বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে যে দু-চারটে কথা আমরা জানি

আপডেট: 08:41:48 08/12/2020



img

তুষার দাশ

বু. ব.। এই সংক্ষিপ্ত ট্রেডমার্কে যে ভদ্রলোককে আমরা শুরু থেকে চিনে উঠতে পেরেছিলাম, তিনি যতটা না লেখক আমাদের কাছে, তার চাইতে অনেক বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অসম্ভব কৃতী ও মেধাবী এক ছাত্র, অনার্স ও এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। রেকর্ড সংখ্যক নম্বরধারী, কোনো কোনো পত্রে আজও যা অম্লান। পরীক্ষার সময় চারঘণ্টা তখন। এগুলো সব গত শতাব্দীর বিশের দশকের ঘটনা। তিনি এই কড়ারে হলে উপস্থিত শিক্ষকদের রাজী করিয়েছিলেন যে, তিনি প্রতি ঘণ্টায় একবার করে বেরোবেন এবং সিগারেট খাবেন। তাঁর শর্ত মঞ্জুর হয়েছিলো। আজ ভাবি, শিক্ষকদের কতটা স্নেহ অধিকার করলে এই ঔদ্ধত্য সম্ভব! আর ঐ স্নেহ এবং ঔদ্ধত্যের পেছনে নিশ্চিত কাজ করেছে তাঁর অসামান্য মেধা। তার আরও প্রমাণ, বু.ব.’র এক সাহেব শিক্ষক নাকি বলেওছিলেন— ছেলেটি হয় উন্মাদ না হয় জিনিয়াস!
জগন্নাথ হলের বার্ষিক সংকলন “বাসন্তিকা” সম্পাদনার সংগেও হলের সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক হিশেবে গভীর সম্পৃক্তি ছিলো তাঁর। এমন তথ্য জেনে বিস্ময় জাগেনি এতটুকু অতিস্বাভাবিক ভেবেই।
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা (সেও তো আজ উপহসিত এক সংস্কৃত খণ্ডবাক্য মাত্র, যার মানে থাকলেও যুক্তির ধোপ-ধোলাইয়ে অনেককাল ধরে, এমনকি বর্তমানেও ছিন্নভিন্ন), বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে (একথাও আজ আর তেমন গুরুত্ব পাওয়ার মতো তত গ্রাহ্য বড়ো মাপের কথা নয়, যেহেতু সম্ভাবনা রিক্ত ও প্রায় নিঃস্ব হয়ে উঠেছে কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম বাদে)। আজকের বাংলাদেশ (সেসময়ের পূর্ব বাংলা) থেকে পশ্চিম বাংলার কোলকাতায় গিয়ে ব্যাপক লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে ধারদেনার প্রভূত কণ্টক-প্রস্তর পেরিয়ে তবে থিতু হতে পেরেছিলেন, পেয়েছিলেন “উজ্জ্বল উদ্ধার”। অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে কিছুদিন সংবাদপত্রের কলামলেখক হয়ে বাঁচার লড়াইয়ের পথ সহজ করেছিলেন, কিন্তু যাঁর রক্তে সৃজন-রহস্যের প্রলয়নৃত্যের মহাতাণ্ডবের বহুবর্ণবিভা, যা পরে উচ্ছ্রিত হবে নানা ঝর্ণাধারার বেণীমুক্তিতে বৈভবময় অপূর্ব সব স্রোতোধারায়, যিনি হারকিউলিয়ান শ্রমে গড়ে তুলবেন সুরম্য স্বখচিত সব খিলান-দালান, রাজপথ, মেহগনির নানা কারুকাজের অপরূপ সব মিনার— তিনি কী আর যুদ্ধে পরান্মুখ হবেন, না, হতে পারেন !! তিনি জিতেছেন। বিপুলভাবেই জয়ী হয়েছেন।
বাংলাসাহিত্যে নোবেল পাওয়া একমাত্র কবি (গীতিকবিও বলা যেতে পারে) শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয়ের পর সত্যিকার অর্থে যদি কোনো বহুমুখী লেখককে সব্যসাচী বলা যেতে পারে অবলীলায়, তবে তিনি, সেই ট্রেডমার্ক বু. ব.। কবি হিশেবে (তাঁরই বানান, ৪২ বছরেরও বেশি আগে শেখা, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় লিখে তুমুল বকা খেলাম ড. আহমদ শরীফ স্যারের, এটা ফার্সি ‘হিসাব’ থেকে এসেছে, অতএব ‘হিশেব’ অশুদ্ধ। ভয়ে ভয়ে বু. ব.’র নাম বলাতে আরো ক্ষেপে গেলেন। কলাকৈবল্যবাদী বু. ব.কে অন্যরা ক্ষমা করতে পারলেও গণমানুষের বিপ্লবে-সাহিত্যে বিশ্বাসী ড. আহমদ শরীফ কীভাবে পারবেন? আরও কেউ কেউ অবশ্য পারেননি, যেমন বীণাপাণি দেবী বলেছিলেন ‘রজনী হ’লো উতলা’ ছাপা হওয়ার পর: “এই ছেলেকে জন্মের সময় নুন খাইয়ে মেরে ফেলা হয়নি কেন?”। এ ধরনের গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন তিনি। ভাগ্যিস্, ভূদেবচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী এই মহাকাজটি করেননি। স্ত্রী অবশ্য সেই আতংকজনক সুযোগটিই পাননি। ) তাঁর গাঢ় মূল্য, এমনকি প্রাপ্য মূল্য দিতেও অনেকের অনেক কুণ্ঠা, ছাত্রজীবনে কবিতাপাঠক আমাদের অনেকের বদভ্যাসের মধ্যে এটাও ছিলো, তিনি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কবি হিশেবে আমাদের কাছে প্রতিভাত ছিলেন না। তখনকার সাপ্তাহিক “দেশ” পত্রিকার সুবাদে পটিয়ার সেই সময়ের মহকুমা শহরেও আমরা অনেক লেখকের নাম জানতাম। কবিতা লিখতে গেলে যাঁর লেখা রবীন্দ্র-বিপ্রতীপে চলার আত্যন্তিক জেদে গদ্যময় হয়ে ওঠে আর গদ্য হয়ে যায় মখমল-তুলতুলে কাব্য শরীরের-প্রায়, তাঁকে কী অর্থে বলবো কবি? — যেন আমরা একেকজন আই. এ. রিচার্ডস্ , টি.এস. এলিয়ট, এজরা পাউণ্ড, নিদেনপক্ষে মোহিতলাল মজুমদার !!
আবার তিনি নানা সময় “আলটপ্কা ঝোড়ো মন্তব্যে” তাতিয়ে তোলেন আমাদের বিরুদ্ধ মতকে, আমরা উত্তেজিত হই, নানা উত্তেজনার বয়েসও তখন, পাশাপাশি গুরু ধরেছি তাঁরই সমসাময়িক অন্যান্য মহাজনদের। তখন এবং আজও, আমার সার্বিক অবিদ্যাগুণ সত্বেও আমার প্রিয় কবি শ্রীসুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বন্ধুদের বেশির ভাগেরই মহাপ্রিয়, বরিশালকে পৃথিবীর মানচিত্রে দাগিয়ে-জাগিয়ে দেয়া অন্যরকম এক কবি শ্রীজীবনানন্দ দাশ।
জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথ-বিষ্ণু দে— এই ত্রয়ীর প্রবলতায় তিনি সামান্য পাঠক-মনস্কতা-বিচ্ছিন্ন হলেও, প্রথমজনকে, একক উদারতার বাহু প্রসারিত করে চিনিয়েছিলেন বাংলা আধুনিক কবিতার নতুনতর যাত্রাপথ, নতুনতর রূপ, শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-প্রভাববলয়ে থাকা বিশাল পাঠকগোষ্ঠীকে। একের পর এক রচনার ভেতর দিয়ে জীবনানন্দের কাব্যজগতের এক অপরূপ মূর্তি গড়েছিলেন, আজ যা অনেকটাই উদ্ভাসিত, আলোকোজ্জ্বল। চোখধাঁধানো তো বটেই। কবি রণজিৎ দাশ তিরিশবছর আগে তাঁর এক রচনায় চমৎকারভাবে বলেছিলেন যে, আমাদের জীবনানন্দ-পাঠ অনেকটা সৌখিন ট্যুরিস্টের মতো, এখনও এক ব্যাপক অংশ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো আবিষ্কারের উন্মুখ প্রতীক্ষায় অপেক্ষমান। যদিও দেবেশ রায়, ভূমেন গুহ এবং পরবর্তী সময়ে গৌতম মিত্র প্রমুখ এই উদ্গীরণের অনেক লাভাস্রোতকে নানানভাবে বশে এনেছেন। প্রকৃত কবির আবিষ্কার তো অনিঃশেষ।
আর দ্বিতীয়জনের ১৯৬০ সালে মৃত্যুর পর ১৯৬২র মে মাসে তাঁর কাব্যসংগ্রহ প্রকাশিত হলে ১০ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ ভূমিকায় তিনি শ্রীসুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কে যা যা বলেছিলেন, তার বড়ো একটি অংশ তাঁর ক্ষেত্রেও সুপ্রযুক্ত হতে পারে, চমৎকারিত্বের সংগে। যাঁরা এই অসামান্য ভূমিকার কথা স্মরণে রেখেছেন, তাঁরা আমার এই বিনীত বিবেচনায় মতৈক্যের প্রতি ঝুঁকতে পারেন কতকটা, এই প্রত্যাশা রাখাই যায়।
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে অজস্র বাংলা-ইংরেজি রচনার পর, নিজের বিপুল লেখালেখি, পত্রিকা সম্পাদনা, তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের সংগঠন ও সংঘটন, অধ্যাপনা— এসবের পাশাপাশি সমসাময়িক সহযোদ্ধা ও তরুণদের নিয়েও কম লেখালেখি বা বিতর্কে মাতেননি বুদ্ধদেব। কলাকৈবল্যবাদী হবার কারণে রাজনৈতিক তীব্র প্রতিপক্ষের সংগেও কম লড়াই করতে হয়নি, সমালোচিতও হয়েছেন তীব্রভাবে। সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের গল্প আমার বর্তমান এখতিয়ারের বাইরে।
শ্রীশিবনারায়ণ রায়ের জীবনানন্দ-বুদ্ধদেব সংক্রান্ত একটি দুর্দান্ত মূল্যায়নকে উদ্ধৃত করে মতৈক্য প্রকাশের মাধ্যমে শ্রীমতী কেতকী কুশারী ডাইসন যখন আমাদের জানান যে,
“এখন পিছন ফিরে চাইলে মনে হয় এই প্রতিভাসমুচ্চয়ের ভিতরে [ অর্থাৎ রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যিকদের মধ্যে ] সবচাইতে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। সম্প্রতি জীবনানন্দকে নিয়ে দুই বাংলায় যে তুমুল ও ব্যাপক পূজাপার্বণ চলছে, তাতে আমার এই প্রস্তাব বিনা বিচারে নাকচ হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা। জীবনানন্দের মহত্ত্ব নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই; বস্তুত তাঁকে একজন বিশিষ্ট কবি হিসেবে আবিষ্কার এবং প্রতিষ্ঠাদান বুদ্ধদেবের অন্যতম কীর্তি। জীবনানন্দ খাঁটি কবি ছিলেন; তাঁকে আমি দু’একবার মাত্র দেখেছি; কিন্তু তাঁর রচনা পড়ে আমার মনে হয়েছে যেন তিনি এক নক্ষত্রবিম্বিত জলাশয়, যেখানে গভীর অন্ধকারের স্তরে স্তরে নানা অনুভব ও ভাবনার ওঠাপড়া আছে, কিন্ত কোনো গতি নেই। অপরপক্ষে বুদ্ধদেব যেন কোন তুষারাবৃত শৈলশিখর থেকে উৎক্ষিপ্ত একটি নির্ঝর, ধাপে ধাপে বহমান, ক্রমে নদী এবং তার শাখাপ্রশাখায় প্রসারিত হয়ে মহাসমুদ্রের দিকে নিয়ত বহমান। রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষায় বুদ্ধদেবের মতো এত বহুমুখী এবং নিয়ত গতিশীল প্রতিভা আর একটিও দেখতে পাই না।”
তখন এই অভিনিবেশ-সমৃদ্ধসত্য মূল্যায়ন মেনে নিতে আমাদের তেমন একটা আপত্তি থাকে না।
বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা “বৈদগ্ধ্য” পত্রিকার দ্বিতীয় রচনাটিই শ্রীশিবনারায়ণ রায়ের। শুরুরটা শ্রীমতী প্রতিভা বসুর। শ্রীমতী বসুর রচনাদিও বুদ্ধদেব লিখে দিতেন — এমন কুৎসাও শুনতে হয়েছে তাঁকে জীবদ্দশায়, যা ছিলো ভয়ংকর অপমানজনক, বিশেষত শ্রীমতী প্রতিভা বসুর ক্ষেত্রে। শ্রী শেখর বসুরায়ের সম্পাদনায় ১৯৯৯ সালে বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা বৈদগ্ধ্য বেরিয়েছিলো। তারও প্রায় দু’দশক আগে আমাদের দেশে বাংলা একাডেমি থেকে কবি রফিক আজাদের উদ্যোগ ও সম্পাদনায় বুদ্ধদেব বসুর ওপর এক চমৎকার ঋদ্ধ সংখ্যা বেরিয়েছিলো “উত্তরাধিকার” পত্রিকার। এই সংখ্যাটা সম্পাদনা করে সফল হওয়ার গল্প অহংকার করে বলতেন কবি রফিক আজাদ। বলতেন, পিতৃঋণ শোধ করেছেন ওটা সম্পাদনা করে। কবি শামসুর রাহমানের মধ্যেও এ ধরনের বিনতি দেখেছি বুদ্ধদেব বসুর ব্যাপারে। আর কবি হুমায়ুন আজাদের মধ্যে। একবার তো রফিক আজাদ আমাকে প্রায় শারীরিক আক্রমণে উদ্যত হয়েছিলেন “সাকুরা” নামের আমাদের বিখ্যাত পানশালায়, বোদলেয়ার ও তাঁর ভুল নাম লেখা আর ভুল অনুবাদের কথা বলায়। সদ্য কোলকাতা ফেরৎ আমি আর কবি শ্রী অরুণ মিত্রের সংগে আড্ডার তুমুল সতেজ স্মৃতি তখন। তাঁকে উদ্ধৃত করে ওসব বলার সংগে সংগেই রফিক আজাদের রুদ্রমূর্তি আর সমানে চিৎকার। সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। উনারা হৃদযন্ত্র বিকল হবে বলে। কয়েকটা বাক্য এখনও স্মৃতিতে গেঁথে আছে। “কে অরুণ মিত্র? কেউ চেনে তাঁকে? কার সংগে কিসের তুলনা? আমাদের আধুনিক বানিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু, আমাদের আধুনিকতা শিখিয়েছেন। আমাদের পিতা, গুরু।” সব রফিক আজাদ উবাচ।
উত্তরাধিকারের বুদ্ধদেব বসু সংখ্যাটা আমার হাতছাড়া হয়ে আমাকে প্রায় হতচ্ছাড়া বানিয়ে ছেড়েছে।
কিন্তু রফিক আজাদের সেই গুরু একবার কোলকাতার এক সাহিত্যসভায় কবিতা পড়তে দাঁড়িয়েছেন। কবিতা পড়ছেন, পা টলছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, হলের ভেতর থেকে চিৎকার করা হচ্ছে, গুরু নেমে পড়ুন, নেমে পড়ুন। এসব ইতিহাস। কবির, কবিদের।
বুদ্ধদেবের কাছে বই সমালোচনা করা শিখেছিলেন বিদূষী শ্রীমতী কেতকী কুশারী ডাইসন— এমন সশ্রদ্ধ স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন তাঁর “কাছে-দূরের কক্ষপথে” গ্রন্থের ৪২১ পৃষ্ঠায় “আমার প্রিয় কবি বুদ্ধদেব বসু” প্রবন্ধে। তাঁর কাছেই জানতে পারছি— “ বুদ্ধদেবকেও জীবনের শেষ চোদ্দ বছরে নানা জাতের তিক্ত সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছিলো”— যা আসলে সৃজনশীলশক্তিবিনাশী। এ তো সর্বমান্য সত্য।
আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শ্রীমতী ডাইসন এখানে আমাদের জানাচ্ছেন। খ্যাতির কারণে যে বনলতা সেনকে বাঙালী পাঠক প্রায় মোনালিসার সমার্থক খ্যাতিদ্যোতনায় জানেন, সেই বনলতার বাংলা কবিতার আসরে আবির্ভূত হবার সাত বছর আগে বুদ্ধদেব তাঁর “অমিতার প্রেম” কবিতাটি লিখে এক ইতিহাস তৈরি করেছেন। শ্রীমতী ডাইসনের ভাষ্যে— “বাংলা সাহিত্যে ‘অমিতার প্রেম’-এর অমিতাই সম্ভবত প্রথম নারী, যাকে আমরা নিঃসংশয়ে আধুনিকা নগরবাসিনী বলে চিনে নিতে পারি। এবং শুধু অমিতা নয়, এই বইয়ের নায়িকারা সবাই আধুনিকা— অমিতা, অপর্ণা, মৈত্রেয়ী; বুদ্ধদেবের কবিতার কোনো নায়িকাই কখনো নন দেশকালের অতীত;... সমকালীন আধুনিকা ভদ্রমহিলাকে কবিতার নায়িকা করে তোলবার প্রথমতম সম্মান তাঁরই প্রাপ্য, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের নয়। ক্যামেলিয়া লেখা হয় এর দুবছর পরে।” (কাছে-দূরের কক্ষপথে, পৃষ্ঠা ৪২৫)
সাক্ষ্যের প্রয়োজন নেই। যে কোনো মাপের শিল্পীর পক্ষে কথা বলে কেবল তার কর্ম। সোনার তরীর নৌকোভরা ফসল। বাকি থাকে সামনের ইতিহাস আর সময় আর সংবেদনা-সন্মোহিত মেধাবী পাঠকবৃন্দ। তাদেরই সংগে থাকে নিন্দার কুচন্দনচর্চিত সন্দিগ্ধ স্নিগ্ধতাহীন গাড়ল দুর্মতিযুক্ত অর্বাচীন বিদূষক অন্যায্য পাঠক, যারা বর্তমানে বসেই নির্ধারণ করে দিতে পারে সর্ববিষয়ে শেষ কথা, শেষ বাক্য। সংস্কৃত ভাষার কবি ভবভূতি নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথ্বীর কথা তো সাধে বলেননি।
৩৭ বছর বয়সে ৮০ গ্রন্থের গর্বিত রচয়িতা বু. ব.। স্বপন মজুমদারের তালিকায় বুদ্ধদেব বসুর গ্রন্থসংখ্যা ১৫৩ আর সমীর সেনগুপ্ত দিচ্ছেন ১৬২ গ্রন্থের হিশেব। বুদ্ধদেব বসুর গ্রন্থসংখ্যা ১৮৭/১৮৮ র মতো, উত্তরাধিকারের তালিকায় পেয়েছিলাম, যতদূর মনে পড়ে। বৈদগ্ধ্যে সমীর সেনগুপ্তর তালিকাটা এরকম — কবিতার বই ১৮, অনুবাদ কবিতার বই ৫, উপন্যাস ৪৩, যৌথভাবে রচিত উপন্যাস ৪, ছোটগল্পের বই ২১, ছোটদের জন্যে লেখা উপন্যাস ৯, ছোটদের জন্যে লেখা ছোটগল্পের বই ১৩, প্রেমেন্দ্র মিত্রের সংগে রচিত ২, অন্য অনুবাদ ৪ (কিশোর উপযোগী), প্রবন্ধ ১২, নাটক ১৬, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ ৮, পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য রচনা ৫, সম্পাদিত গ্রন্থ ৪, সম্পাদিত পত্রিকা ৭।
এই ব্যাপক সৃজনকর্মের বিপুল বিস্তারের ভেতর দিয়ে এমন এক অলোকসামান্য উচ্চতাকে তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন, যা শিল্পীমাত্রেরই গোপন আবার একই সংগে প্রকাশ্য স্বপ্ন, বাংলা সাহিত্যের নানা দিগন্তকে তিনি এমন এক নিরীক্ষাপ্রবণ অবিরাম কৌতূহলের ভেতর প্রবেশ করিয়েছিলেন যে, যেখানে তিনি প্রায় নিঃসংগ একাকী পথিক হয়েই রয়ে গেলেন। সাহিত্যের সম্পাদনা, সাহিত্যকে ভালোবাসা আর সাহিত্যিকের প্রতি, সে পূর্বজ হোক আর সমসাময়িক কিংবা অনুজ, এক মায়াময় উদারতায় তাকে গ্রহণ, বরণ আর রাঙিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসুর সমকক্ষ কেউ অদ্যাবধি জন্ম নেননি।
জন্মদিনের আনন্দময় মুহূর্তে এই মহীরুহকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই।
[বিডিনিউজ থেকে]

আরও পড়ুন