বেনাপোলে সুদের কারবারির ফাঁদে পড়ে অনেকে নিঃস্ব

আপডেট: 01:39:55 17/07/2021



img
img

স্টাফ রিপোর্টার, বেনাপোল (যশোর) : বেনাপোল শহরে অননুমোদিত সমবায় সমিতির নামে সুদের কারবারির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অনেকে। বর্তমান করোনাকালে কাজ-কর্ম হারিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেয়ে বিভিন্ন সমবায় সমিতি ও অনুমোদনবিহীন সুদের কারবারির কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিঃস্ব এখন বেনাপোলের বিভিন্ন ছোট বড় ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবার। অনেকে আবার আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিচ্ছেন।
বেনাপোল বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেছে, ব্যবসার জন্য সুদে টাকা নিয়ে নিঃস্ব অনেকে। কেউ দোকান ছেড়ে দিয়ে এখন পথের ভিখারি আবার কেউ লোকলজ্জায় বসতবাড়ি জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হচ্ছেন।
বেনাপোল রেলস্টেশন রোডের সীমান্ত বেডিং হাউসের মালিক সাইদুর রহমান সালাম জানান, তিন বছর আগে বেনাপোলের ভবেরবের এলাকার জেনারেটর ও সুদের কারবারি হাশেম আলীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ধার নেন। সুদ প্রতি মাসে লাখে ছয় হাজার টাকা করে অর্থাৎ ৪২ হাজার টাকা মাসে সুদ দিতে হবে। এ পর্যন্ত সুদের কারবারি হাসেম আলীকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা দিয়েছেন, তবু এখনও সাত লাখ টাকা পাবেন বলে চাপ দিচ্ছেন হাসেম।
সালাম আরোও জানান, হাসেম সাদা ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এবং ব্যাংকের চেক সই করিয়ে রাখেন। এখন ভয় দেখাচ্ছেন। বাবার কিছু জমি বিক্রি করেও সুদের টাকা দিয়েছেন সাইদুর। সুদের টাকা দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে গেছেন তিনি।
বেনাপোল ডাবলু মার্কেটের সম্রাট সু স্টোরের মালিক নিয়ামুল জানান, দোকানে মাল তোলার জন্য হাসেম আলীর কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা সুদে নিয়েছিলেন। সুদের টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারেননি তিনি। পরে নিঃস্ব হয়ে দোকান ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন।
ভবেরবেড়ের বাসিন্দা ব্যাংকের পিয়ন (বর্তমানে চাকুরিচ্যুত) আলী আকবার পাঁচ বছর আগে হাসেমের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা সুদ দেওয়ার শর্তে তিন লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। গত এক বছরে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা সুদ দেন। সংসারের খরচ চালিয়ে ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। গত তিন বছরে তিন লাখ টাকা সুদে-আসলে নয় লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। টাকার জন্য বছর দুয়েকআগে আলী আকবরকে শার্শায় আটকে রেখে তার মাকে ডেকে নিয়ে টিপ সই নিয়ে জমি লিখে নেন হাসেম আলী।
এই ব্যাপারে আলী আকবরের মা তফুরন নেছা বলেন, ‘টাকা জামিনদার হিসেবে আমার একটি টিপসই নিয়েছে হাসেম আলী। এখন হঠাৎ করে দেখছি হাসেম আমার বসতভিটা দখল ও আমাদের উচ্ছেদ করতে এসেছে। আমি এবং আমার ছেলে নাকি তাকে আমার বসবাসের বসতভিটা লিখে দিয়েছি। এবিষয়ে আমি বেনাপোল পোর্ট থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছি।’
ফাঁদে পড়া ভুক্তভোগীরা জানান, সুদের কারবারিরা টাকা দেওয়ার সময় জমির দলিল, ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রাখেন। যখন কেউ টাকা ফেরত দিতে না পারেন, তখন ওই চেক স্ট্যাম্পে ইচ্ছেমতো টাকা বসিয়ে তা পরিশোধের দাবি করা হয়।
এভাবে মানুষ ঠকিয়ে সুদের কারবারি হাসেম আলী এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। তার বেনাপোল বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ কয়েকটি জায়গায় বাড়ি ও জমি রয়েছে। সুদের টাকা ফেরত দিতে না পেরে অনেকের কাছ থেকে জোরপূর্বক এসব সম্পদ লিখে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেনাপোলের সাধারণ মানুষও তাকে ‘সুদখোর হাসেম’ বলে এক নামে চেনে।
তবে হাসেম আলী বলেন, ‘আমার বিষয়ে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি নগদ ১৫ লাখ টাকা দিয়ে আকবর আলী ও তার মায়ের কাছ থেকে জমিটা কিনেছি।’
এ ব্যাপারে বেনাপোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বেনাপোল বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান বলেন, ‘চড়া সুদের কারবারিদের কারণে অনেক ছোট-বড় ব্যবসায়ী আজ নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। প্রতি লাখে মাসে ১০-১৫ হাজার টাকার সুদ দিতে না পেরে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। টাকা দিতে না পারলে তারা অত্যাচার-নির্যাতন এমনকি মামলাও কনে। ফাঁকা স্ট্যাম্প বা চেকে স্বাক্ষর রেখে টাকা দিতে না পারলে মূল টাকার দ্বিগুণ বাড়িয়ে লেখে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক এবং স্টাম্পে।’
সুদের কারবারিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।  
শার্শা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা এস এম আক্কাস আলী বলেন, ‘সমবায় সমিতির  লাইসেন্স ছাড়া সমিতি করে কোনো টাকা লেনদেন করা যাবে না। সমবায় নিবন্ধন ছাড়া যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সুদে টাকা লেনদেন করে এবং তা আমাদের অবগত করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
এছাড়া সুদের কারবারিদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে ইউএনও বরাবর আবেদন করে প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি জানান।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেন, ‘অভিযোগ পেলে এসব অবৈধ ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন