বিএনপি নেতাদের রক্ষায় কৃষি কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ!

আপডেট: 06:29:42 16/11/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোরের চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ডিলারদের সার বিক্রি করতে কড়াকড়ি আরোপ করায় ব্যাপক তদবিরের মাধ্যমে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করানো হয়েছে।
উপজেলার বিসিআইসি সার ডিলার কয়েক বিএনপি নেতাকে বাঁচাতেই উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা এ তদবির করিয়েছেন। এজন্য একজন জনপ্রতিনিধিকে মোটা অংকের অর্থও দেওয়া হয়েছে।
এরআগে ডিলারদের অব্যাহত হুমকির প্রেক্ষিতে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে চৌগাছা থানায় জিডিও করেছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
গত ৯ নভেম্বর এই অফিস আদেশ হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আসাদুল্লাহ আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ১২ নভেম্বর। আদেশে লেখা রয়েছে এটি স্ট্যান্ড রিলিজ বলে গণ্য হবে। একই আদেশে রইচ উদ্দিনের পূর্বেই চৌগাছায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী বর্তমানের মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম শাহাবুদ্দিন আহমেদকে চৌগাছায় কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়েছে। ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় তাকেও সেই সময় স্ট্যান্ড রিলিজ করিয়েছিলেন চৌগাছার সার ডিলাররা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মেনে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রিসহ নানা অভিযোগে উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও উপজোলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাবেক সেক্রেটারি ইউনুচ আলী দফাদারের ডিলারশিপসহ তিন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ করে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। ওয়ান ইলেভেনের সময়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে উপজেলার এই বিএনপি নেতা ইউনূচ আলী দফাদার গ্রেফতার হয়ে জেলও খাটেন।
বাতিলের সুপারিশকৃত অন্য দুই ডিলার হলেন পাতিবিলা ইউনিয়নের সার ডিলার ফরিদুল ইসলামের মালিকানাধীন  মেসার্স ফরিদুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা আতিকুর রহমান লেন্টুর মালিকানাধীন মেসার্স শয়ন ট্রেডার্স। এদের মধ্যে শয়ন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে উপজেলার বাইরে বিক্রি করে দেয়া, অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি, মূল্য তালিকা না টাঙানোসহ ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ আগস্ট ১৭ মেট্রিকটন ডিএপি সার উত্তোলন করার আগমনী বার্তা দিয়েও সার গুদামে না তোলায় তার বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও তিনি নিবৃত হননি। এছাড়া ইউনুচ আলী ও ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন (৫০ মেট্রিক টন) গুদাম না থাাকা, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র না থাকা, উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া, ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৩ অক্টোবর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে তিন ডিলারের অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত গৃহিত হওয়ার পরপরই মোটা অংকের টাকা নিয়ে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে তদবির করতে থাকেন অভিযুক্ত সার ডিলাররা। এরপর ওই সিদ্ধান্তের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করা হবে বলে যশোর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনও সেই কমিটির একজন সদস্য।
সেই তদন্ত এখনো সম্পন্ন না হতেই তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বিশেষ বদলি নিয়ে উপজেলার সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে তদন্তে অপরাধী বিএনপি নেতাদের ডিলারশীপ বাঁচাতেই অনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি অফিসারকে বদলি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান বলেন ‘চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন একজন সৎ কর্মকর্তা। তিনি সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের হাতে সার পৌছাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। এতে দুর্নীতিবাজ সার ডিলাররা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। কৃষি কর্মকর্তা যে সৎ অফিসার সেটা ডিলাররাও বারবার দাবি করছেন। আবার তারাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে অনৈতিকভাকে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করিয়েছেন। তিনি বলেন, এভাবে যদি সৎ এবং সরকারের ভাবমূর্তি উন্নয়নকারী কর্মকর্তাদের ভাল কাজের পুরস্কারের পরিবর্তে ভোগান্তিমূলক বদলি করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর ভালো কাজ করতে চাইবেন না।’
উপজেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ইউনূচ আলী দফাদার বলেন, ‘১৯৯৫-৯৬ সাল থেকে আমি উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আর মাসুদ (উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী) সেক্রেটারি। আমাদের কৃষি অফিসার খুব সৎ লোক। যে আইন আছে, তাতে প্রাকটিক্যালি তো সব কাজ করা যায় না। যেমন আমি গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছি সিংহঝুলি, রোডের গায়ে তিনটে দোকান আছে। আমরা সেখানে সার নামিয়ে দেব উনি সেটা মানবেন না। মানে উনি শতভাগ নিয়ম মানতে চান, কিন্তু মানবিক দিক তো আছে। নিজেদের গুদামে সার নামিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের ঘরে বিক্রি করলে আমাদের বাড়তি লেবার ও বহন খরচ হয়।'
তিনি বলেন, 'আমরা আগেও নিয়ম মেনে চলতাম, এখনো নিয়ম মেনে চলছি। তবে কৃষি অফিসারকে বদলির পিছনে আমাদের কোনো হাত নেই। এত টাকা আমরা কোথায় পাবো?'
তিনি আরো বলেন, কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দরখাস্তে ১৬ জন ডিলারেরই স্বাক্ষর আছে। আমার স্বাক্ষর করা অনেকটা অনুরোধে ঢেকি গেলা।
উপজেলা সার ডিলার সমিতির সেক্রেটারী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ফুলসারা ইউপি চেয়ারম্যান মেহেদী মাসুদ চৌধুরী বলেন, কৃষি অফিসার বদলি হয়েছে আমরা শুনিনি।
তার বদলির পেছনে আপনার হাত আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'নিশ্চিত থাকেন এতে আমার হাত নেই। কেন আমি বদলি করবো? আমি বদলি করলে তো আরেকজন আসবে নিয়মানুসারে। আমি অফিসার বদলির পক্ষে নই। আর ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন চাইলে তো কারো পোস্টিং হবে না।'
উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি করি। আমাদের বদলি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার পৌছাতে গিয়ে এমন অর্ডার হওয়ায় কিছুটা হতাশ হয়েছি। এমন হলে ভালো কাজে উৎসাহ হারিয়ে যায়। আবার যারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ঠ করতে অনিয়ম করছে তারা আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়।’

আরও পড়ুন