বেনাপোলে রাজস্ব আয়ে বড় ধস

আপডেট: 11:16:35 06/07/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার, বেনাপোল (যশোর) : রাজস্ব আদায়ে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউজে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্ধেকের মতো রাজস্ব আয় হয়েছে দেশের বন্দরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়কারী এই কাস্টম হাউজে।
কাস্টম হাউসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তিন হাজার ৭০ কোটি ১২ লাখ টাকা কম আদায় হয়েছে। তবে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, কাস্টমের নানা হয়রানির কারণে ব্যবসায়ীরা এ পথে আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আয়ে পিছিয়ে ছিল এ কাস্টম হাউজ। পরে করোনার কারণে ভারতের সঙ্গে টানা আড়াই মাস আমদানি বন্ধ থাকায় রাজস্ব আহরণ নেমে যায় অর্ধেকে।
শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর ছয় হাজার ২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় বেনাপোল কাস্টম হাউজকে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ হাজার ৬০৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এসময় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আদায় করতে পেরেছে মাত্র দুই হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে তিন হাজার ৭০ কোটি ১২ লাখ টাকা। এসময় ভারত থেকে ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৮ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে।
এর আগেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউজে এক হাজার ১৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি ছিল। সেই সময় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল পাঁচ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছিল চার হাজার ৪০ কোটি টাকা।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার হাজার ১৯৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছিল চার হাজার ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সেবারও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ১৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান বলছেন, আড়াই মাস এপথে আমদানি বন্ধ ছিল। এছাড়া আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে রাজস্ব ঘাটতি আরো বেশি হয়েছে। এপথে রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও হয়রানিমুক্ত হতে হবে। এছাড়া বন্দরে বার বার রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন। কর্তৃপক্ষ কোনো ক্ষতিপূরণ না দেওয়ায় ওই সব ব্যবসায়ী এ বন্দর ছেড়েছেন।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, পণ্য ছাড়করণের ক্ষেত্রে বৈধ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়া আমদানি কমে যাওয়ার একটি কারণ। এতে রাজস্ব দিন দিন ঘাটতি হচ্ছে।
তিনি জানান, এছাড়া অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব ঘাটতি হয়ে আসছে। তাতে চলতি অর্থবছর শেষে বিপুল পরিমাণে ঘাটতি দাঁড়াবে।
ফি বছর রাজস্ব ঘাটতির কারণ হিসেবে তিনি মনে করছেন, চাহিদা অনুপাতে বেনাপোল বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়া এবং উচ্চ শুল্ক হারের পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পণ্য দ্রুত খালাসসহ ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশনের এই শীর্ষ নেতা।
তবে বেনাপোল কাস্টম হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেনের বক্তব্য খানিকটা আলাদা। যদিও তিনি রাজস্ব ঘাটতির কথা স্বীকার করছেন।
তিনি বলেন, করোনার কারণে প্রথমত আড়াই মাস ধরে আমদানি বন্ধ ছিল। এ ছাড়া পণ্য খালাসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বেড়ে যাওয়ায় কিছু ব্যবসায়ী এ বন্দর দিয়ে আমদানি কমিয়েছেন। এতে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। তবে শুল্ক কর্মকর্তারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন।
ভারতের পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম নগর ও ব্যবসা কেন্দ্র কলকাতা থেকে বেনাপোলের দূরত্ব মাত্র ৮০ কিলোমিটারের মতো। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দেশে স্থলপথে যে পণ্য আমদানি হয় তার ৭০ শতাংশ হয়ে থাকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের পছন্দের তালিকায়ও প্রথম সারিতে বেনাপোল বন্দর। দেশের সিংহভাগ গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিসহ বিভিন্ন শিল্প কলকারখানার কাঁচামাল আমদানি হয় এ বন্দর দিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজস্ব আয়ের দিক থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের পরেই বেনাপোল বন্দরের অবস্থান। প্রতিবছর এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়ে থাকে; যা থেকে সরকারের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন