বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা

আপডেট: 03:44:37 31/01/2020



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চীনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ায়, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
"চীনে কী হচ্ছে সেটার জন্য এই ঘোষণা দেওয়া হয়নি বরং অন্যান্য দেশে যা ঘটছে সেটাই এই ঘোষণার মূল কারণ, " ডব্লিউএইচও- এর প্রধান টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস বলেছেন।
উদ্বেগ রয়েছে যে, এই ভাইরাস দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের বলেছে তারা যেন চীনে ভ্রমণ করতে না যায়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর চার স্তরের সতর্কতা জারি করেছে - এর আগে আমেরিকানদের চীনে ভ্রমণের বিষয়টি "পুনর্বিবেচনা" করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
সেখানে বলা হয়েছে যে, চীনে যেসব মার্কিন নাগরিক আছে তারা যেন সতর্ক থাকেন।
চীনে এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত দশ হাজার জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২১৩ জনের।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অন্যান্য ১৮টি দেশে আরো ৯৮ জন মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে চীনের বাইরে এখনো কারও মৃত্যু হয়নি।
চীনের বাইরের দেশের যতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ চীনের উহার শহরে ছিলেন, যেখান থেকে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।
তবে জার্মানি, জাপান, ভিয়েতনাম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষে মানুষে-ভাইরাস সংক্রমণের আটটি ঘটনা ঘটেছে।
জেনেভাতে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় ড. টেড্রোস ভাইরাসটিকে একটি "অভূতপূর্ব প্রাদুর্ভাব" হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যাকে গিয়ে প্রতিক্রিয়াও "অভূতপূর্ব"।
তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের "অসাধারণ পদক্ষেপ" গ্রহণের প্রশংসা করেন এবং বলেছেন যে চীনে বাণিজ্য বা ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করার কোনো কারণ নেই।
"একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলি, এই ঘোষণাটি চীনের প্রতি অবিশ্বাস বা অনাস্থার জন্য নয়," তিনি বলেন।
তবে বিভিন্ন দেশ সীমান্ত বন্ধ করার পাশাপাশি বা ফ্লাইট বাতিল করার পদক্ষেপ নিয়েছে গুগল, আইকা, স্টারবাকস এবং টেসলার মতো সংস্থাগুলো । তারা তাদের দোকান বন্ধ করে দিয়েছে বা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
এই ভাইরাস যদি এমন একটি দেশে প্রবেশ করে যাদের এমন প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার সক্ষমতা নেই, তখন কী হবে?
অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির দেখভাল করার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।
আশঙ্কা হল সেসব দেশে এই ভাইরাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কিছু সময়ের জন্য বিষয়টি নজরে নাও পড়তে পারে।
এটি এমন একটি রোগ, যা কেবল গত মাসে উদ্ভূত হয়েছিল এবং ইতিমধ্যে চীনের প্রায় দশ হাজারজনের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়- যা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব- সেখান থেকে বোঝা যায় যে, এইরকম প্রাদুর্ভাব দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর ওপর কত ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
নভেল করোনাভাইরাস যদি এই জায়গাগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে ছড়িয়ে পড়ে তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা অবিশ্বাস্য রকমভাবে কঠিন হয়ে পড়বে।
আক্রান্ত হওয়ার ৯৯% ঘটনাই ঘটেছে চীনে। এবং ডব্লিউএইচও এতোটুকু নিশ্চিত হতে পারছে যে, দেশটি সেখানকার এই প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
তবে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে ডব্লিউএইচও নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় তাদের নজরদারি চালাতে পারবে।
যেন তাদের রোগ নির্ণয় করার পদ্ধতি জোরদার করা যায় এবং এ ধরনের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুত করা যায়।

এই ঘোষণাটি কতটা অস্বাভাবিক
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর আগেও পাঁচবার বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
কোনো রোগ খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মুখে পড়লে এই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
বিশেষ করে যদি এই প্রাদুর্ভাবের এমন বড় কোনো ঘটনা ঘটে যা বৈশ্বিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

সোয়াইন ফ্লু, ২০০৯
এইচ-ওয়ান-এন-ওয়ান ভাইরাসটি ২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, এতে দুই লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়।

পোলিও, ২০১৪
২০১২ সালে পোলিও প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে চলে গেলেও ২০১৩ সালে পোলিওর সংখ্যা আবার বেড়ে যায়।

জিকা, ২০১৬
আমেরিকা অঞ্চলে জিকা রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরে ডব্লিউএইচও ২০১৬ সালে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

ইবোলা, ২০১৪ এবং ২০১৯
পশ্চিম আফ্রিকাতে প্রায় ৩০ হাজার লোক সংক্রামিত হওয়ায় এবং ১১ হাজার মানুষ এই ইবোলায় প্রাণ হারানোর কারণে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রথম জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালের আগস্টে; যা ২০১৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
ডিআর কঙ্গোতে এই প্রাদুর্ভাব পুনরায় ছড়িয়ে পড়ায় গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

চীন কীভাবে এই মহামারী মোকাবিলা করছে
তিব্বতে একজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ হলো এই ভাইরাস চীনের মূল ভূখণ্ড প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছে গেছে।
দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন অনুযায়ী নয় হাজার ৬৯২ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
প্রায় সমস্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চীনের কেন্দ্রীয় হুবেই প্রদেশে। এজন্য সেখানে সবাইকে একপ্রকার আটক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ছয় কোটি মানুষের এই প্রদেশটির উহান শহর থেকে এই প্রাদুর্ভাবের শুরু হয়।
শহরটিকে চারিদিক থেকে কার্যকরভাবে আটকে রাখা হয়েছে এবং চীন ভাইরাসটির বিস্তাররোধে পরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
হুবেইতে থাকা মানুষদের বলা হয়েছে, তারা যেন ঘরের ভেতরে থেকেই সব ধরনের কাজ করেন; যতক্ষণ না পরিস্থিতি তাদের ফিরে আসার জন্য নিরাপদ হচ্ছে।
এই ভাইরাসটি চীনের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, যেটা কিনা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম।
কেননা অনেক দেশ ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া চীনে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিচ্ছে।

অন্যান্য দেশ কীভাবে সাড়া দিচ্ছে
উহান থেকে কয়েক শতাধিক বিদেশি নাগরিককে বের করে আনার কাজ চলছে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং নিউজিল্যান্ড- এই বের করে আনা মানুষদের থেকে সংক্রমণ এড়াতে অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য তাদের আলাদা করে রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ১৪ দিন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হবে, তাদের কেউ আক্রান্ত কিনা বোঝার জন্য।
অস্ট্রেলিয়া তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে ক্রিসমাস দ্বীপের একটি আশ্রয় শিবিরে এই ফিরিয়ে আনা নাগরিকদের আলাদা করে রাখার পরিকল্পনা করছে। ওই শিবিরটি আশ্রয় প্রত্যাশীদের রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন