারবারা প্লেট বলছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীর বিষয়ে ট্রাম্পের নীতি জো বাইডেন অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করবেন না। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি বেআইনি নয় বলে মি. ট্রাম্প যে নীতি নিয়েছিলেন মি. বাইডেন তাতে সায় দেবেন না।
বারবারা প্লেট বলেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামঘেঁষা অংশ এখন ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে অনেক বেশি সরব এবং জোটবদ্ধ। এবং জো বাইডেনের পক্ষে সে কারণে মি. ট্রাম্পের মতো শর্তহীনভাবে ইসরায়েলের পক্ষে কথা বলা কঠিন।
জেরুসালেম থেকে বিবিসির টম বেইটম্যান লিখছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বদলে নতুন নীতি আসবে বলে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
মি. ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে স্পষ্ট মেরুকরণের নীতি অনুসরণ করছিলেন, যার একপক্ষে ইরান আর অন্যদিকে ইসরায়েল-সৌদি আরব-মিশর-ইউএই। কিন্তু জো বাইডেন হয়তো বারাক ওবামার মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ফিরবেন, এবং ইরানকে একঘরে করে ফেলার বদলে তাদের সঙ্গে কথাবার্তার পথ নেবেন।
তবে টম বেইটম্যান বলছেন, এই সম্ভাবনায় ইসরায়েল ছাড়াও ইরান, সৌদি আরব এবং ইউএই'র মতো উপসাগরীয় কিছু দেশ উদ্বিগ্ন। একজন ইসরায়েলি মন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, মি. বাইডেনের নীতির ফলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ছাড়া ইসরায়েলের হাতে কোনো পথ থাকবে না।
ইসরায়েলের সঙ্গে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সম্পর্ক তৈরি নিয়ে জো বাইডেনের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে তিনি ইসরায়েলের কাছ থেকে ছাড় চাইবেন। জো বাইডেনের বিজয়ে পশ্চিম তীরে অধিকৃত ভূমি পাকাপাকিভাবে দখলের সম্ভাবনা হয়তো এখন অনেক কমে যাবে, এবং নতুন করে ইহুদি বসতি নির্মাণে রাশ টানতে হয়তো বাধ্য হবে ইসরায়েল।
তবে ড. আব্দুর রব খান বলেন, “ইসরায়েল চটে যাবে, কোণঠাসা হবে, এমন কোনো পথে জো বাইডেন যাবেন বলে আমি মনে করিনা।''
জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর যে স্বীকৃতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তা কি বদলে দেবেন জো বাইডেন? সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন