বিক্ষিপ্ত ভাবনা-২: ক্ষমা করো প্রিয় সহকর্মী

আপডেট: 03:33:49 05/07/2021



img

আহসান কবীর

এক. সক্রিয়ভাবে রাজনীতির মাঠে ছিলাম প্রায় দেড় দশক। বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতি ভুল না ঠিক ছিল, সে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করি, ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও গণসংগঠনে কাজ করার সুবাদে জীবনে অনেক কিছু শিখেছি; যার একটি হলো শৃঙ্খলা, আরেকটি হলো সংগঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী কাজ করা।
বর্তমানে আমি যে ক্লাবের নির্বাহী প্রধান, সেটি কমিউনিস্ট পার্টি না। ফলে এখানে অতো শৃঙ্খলা মেনে চলার দায় নেই। কিন্তু প্রথম জীবনের শিক্ষা তো কিছু না কিছু থেকেই যায়। ফলে আমি কার্যনির্বাহী কমিটির আলোচনা কখনো বাইরে প্রকাশ করি না। তবে যেসব সিদ্ধান্ত জানাতে বাধা নেই, সেগুলো জানাই নির্দ্বিধায়। কিন্তু এখন এমন একটি অবস্থার মুখোমুখী যে, কিছু কথা না বললে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। গোয়েবলসীয় প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও। সহকর্মীরা নিশ্চয় পরিস্থিতি বুঝবেন এবং আমাকে ক্ষমা করবেন।

দুই. আমাদের কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ দুই বছর। এর মধ্যে একবছরেরও বেশি সময় মহামারি বিরাজমান। ফলে গঠনতন্ত্র মোতাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির আরো দুই মাস দায়িত্ব পালনে বাধা নেই।
কমিটির মেয়াদ যখন শেষের পথে তখন বিষয়টি আলোচনায় এলো। করোনা পরিস্থিতি তখন খানিকটা নিয়ন্ত্রণে। আমি প্রস্তাব করলাম মেয়াদ না বাড়িয়ে যথাসময়ে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের। কিন্তু কমিটির মত ভিন্ন। ফলে দুই মাস বাড়তি দায়িত্ব পালনের এবং এরই মধ্যে সাধারণ সভা ও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হলো।
যথাসময়ে সাধারণ সভা হলো। ন্যায্য-অন্যায্য অনেক গাল-মন্দ হজম করলাম। সম্ভবত এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এবারের সাধারণ সভায়ই প্রথম সম্পাদক কোনো সমালোচনার ব্যাখ্যা দিলেন না। সেটাও আমাদের কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক। অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। কমিটির সভায় তা প্রকাশও করেছি। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি, শৃঙ্খলা রক্ষার বাধ্যবাধকতা আমি তখনও মেনেছি শতভাগ।
যাই হোক, কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত বদলে সাধারণ সভা নির্বাচনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করে দিলো। সেই অনুযায়ী প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে একের পর এক বিপর্যয়কর সংবাদ আসতে থাকলো। প্রথমে খবর এলো, ক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং এই মুহূর্তে যশোরে কর্মরত জ্যেষ্ঠতম সাংবাদিক একরাম-উদ-দ্দৌলা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। তার বয়স সত্তরের কোঠায়। ফলে বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। এরপর সিনিয়র সদস্য বিএম আসাদ, দপ্তর সম্পাদক তৌহিদ জামান ও সাবেক কোষাধ্যক্ষ জুয়েল মৃধার অসুস্থতার খবর এলো একের পর এক। এই তিনজনকে প্রবীণ বলা চলে না। এরা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ায় ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম।
ভোট উপলক্ষে ক্লাবে জনসমাগম বাড়ছিল। বিশেষ করে নিচতলার একটি কক্ষে, যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসিয়ে সদস্যদের উঠা-বসার বন্দোবস্ত করা হয়েছে, সেখানে যেভাবে সদস্যসমাগম হতে থাকলো, তা কোনোক্রমেই পরিস্থিতির সাথে মানানসই ছিল না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, এই ঘরটিই করোনাভাইরাসের ‘হাব’ হয়ে উঠেছে। নিজে ঘরটাতে সামান্য সময় বসতে বাধ্য হই, কিন্তু কখনোই বেশি সময় নয়। অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকলে ভোট শিকেয় উঠবে। সিনিয়র সদস্যদের মধ্যে অনেকেই ভোট স্থগিত করার আওয়াজ তুলছিলেন, যাদেরকে বিবেচনাবোধসম্পন্ন বলতেই হচ্ছে। আমি পড়ে গেলাম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্যনির্বাহী কমিটি ২৬ জুন নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে যে!
বিষয়টি নিয়ে সভাপতির সাথে কথা বলেছেন সিনিয়র অনেক সদস্য। কিন্তু তিনি নির্ধারিত দিনেই ভোট করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে আমার মন বলছিল, এই পরিস্থিতিতে যদি ভোটের ডামাডোল বাজতেই থাকে, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় সুনিশ্চিত। হলোও তাই। আরো কয়েক সদস্যের করোনা আক্রান্তের খবর এলো। ইত্যবসরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধ করে দিলেন নির্বাচন। এই খবর শুনে অনেক সাংবাদিক ছুটলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে। একপর্যায়ে তিনি ‘১ জুলাই ভোট করলে তার কোনো আপত্তি নেই’ ধরনের আশ্বাস দিলেন।
লক্ষ্য করছিলাম, ২৬ জুন বা ১ জুলাই ভোট হলে কার কী লাভ-ক্ষতি হতে পারে- সেদিকেই নজর বেশিরভাগ প্রার্থীর। সামগ্রিক চিন্তা করছেন হাতেগোনা কয়েকজন। ক্লাবের নির্বাহী প্রধান হিসাবে আমার চিন্তাটা এতো সংকীর্ণ হওয়া উচিত নয়। সদস্যরা আমাদের নির্বাচিত করেন মূলত তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার আকাক্সক্ষা থেকে। সেই সদস্যদের জীবন যখন একের পর এক বিপন্ন, তখন ভোটে লাভ-ক্ষতির হিসাব কষার মতো ভয়ঙ্কর স্বার্থপরতা অন্তত আমি দেখাতে পারি না। তাছাড়া এটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, প্রায় সব প্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ, লকডাউনে রাস্তা-ঘাট জনশূন্য তখন হল্লা করে আমাদের ক্লাবের নির্বাচন সুধিমহল ভালোভাবে নিচ্ছে না। জনমত উপেক্ষা করে এমন পরিস্থিতিতে ভোট করা মানে সাংবাদিকদের নৈতিক অবস্থান সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। অবশ্য সমাজে সাংবাদিকদের নৈতিক অবস্থান কতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে অনেকের মতো আমিও ঘোর সন্দিহান।

তিন. ২৬ জুন না হয় না-ই হলো, ১ জুলাই যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তেমন কোনো আভাস তো নেই। বরং দিন যাচ্ছে আর পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দুঃসংবাদ। ফলে আমি ক্রমশ নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছিলাম, ১ জুলাইয়ের ভোটও স্থগিত করে দেওয়া সময়ের ব্যাপারমাত্র। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?
নাজুক এই সময়ে ২৪ জুন সন্ধ্যার পর সভাপতির শরণ নিলাম। তাকে জানালাম, কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তও শিরোধার্য। কিন্তু এখনও আমাদের কমিটি বহাল আছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য হলেও কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভা করা প্রয়োজন। সভাপতি সম্মতি দিলেন। ২৭ জুন বসলো নির্বাহী সভা। সেখানে আমাকে কিছুই বলতে হলো না। নির্বাহী কমিটির সবাই সমস্বরে মত দিলেন, এই পরিস্থিতিতে ভোট হতে পারে না। ভোটের চেয়ে সদস্যদের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। সাধারণ সভা যেহেতু বলেই দিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নির্বাচন এড়িয়ে বর্তমান কমিটিই বহাল থাকবে, ফলে গঠনতান্ত্রিক কোনো ঝামেলার মুখে পড়তে হবে না।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে যে বিপুল ক্ষতি হয়ে গেছে, তা বোধ হয় কখনও পূরণ হওয়ার নয়। আরও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না (আল্লাহ যেন আমাদের তেমন শাস্তি না দেন)। গুটিকয়েক ‘অতিবিপ্লবীর’ বিশ্বজয় করে ফেলার মতো আগ্রাসী মনোভাবের কাছে যখন সদস্যদের বড় একটি অংশ জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন তার ফল ভালো হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
নির্দ্বিধায় কবুল করছি, প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান হিসাবে পরিস্থিতির দায় আমি অস্বীকার করতে পারি না; করছিও না। ক্ষমা করো প্রিয় সহকর্মীরা। তোমরা জানো, কারও ক্ষতি হোক তেমন কোনো কাজ সজ্ঞানে করেছি- এমন কোনো নজির আমার চরম শত্রুও হাজির করতে পারবে না। পরিবার ছাড়া তোমরাই তো আমার সবচেয়ে আপন, কাছের স্বজন। জৈব সত্ত্বাহীন ইট-সিমেন্টের ক্লাব-ভবনটিকে যে আমি বড্ড ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার প্রতিদান তোমরাই তো আমাকে বার বার দিয়েছ।

চার. ৪ জুলাই দিনগত রাতে যখন এই লেখা তৈরি করছি তখন সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের বেডে অবস্থান করছেন আমাদের ক্লাবের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান তোতা, সাবেক সম্পাদক মতিনুজ্জামান মিটু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জুয়েল মৃধা। করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন সহসভাপতি আনোয়ারুল কবীর নান্টু, দপ্তর সম্পাদক তৌহিদ জামান, বিএম আসাদ, সাকিরুল কবীর রিটন, এহসান উদ দৌলা মিথুন এবং তাদের পরিবার-সদস্যরা। উপসর্গ নিয়ে ভুগছেন যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল কবীর মিল্টন, সিনিয়র সদস্য একেএম গোলাম সরওয়ার, রকিব হোসেন স্বপনসহ বেশ কয়েকজন। মৃত্যুর দুয়ার থেকে সবে ফিরে এসেছেন নির্বাহী সদস্য এম আইউব ও এস এম সোহেল।
অসুস্থ এসব সদস্যের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার জন্য কার্যনির্বাহী কমিটি তিন সদস্যের একটি টিম করে দিয়েছে। এছাড়া সভাপতি নিজ উদ্যোগে সবাইকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথেও অসুস্থদের (একজন ছাড়া) নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি ক্লাবের সাবেক সম্পাদক মতিনুজ্জামান মিটুর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে প্রতিদিনের মতো ৩ জুলাইও ফোন করেছিলাম। ফোন রিসিভ করলো তার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে। বাবার শারীরিক অবস্থায় হতাশা ব্যক্ত করে আক্ষেপের সাথে বেশ কিছু কথা বললো। প্রশ্ন করলো, ‘চাচা, আব্বুকে যারা ভোট করতে ডেকে আনলো, তাদের তো দেখছি না! তারা কেউ তো খোঁজও নিচ্ছে না! কোথায় তারা?’ বলাবাহুল্য, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া আমার সাধ্যাতীত। কিন্তু মাতৃহীন অসহায় মেয়েটির আর্তি আমাকে যারপরনাই বিচলিত করেছে। কিছুসময় পর আমি ক্লাব-সভাপতিকে ফোন করে মতিনুজ্জামান মিটুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা জানাই। আমার কাছ থেকেই তিনি প্রথম সংবাদটি জানতে পারেন। আমি তাকে অনুরোধ করি, যেকোনোভাবেই হোক মতিনুজ্জামান মিটুকে তিনি যেন ঢাকায় পাঠিয়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সভাপতি শুধু যথাযথভাবে তা করেনইনি, এখনো নানা ধরনের সাপোর্ট দিয়ে চলেছেন।
আমি ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের রোগী। তদুপরি ভ্যাকসিন নেওয়া হয়নি। ফলে ঝুঁকিটা অন্যদের চেয়ে বেশি। এমন অবস্থায় সংকটাপন্ন সহকর্মীদের কাছাকাছি যেতে পারছি না- এটা আমার জন্য সবিশেষ পীড়াদায়ক। আর শারীরিকভাবে কাছে গিয়ে কীই বা করতে পারতাম! রবিনহুড, সিন্দাবাদ বা হারকিউলিস সাজা যায়, বাস্তবে হওয়া যায় না।

লেখক: সম্পাদক, সুবর্ণভূমি ও প্রেসক্লাব যশোর

আরও পড়ুন