ভারতীয় বাহিনীতে গোর্খা সেনা নিয়ে নেপালে বিতর্ক

আপডেট: 08:29:17 04/08/2020



img

শাকিল আনোয়ার

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপকুমার গাওয়ালি শুক্রবার নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স আয়োজিত অনলাইনে এক আলোচনায় বলেন, নেপাল থেকে গোর্খা সৈন্য নিয়োগ নিয়ে ১৯৪৭-এ ব্রিটেন ও ভারতের সাথে ত্রি-পক্ষীয় চুক্তিটি ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “ভারত ও ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে গোর্খাদের নিয়োগের বিষয়টি ইতিহাসের অংশ হিসাবে নেপাল পেয়েছে। একসময় বিদেশ যাওয়ার জন্য নেপালি যুবকদের অন্যতম রাস্তা ছিল এটি। কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ওই চুক্তির অনেক কিছু এখন অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।’’
গোর্খা সৈন্য নিয়োগের ৭০ বছরের পুরনো চুক্তিটি ব্যাপকভাবে সংশোধন করার একটি প্রস্তাব গত বছরই নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনকে দিয়েছে, যাতে ব্রিটেন এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি।
এখন ভারতের সাথেও এ নিয়ে কথা বলার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কী করতে চাইছে নেপালের সরকার? ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টি কি নেপাল থেকে ভারত ও ব্রিটেনের সৈন্য নিয়োগে ইতি টানার কথা ভাবছে?
কাঠমান্ডুতে সিনিয়র সাংবাদিক এবং নেপালের বৈদেশিক নীতির বিশ্লেষক কমলদেব ভট্টরাই বলছেন, বিদেশি বাহিনীতে নেপালিদের নিয়োগ বেশ কিছুদিন ধরেই কম-বেশি বিতর্কিত একটি ইস্যু। কিন্তু ভারত-চীন সীমান্তে চলতি উত্তেজনায় সেই বিতর্ক নতুন করে চাঙ্গা হয়েছে।
“যখনই চীন-ভারত বা ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ হয়, রণাঙ্গনে গোর্খা সৈন্যদের নিয়ে নেপালিদের মধ্যে উদ্বেগ শুরু হয়। কথা শুরু হয় আদৌ নেপালিদের ভারতের সেনাবাহিনীতে পাঠানো বন্ধের সময় এসেছে কিনা... নিঃসন্দেহে এই আবেগের মাত্রা বেড়েছে,’’ বলেন মি. ভট্টরাই।
ভারতের সেনাবাহিনীতে বর্তমানে ৪০ হাজার নেপালি গোর্খা সৈন্য রয়েছে। তাদের মধ্যে বাড়িতে এসে যারা ছুটি কাটাচ্ছিলেন, লাদাখ সীমান্তে সংকটের পর তাদের দ্রুত তলব করা হয়।
এরপর থেকেই নেপালি মিডিয়ায় লেখালেখিতে, আলোচনা-বিতর্কে এবং বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় খোলাখুলি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যে, চীনের মতো একটি প্রতিবেশী দেশ, যার সাথে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে নেপালিদের ভাড়াটে সৈন্য হিসাবে অংশ নেওয়া নৈতিকভাবে উচিৎ কিনা।
জুন মাসে নেপালের মাওবাদী একটি দল বিবৃতি দিয়ে দাবি করে যে, ভারত যেন এখন গোর্খা সৈন্যদের চীন সীমান্তে মোতায়েন না করে।
সেইসাথে যোগ হয়েছে তিব্বত সীমান্তে কালাপানি এলাকার মালিকানা নিয়ে ভারত ও নেপালের দ্বন্দ্বের বিষয়টি, যা নিয়ে নেপালে নজিরবিহীন ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব তৈরি হয়েছে।

নেপালি জনমত
কিন্তু সরকারের ওপর জনমতের চাপ আসলে কতটা যে তারা সহসাই ভারতের সেনাবাহিনীতে গোর্খা নিয়োগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
কমলদেব ভট্টরাই বলেন, এখনো খুব বেশি চাপ তৈরি না হলেও চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ যদি হয়, তাহলে গোর্খা ইস্যু নিয়ে বিতর্ক আরো বাড়বে।
“চীন-ভারত দ্বন্দ্ব নিয়ে নেপালি সরকার এবং রাজনীতিকদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে, সন্দেহ নেই।’’
তবে যত বিতর্কই হোক না কেন, ভারতের সেনাবাহিনীতে গোর্খা সৈন্য নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে দেখছেন না মি. ভট্টরাই।
“অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ইস্যু এটি। ভারতের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভারতের ওপর নির্ভরতা- এগুলো অগ্রাহ্য করা নেপালের জন্য কঠিন।’’
নেপালে সেনাবাহিনীতে যে বেতন-ভাতা-পেনশন সৈন্যরা পায়, ভারতীয় বাহিনীতে যোগ দিলে তার চারগুণ বেশি টাকা তারা পায়। নেপালে এখন প্রায় দেড় লাখ মানুষ আছেন যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর পেনশনভোগী।

কী চাইছে নেপালের সরকার?
নেপালের ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টি ঐতিহাসিকভাবে বিদেশি বাহিনীতে গোর্খা নিয়োগের বিরোধী।
১৯৯৬ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরুর আগে যে ৪০টি দাবি তারা করেছিল তার অন্যতম ছিল বিদেশি বাহিনীতে নেপালিদের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ২০০৭ সালে শান্তি চুক্তির পর প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরুর পর তারা সেই দাবি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তবে মি. ভট্টরাই বলেন, নেপাল হয়ত ভারতে গোর্খা সৈন্য নিয়োগের শর্তে পরিবর্তন চায়, বিশেষ করে গোর্খাদের মোতায়েনের স্থান নিয়ে।
“সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ অ্যাকাডেমিকদের সাথে কথা বলে বোঝা যায় যে, ভারত যেন ভবিষ্যতে চীন সীমান্তে গোর্খা সৈন্যদের মোতায়েন না করে- এমন কোনো শর্ত আরোপের কথা সরকার হয়ত ভাবছে।’’
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লড়াইতে তাদের বিশেষ পারদর্শিতার জন্য চীন এবং পাকিস্তানের প্রতিটি লড়াইতে ভারত তাদের গোর্খা রেজিমেন্ট ব্যবহার করেছে।

ইতিহাসের বোঝা
ব্রিটেন ও ভারতের সেনাবাহিনীতে নেপাল থেকে সেনা নিয়োগের ইতিহাস বহুদিনের।
গোর্খা যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে নেপালের হেরে যাওয়ার পর ১৮১৫ সালে প্রথম ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে গোর্খাদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর এক চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় বাহিনীতে ছয়টি গোর্খা রেজিমেন্ট থেকে যায়, বাকি চারটি রেজিমেন্ট ব্রিটিশরা নিয়ে যায়।বর্তমানে ভারতের সেনাবাহিনীতে সাতটি গোর্খা রেজিমেন্টে ৪০ হাজার নেপালি সৈন্য রয়েছে।
১৯৪৭ থেকে পাকিস্তান এবং চীনের সাথে প্রতিটি যুদ্ধেই ভারত নেপালি গোর্খা সৈন্যদের ব্যবহার করেছে।
১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে গোর্খা রেজিমেন্টের বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৬৭-তে সিকিম সীমান্তে নাথুলা পাস এলাকায় সংঘর্ষে গোর্খা রেজিমেন্ট চীনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৭ সালে ভুটানের ডোকলাম সীমান্তেও ভারত গোর্খা রেজিমেন্ট মোতায়েন করেছিল।

গোর্খা ইস্যুতে চীন
কমলদেব ভট্টরাই বলেন, তাদের সীমান্তে গোর্খা সৈন্য মোতায়েন নিয়ে চীন নেপালের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো চাপ দিচ্ছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। সে ধরনের চাপ দিয়ে নেপালকে চীন অস্বস্তির মধ্যে ফেলবে, অধিকাংশ পর্যবেক্ষক তা মনে করেন না।
কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই চীন এবং ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা যেভাবে বদলাচ্ছে তাতে ভারতের সেনাবাহিনীতে গোর্খাদের নিয়োগ নিয়ে নেপালে বিতর্ক দিন দিন চাঙ্গা হবে।
২০১২ সালে নেপালে বাবুরাম ভট্টরাই সরকারের সময় বিদেশি সেনাবাহিনীতে গোর্খা নিয়োগ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল সংসদীয় একটি কমিটি। তাদের কথা ছিল- নেপাল একটি জোট নিরপেক্ষ দেশ, সুতরাং অন্য কোনো দেশের সেনাবাহিনীতে নেপাল সৈন্য পাঠাতে পারে না।
সেই সুপারিশ গত আট বছরে বাস্তবায়ন হয়নি, কিন্তু তা নিয়ে নেপালে বিতর্ক বাড়ছে।
সাউথ এশিয়া জার্নাল সাময়িকীতে সাম্প্রতিক এক মন্তব্য প্রতিবেদনে নেপালের সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হরিপ্রসাদ শ্রেষ্ঠা লিখেছেন, “অন্য দেশের সেনাবাহিনীর অংশ হয়ে বন্ধু কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেপালিদের অংশ নেওয়া নেপালের জন্য ইতিবাচক কোনো কাজ নয়, এবং একটা সময় এতে নেপালের স্বার্থের ক্ষতি হতে পারে।’’
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন