বেনাপোল-শার্শার রেড জোনে গমগম করছে মানুষ

আপডেট: 07:02:16 26/06/2020



img
img

স্টাফ রিপোর্টার, বেনাপোল (যশোর) : বেনাপোল পোর্ট থানা ও শার্শা উপজেলার নাভারনে নয়টি গ্রাম রেড জোনের আওতায়। করোনা সংক্রমণে ঝুঁকিপূর্ণ এই এলাকার বাজারগুলো থেকে মানুষকে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষে মাইকিং করা হচ্ছে। জরিমানা করা হচ্ছে। তবু মানুষকে ঘরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
সকাল হতে না হতে বাজারে মানুষের সমাগম বাড়ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কয়েকগুণ। যেন কেনাকাটা শেষই হতে চাইছে না। একজনের গাঁ-ঘেষে আরেকজন দাঁড়িয়ে সওদা করছেন।
বেনাপোল বাজারের চুড়িপট্টির মুখে যেন প্রতিদিন ‘ঈদবাজার’ বসছে। গাদাগাদি করে ইজিবাইক, জেএস, নসিমন-করিমন, মোটর সাইকেলে চলছে সাধারণ মানুষ। অধিকাংশ লোকের মুখে নেই কোনো মাস্ক। শারীরিক দূরত্ব মানার নেই কোনো বালাই।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, বেনাপোল ও শার্শা উপজেলায় (২৫ জুন পর্যন্ত) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্তের সংখ্যা ৪৪। এর মধ্যে ১৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। হাসপাতাল ও বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৫ জন। মারা গেছেন দুইজন। তারা বেনাপোলের বাসিন্দা। আক্রান্তের মধ্যে থানা ও ইমিগ্রেশনের পুলিশ, সাংবাদিক, স্বাস্থ্যকর্মী, বৃদ্ধ, যুবকরা রয়েছেন।
বেনাপোল ও নাভারনের রেড জোনের লকডাউন মানছেন না অনেকেই। রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে রাস্তায় বড়ানো ব্যারিকেড। প্রশাসন মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানালেও স্থানীয়রা অসহযোগিতা করছেন। বেনাপোলের দুর্গাপুর সড়কে দেওয়া ব্যারিকেড কে বা কারা সরিয়ে জনচলাচল উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বাড়িতে টাঙিয়ে দেওয়া লকডাউন সাইনবোর্ডও অনেকে সরিয়ে ফেলছেন।
গত এক সপ্তাহে বেনাপোল শহরের দুই ও তিন নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গাপুর, নামাজগ্রাম, বেনাপোল, পাটবাড়ি ও পোড়াবাড়ি নারায়ণপুর, শার্শা উপজেলার শার্শা সদর ইউনিয়নের কাজিরবেড়, নাভারন রেলবাজার, উত্তর ও দক্ষিণ বুরুজবাগান গ্রামকে রেড জোন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে লকডাউন করা হয়। বেনাপোল পৌরসভার নয় নম্বর ওয়ার্ড ও শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নকে ইয়োলো জোন ঘোষণা করা হয়েছে। এই এলাকা আগে গ্রিন জোনের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলককুমার মণ্ডল, সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোরশেদ আলম চৌধুরী, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার ইউসুফ আলী, শার্শা থানার ওসি বদরুল আলম খান, বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মামুন খান, বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন, শার্শা সদর ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন প্রমুখ দায়িত্বশীলরা রেড জোনের কাজকর্ম দেখভাল করছেন।
নাভারন বাজারটি রেড জোনের ভেতরে পড়ার পরও দোকানপাট ও হাটবাজার খোলা রয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পরও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলাসহ জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের চলাফেরার কারণে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি রেড জোন এলাকায় ঢুকে পড়ছেন। এছাড়া ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলা থাকার কারণে সেবা গ্রহীতাদের ভিড়ও লক্ষ্যণীয়।
বেনাপোল বাজারের পাশ থেকে রেড জোন শুরু হওয়ায় বাজারটি বেলা দুইটা পর্যন্ত খোলা থাকছে। এছাড়া কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অফিস, ট্রান্সপোর্ট ও দূরপাল্লার বাসগুলোর কাউন্টার থাকায় বাজারে সব সময় লোকজন গমগম করছে। রেড জোনের বাসিন্দাদের অনেককেই নিজ জোনের বাইরে এসে বাজারে অনর্থক ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে।
বেনাপোলের কামরুল হাসান (২২) নামে এক যুবক বলেন, ‘একনাগাড়ে বাড়ি বসে থাকতি ভালো লাগছে না। তাই বাজারে আলাম। চা খেয়েই চলে যাবো।’
রেড জোনের কথা বলতেই সঙ্গে থাকা আবু নাইম (২০) বলেন, ‘ও যার হবে তার হবেই। সবাই তো বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বয়সে বাড়ি বসে থাকতি ভালো লাগে!’
শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইউসুফ আলী জানান, প্রতিদিনই নমুনা সংগ্রহ করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারের পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিনই পজেটিভ রিপোর্ট আসছে। তারপরও মানুষের মনে একটুও ভয় নেই। করোনা আক্রান্তরা স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শে নিজ বাসায় আইসোলেশনে আছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই সব বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। এ উপজেলায় ৪৪ জন আক্রান্তের মধ্যে বেনাপোলের নারায়ণপুরের জাকির হোসেন (৫০) ও পাশের নার্সারিপাড়ার মমিনুর রহমান (৬০) নামে দুই ব্যক্তি ইতিমধ্যে মারা গেছেন। ওই দুইজনের রিপোর্টই করোনা পজেটিভ ছিল বলে জানান শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন জানান, তিন নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যেই তার পৌরসভার কার্যালয়। এছাড়া এই ওয়ার্ডে একটি কলেজ, মহিলা ফাজিল মাদরাসা, কমিউনিটি সেন্টার, দশ শয্যার একটি মাতৃস্বাস্থ্য কেন্দ্র, হরিদাস ঠাকুরের পাটবাড়ি আশ্রমসহ অনেক অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র রয়েছে। এসব এলাকা লকডাউন করা হয়েছে।
শার্শা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, “করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে উপজেলার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গুলো ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে আদেশ জারি করেছে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। মানুষ কারণে-অকারণে নানা অজুহাতে বাইরে চলাচলের চেষ্টা করছে। অকারণে বাইরে বের হওয়া মানুষদের বুঝিয়ে আবার বাড়ি ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন