ভিক্ষার ঝুলি হাতে 'মুক্তিযোদ্ধা' হামিদ!

আপডেট: 05:33:20 16/12/2020



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : একাত্তরে যারা অস্ত্র হাতে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন, তাদেরই একজন সাতক্ষীরার আবদুল হামিদ। ভাগ্য বিড়ম্বনায় মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর এই সময়ে তার হাতে ভিক্ষার ঝুলি। বাড়িঘর জমি সব হারিয়ে তার আশ্রয় এখন সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামের পরিত্যক্ত গ্যালারির নিচে পলিথিন ঘেরা ঝুপড়িতে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের নাংলা গ্রামের হারেজ মোল্লার ছেলে আব্দুল হামিদ। তার বড়ভাই ফজল আলী সানা ও একমাত্র বোন অমেলা।
খুলনার কয়রা উপজেলার মঠবাড়ি গ্রামের নানা জেহের আলী গাজীর বাড়ি থেকে হায়াতখালি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতেন হামিদ। ওইসময় পাশের গ্রাম গোবিন্দপুরের আব্দুল কাদেরের আহ্বানে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন হামিদ। ভারতের বহেরায় মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র হাতে নিয়ে মাতৃভূমি রক্ষায় যুদ্ধে যান বীরযোদ্ধা হামিদ। আট নম্বর সেক্টরে মেজর জলিলের তত্ত্বাবধানে আবদুল হামিদ খুলনার চুকনগর, খুলনা ও বাগেরহাটের কয়েকটি স্থানে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। তার সহযোগী ছিলেন কয়রার কেরামত আলী ও আব্দুল জব্বার।
চাচা রাজাকার আলী সানা খুলনায় রেললাইনে ফেলে বাবা হারেজ মোল্লাকে হত্যা আর বড়ভাই ফজর আলীকে ভাতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলেন আলী সানা। পৈত্রিক ২০ বিঘা নয় শতক জমি জালিয়াতির মাধ্যমে দখলে রেখেছে আলী সানার আট ছেলে।
যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরলেও জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে আলী সানার ভয়ে সুন্দরবনে পালিয়ে যান তিনি। পরে সেখান থেকে ফিরে জমির মায়া ও বাড়ি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো পথ ছিল না। ১৯৭৮ সালে প্রতাপনগরের রুইয়ার বিলের মান্দার সানার মেয়ে মোমেনাকে বিয়ে করেন হামিদ। তাদের কোনো সন্তান নেই। স্থানীয় মেম্বারের কথামতো নাংলা গ্রাম ছেড়ে ৩৫ বছর আগে বসবাস শুরু করেন সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামের পরিত্যক্ত গ্যালারির নিচে, পলিথিন ঘিরে। জমি নিয়ে মামলা চলায় মাঝে মাঝে গ্রামে যেতেন। গত চার বছর ধরে শারীরিকভাবে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন আর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। স্ত্রী মোমেনা তাকে নিয়ে ভিক্ষা করে সংসার চালান। এখান থেকে অনেকেই তাদের তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রয়াত আইনজীবী তপনকুমার চক্রবর্তী তাদের থাকতে সহায়তা করেন। অনেকেই স্বামী আব্দুল হামিদকে ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য মোমেনাকে প্রস্তাব দেয়। বয়সের ভারে ও অসুস্থতার কারণে লাঠির ওপর ভর করে ভিক্ষা করে সংসার চালানো ও চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া যেখানে বসবাস করেন, সেখানে কোনো গরম কাপড়, এমনকী একটি মাদুরও না থাকায় মানবেতর জীবন কাটছে হামিদ দম্পতির।
মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় হামিদের নাম নেই। কোনো ভাতাও পান না তিনি। যুদ্ধকালীন যে সার্টিফিকেট ও অন্যান্য দালিলিক কাগজপত্র পেয়েছিলেন, তাও হারিয়ে ফেলেছেন। এখন সেই মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ খানিকটা অপ্রকৃতিস্থ। কিছুক্ষণ কথা বলার পর সারা শরীর কাঁপতে থাকে তার।
আবদুল হামিদ সানা ভিক্ষা করে বাসায় ফেরার পর সুবর্ণভূমিকে বলেন, 'শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। প্রয়োজনে আমার সম্পর্কে যাচাই করে দেখা হোক। অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকতে চাই না। ফিরে পেতে চাই পৈত্রিক ভিটা।' সরকারি কোনো ভাতা না পেলেও করোনাকালে সেনাবাহিনী তাকে দু’বার চাল দিয়েছে।
মোমেনা খাতুন বলেন, 'আমাদের কোনো সন্তান নেই। স্যাঁতসেতে জায়গায় থেকে স্বামীর শরীর ভেঙে পড়েছে। এখন ভিক্ষে করতে নিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বামী মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পেলে খুশি হবো।'
সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলের স্টেডিয়ামের পাশের কয়েকজন দোকানি বলেন, আশাশুনির বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদের কষ্টের জীবন দেখা যায় না। তারা সরকারের কাছে আব্দুল হামিদের আশ্রয় দাবি করেন।
আনুলিয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোক্তার হোসেন বলেন, 'আব্দুল হামিদ নামে কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম আমাদের জানা নেই। তাছাড়া দীর্ঘদিন কয়রা ও সাতক্ষীরায় থাকায় তাকে চেনার কথাও নয়।'
তবে, খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।
আশাশুনি উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল হান্নান বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। সহযোগী হিসেবে কয়রার মুক্তিযোদ্ধা কেরামত আলী ও আব্দুল জব্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
হামিদ মুক্তিযোদ্ধা হলে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য তিনি সব ধরনের চেষ্টা চালাবেন। পলাশপোলে যেয়ে আব্দুল হামিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কথা বলার সময় হামিদের শারীরিক অবস্থা ও বাসস্থান দেখে কষ্ট পেয়েছেন।
আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলেন, অনেক মুক্তিযোদ্ধা জীবদ্দশায় সম্মান না পেলেও রাজাকাররা আর্থিক সুবিধা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর আলিফ রেজা বলেন, 'সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরে আব্দুল হামিদ সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা যদি নাও হন তবুও তাকে বর্তমান সরকারের গৃহযোজনার আওতায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।'

আরও পড়ুন