বিক্ষিপ্ত ভাবনা-১: বাগধারা সমাচার

আপডেট: 01:01:55 04/07/2021



img

আহসান কবীর

আমার সিদ্ধান্তগুলো এমনই হয়। অকস্মাৎ। অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবেই। এতে বেশিরভাগ সময় ক্ষতিই হয়। জানি না এবারের সিদ্ধান্ত কী ফল দেবে।
মাসখানেকের কিছু কম সময়জুড়ে ভোটে মেতে ছিলাম নিরবচ্ছিন্ন। ভোটের সময় যত এগিয়ে আসছিল, চিত্ত ততই বিচলিত হয়ে উঠছিল। মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কা। একের পর এক সহকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। ঠিক কী কারণে এমনটি হচ্ছে সেই সম্বন্ধে নিশ্চিত না হলেও অনুমান করতে পারছিলাম, নির্বাচন উপলক্ষে ক্লাবভবনে অস্বাভাবিক ভিড় বেড়ে যাওয়া এবং ফলস্বরূপ শারীরিক দূরত্ববিধি না মানার কারণে এই দুর্যোগের উদ্ভব।
২৬ জুন কার্যনির্বাহী কমিটি সভায় বসলো। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো- আপাতত ভোট নয়। আগে জীবন বাঁচাতে হবে।
সিদ্ধান্তটা মূলত তখনই নিয়ে ফেললাম। হাতের কিছু কাজ সেরে ক্লাব-সেক্রেটারির কক্ষ থেকে নিচে নামার সময় ফোন দিলাম সভাপতিকে। জানালাম- আপাতত ক্লাবে আর আসছি না। স্বেচ্ছানির্বাসন যাকে বলে। সভাপতি ইতিবাচক মত দিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নোটিস দিলাম। ইদানীং যেকোনো মেসেজ সবাইকে জানানোর এটাই সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।
এবার বাইক নিয়ে সোজা বাড়ির পথে। ফেরার পথে ভাবছিলাম, অখণ্ড অবসরে কিছু পড়ালেখা করতে হবে। বিষয়- ন্যায়শাস্ত্র। সাংবাদিকদের পড়াশুনার রেওয়াজ তো উঠেই গেছে। ক্ষুণ্নিবৃত্তির প্রাণপণ প্রয়াস আর নানা বৈষয়িক টানাপড়েনে শিকেয় উঠেছে জ্ঞানচর্চার চেষ্টা।
বাড়িতে ফিরে আহার সেরেই খুঁজতে লেগে গেলাম ন্যায়শাস্ত্রবিষয়ক বইপত্র। কিন্তু হায়! আমার সংগ্রহে এই সংক্রান্ত কোনো কিতাবের সন্ধান মিললো না। মুহূর্তে হতাশা গ্রাস করলো।
বিছানায় চিৎ হয়ে চোখ বন্ধ করে কিঞ্চিৎ বিশ্রামে ছিলাম। পুত্রধন এই সুযোগে হাতিয়ে নিল মোবাইলখানি। যাক, ভালোই হলো। আধুনিক এই যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে সবচাইতে সমস্যা হলো, এটা মানুষকে একটু বিশ্রামও নিতে দেয় না।
কানের কাছে রিংটোন না বাজায় অল্পসময়ের মধ্যে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লাম। সত্যি বলতে কি আমি আর পারছিলাম না। বৈতরণী পার হতে ভণ্ডামি-নষ্টামি, মিথ্যাচার-ষড়যন্ত্র বীতশ্রদ্ধ করে তুলছিল।
ঘুম থেকে উঠে ঠাহর করলাম সন্ধ্যা পার হয়েছে বেশ আগেই। উদ্বিগ্ন স্ত্রীর জিজ্ঞাস্য- ‘ভর সন্ধ্যায় ঘুমালে যে! শরীর খারাপ লাগছে?’
কোনও জবাব না দিয়ে এক কাপ লাল চা চাইলাম। দ্রুতই রেডি হলো। গরম চা স্নায়ু উদ্দীপ্ত করে। হলোও তাই। সন্তানের সাথে খানিকটা খুনসুটির মাঝে অজান্তেই একটি বাক্য নির্গত হলো, যাতে বহুল প্রচলিত একটি বাগধারা ছিল। ছেলের প্রশ্নে অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম। এরই মধ্যে ভাবনার মোড় ঘুরে গেল- ন্যায়শাস্ত্র না হয় না-ই পড়তে পারলাম; বাঙলাভাষায় অনেক বাণী-বচন, বাগধারা-উপমা রয়েছে- যা খুবই অর্থপূর্ণ। যুগের পর যুগ মানুষ এগুলো ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করে চলেছে। সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধেও এগুলোর ব্যবহার ভীষণ কার্যকর। ভাবতে ভাবতেই ফেসবুক ওয়ালে একটি বাগধারা লিখে ফেললাম। বন্ধুরা একের পর এক কমেন্ট করতে থাকলেন। কেউ কেউ সমসাময়িক নানা বিষয়ের সঙ্গে এই লেখার তাৎপর্য খুঁজলেন। কারও কারও উর্বর মস্তিষ্ক ওয়ালে এই বাগধারা আপ করার শানে নুজুল নিয়ে গবেষণায় মাতলো।
মজাই পাচ্ছিলাম। পরদিন একটি এবং তারও পরদিন আরেকটি বাগধারা আমার ওয়ালে শোভা পেল।
কিন্তু যে অখণ্ড অবসরের কথা বলছিলাম, তা হয়তো আমার কপালে নেই। কেরানিগিরি শুরু করেছি সেই আড়াই দশক আগে; যা আজও চলছে। মাঝে কিছুদিন দুইজন সহকর্মী কাজটা খানিকটা সামলালেও ‘ভোটের যথেচ্ছাচারে’ তারা শয্যাগত। কী আর করা! দিন-রাতের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে কম্পিউটারের বোতাম টিপে।
এর মাঝেও লেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তার জন্য যে পরিবেশ দরকার, সেটার অভাব সত্ত্বেও। নতুন এক উৎপাত শুরু হয়েছে- সারমেয়দলের জান্তব চিৎকার। বিশেষ মওসুম চলছে কি-না!
প্রাণিকুলের মধ্যে মনুষ্যতর শ্রেষ্ঠ আর নেই। তবে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ দাবিদারদের মধ্যেও যে আমরা কেউ কেউ ইতরপ্রাণীর চেয়ে অধম, তা আমাদের কথাবার্তা, চাল-চলনে স্পষ্ট দৃশ্যমান।

লেখক: সম্পাদক, সুবর্ণভূমি ও প্রেসক্লাব যশোর

আরও পড়ুন