বেনাপোলে আট সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স স্থগিত

আপডেট: 09:04:16 21/11/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার, বেনাপোল (যশোর) : দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে চলছে রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব। গত ১৫ দিনে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে আটটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত ও ছয় কোটি টাকার পণ্য চালান আটক করেছে কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা ও বিজিবি কর্তৃপক্ষ। তবুও থামানো যাচ্ছে না রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা।
বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেনাপোল কাস্টম হাউসের জন্য চলতি অর্থবছরে ছয় হাজার ২৪৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু একটি অসাধু চক্র রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক কালে চকলেটের চালানে উন্নত মানের শাড়ি, ব্লিচিং পাউডারের চালানে কফি ও ওষুধ, অ্যালুমিনিয়াম ইনগটের মধ্যে থ্রিপিস, শাড়ি, লেহেঙ্গা, পাঞ্জাবি, থানকাপড়, ফলস কাপড়, খালি ব্লাড ব্যাগ, মেশিনারি পার্টসের ভেতরে প্যাডলক ও রেক্সিন, আমদানিকৃত ঘোষণাতিরিক্ত ১৯ টন মাছ আটক করা হয়। এসব চালান থেকে আড়াই কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। জব্দ করা পণ্য বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি রোধে ঝটিকা অভিযান শুরু করা হয়েছে।
রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় সাময়িক স্থগিত সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সগুলো হলো রিমু এন্টারপ্রাইজ, তালুকদার এন্টারপ্রাইজ, এশিয়া এন্টারপ্রাইজ, সানি ইন্টারন্যাশনাল, মদিনা এন্টারপ্রাইজ, মুক্তি এন্টারপ্রাইজ, রিয়াংকা এন্টারপ্রাইজ ও ট্রিম ট্রেড। এর অধিকাংশ লাইসেন্স ভাড়ায় খাটানো হয় বলে কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সবচেয়ে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি দেয় বেনাপোলের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিড এন্টারপ্রাইজ, এলটেক অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রি ও শার্শার বাগআঁচড়া বাজারের মেসার্স সোনালী ট্রেডিং।
মেসার্স রিড এন্টারপ্রাইজ গত ১১ নভেম্বর চার হাজার ৬৭৫ কেজি ব্লিচিং পাউডারের ঘোষণা দিয়ে বস্তার মধ্যে কফি, ওষুধ জাতীয় পণ্য আমদানি করে। যার মেনিফেস্ট নম্বর ২৭৫৭৮/১। ১৪ নভেম্বর পণ্য চালান খালাস করতে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয় (বিল অব এন্ট্রি নম্বর-সি-৫৪৫২৫)। প্রতিষ্ঠানটির সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রিয়াংকা ইন্টারন্যাশনাল। এতে ঘোষণার অতিরিক্ত ৩৬০ কেজি কফি ও এক হাজার ৯২৭ কেজি ওষুধ জাতীয় পণ্য পেয়ে তা আটক করা হয়। এই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মূল মালিক হচ্ছেন রতনকৃষ্ণ হালদার। তবে তার লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে অন্যরা কাজ করেন।
গত ৫ নভেম্বর ভারত থেকে ১২ হাজার ৯০৮ কেজি অ্যালুমিনিয়াম ইনগট আমদানি করে এলটেক অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রি। আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স ট্রিম ট্রেড পণ্য চালানটি খালাস করতে গত ৯ নভেম্বর বেনাপোল কাস্টম হাউজে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে (যার বিল অব এন্ট্রি নম্বর-সি-৫৩০৭৮)। পণ্য লোড করার পর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেলের কর্মকর্তারা পরীক্ষণ করে ওই পণ্যের ট্রাকে ভারতীয় ১৮৬ পিস থ্রিপিস, শাড়ি ২৫৪ পিস, লেহেঙ্গা ৩৭ পিস, পাঞ্জাবি ৩৭ পিস, থানকাপড় ২৩ দশমিক ৬ মিটার, ফলস কাপড় চার পিস, খালি বøাড ব্যাগ ৬০ পিসসহ অন্যান্য পণ্য পাওয়া যায়।  
শার্শার বাগআঁচড়া বাজারের মেসার্স সোনালী ট্রেডিং গত ৬ অক্টোবর ভারত থেকে ৭০ প্যাকেজ কিটকাট চকলেটসহ ২০২ প্যাকেজ অন্যান্য পণ্য আমদানি করে। যার মেসিফেস্ট নম্বর ২৩৬১৬/১। পণ্যটি খালাস করতে ১২ অক্টোবর আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স মুক্তি এন্টারপ্রাইজ কাস্টম হাউজে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে (যার বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৪৬৫৭৯)। চকলেট শিশুদের খাদ্য হওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ খাদ্যের গুণগতমান নির্ণয়ের জন্য বিএসটিআই অফিসে নমুনা পাঠান। চকলেট রেখে অন্যান্য পণ্য ছাড় দেওয়া হয়। বিএসটিআই থেকে টেস্ট রিপোর্ট আসার পর ৪ নভেম্বর ৭০ প্যাকেজ চকলেট ছাড় দেওয়া হয়। পণ্য চালান ট্রাকে নিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোলের তালশারী মসজিদের সামনে থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ট্রাকটি আটক করে বেনাপোল ক্যাম্পে নিয়ে আসে। পরে বিজিবি ও কাস্টমস যৌথভাবে তল্লাশি করে দুই কোটি টাকারও বেশি দামের ৬০৪ পিস ভারতীয় কাতান শাড়ি, ৫৩ কেজি সিনথেটিক ফেব্রিক্স, ১২৬ পিস সুতি শাড়ি, ১৫৮ সেট থ্রিপিস, টু পিস ও ওয়ান পিস, এক হাজার ৬৯২ পিস ব্রা, ৩৯ পিস পেন্টিসহ অন্যান্য মালামাল পাওয়া যায়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় জড়িত মুক্তি এন্টারপ্রাইজের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করে।
এদিকে বন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বেড়েই চলেছে। কখনো কাস্টমস-বন্দরকে ‘ম্যানেজ’ করে আবার কখনো বিভিন্ন পরিচয়ে হুমকি-ধামকি দিয়ে চলছে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির উৎসব। মাঝে-মধ্যে দু-একটি চালান আটক হলেও অধিকাংশই থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাধারণ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা বলেছেন, এক একটি ফাঁকির ঘটনা ধরা পড়ার পর নিত্য-নতুন আইন করে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। অথচ যারা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য চালান খালাস নিয়ে যাচ্ছে তাদের লাইসেন্স স্থগিত হওয়ার পর আবারো অন্য লাইসেন্স ব্যবহার করে একইভাবে শুল্ক ফাঁকি কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছেন।  এ যেন ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, শুল্ক ফাঁকির ঘটনা দুঃখজনক। এসব ঘটনায় প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি বেড়ে যাচ্ছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে আমরা অনেক প্রতিষ্ঠানের সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স স্থগিত করেছি। মিথ্যা ঘোষণায় যে সব পণ্য আমদানি করা হচ্ছে তাদের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত ও শোকজের পরে বাতিল ও পণ্যগুলো বাজেয়াপ্ত করছি। রাজস্ব ফাঁকিরোধে বেনাপোল কাস্টমস হাউস জিরো টলারেন্স ভূমিকা গ্রহণ করেছে। বন্দরে রাতে কাস্টমসের একাধিক মোবাইল টিম কাজ করছে।’
তিনি আরো জানান, শুল্ক ফাঁকিসহ যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন