ভ্যানের চাকায় স্বপ্ন বুনছেন প্রতিবন্ধী মাসুদ

আপডেট: 07:09:40 07/01/2021



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : দিনের শুরুতে ভ্যানের চাকা না ঘুরলে পেটে ভাত জোটে না প্রতিবন্ধী মাসুদের পরিবারের। নিজের ভ্যান না থাকায় ভাড়ার ভ্যান চালিয়ে কোনমতে সংসার চালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি। অথচ একটি মোটরচালিত ভ্যান হলে সংসারটা ভালো ভাবে চলতো বলে মনে সংগ্রামী মাসুদ।
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চাচই গ্রামের মধ্যপাড়ায় চার শতক জমির ওপর পাটখড়ি ও পলিথিনে মোড়ানো ছোট ঘরে বসবাস করেন প্রতিবন্ধী মাসুদসহ তার পরিবার। তার পিতা বাকা মোল্লা ও মাতা মনোয়ারা বেগম মারা গেছেন অনেক আগেই। প্রতিদিন সকালে না খেয়ে তিন চাকার একটি ভাড়ায় চালিত মোটর ভ্যান নিয়ে যাত্রীর খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন মাসুদ। অনেক সময় যাত্রীরা মাসুদের দুটি পা বিকলাঙ্গ দেখে ভ্যানে উঠতে চায় না। এরপরও সারাদিনের প্রচেষ্টায় মাসুদ তিন থেকে চারশ’ টাকা উপার্জন করেন। আর ওই টাকায় তার তিন সদস্যের সংসারের খরচ এবং একমাত্র ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালান।
মাসুদ জানান, দিন শেষে ভ্যান মালিককে ভাড়া বাবদ গুনতে হয় ১৬০ টাকা। ফলে বাকী টাকা দিয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও একমাত্র ছেলে রাজু মোল্লার পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ছেলে বর্তমানে লোহাগড়া সরকারি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। প্রতিবন্ধী মাসুদের স্বপ্ন তার ছেলে লেখাপড়া শিখে একদিন অনেক বড় হবে। উপার্জন করে সংসারের হাল ধরবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাসুদের ঘরটি পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের আসামানি কবিতার সেই আসমানিদের ঘরের মতো। কালের বিবর্তনে বেন্না পাতা হাঁরিয়ে যাওয়ায় পাটখড়ি ও পলিথিন দিয়ে একটি ঘর তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন মাসুদসহ তার পরিবার।
মাসুদ আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার ছেলে যখন আমার কাছে লেখাপড়ার খরচের টাকা চায়, তখন নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। মনে হয় আমি যেন জগতের একমাত্র ব্যর্থ পিতা। যতদিন আমার দেহে প্রাণ আছে ততদিন আমি যে কোন কর্ম করেই হোক সংসারের খরচ জোগাড় করবো কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি করবো না’।
তিনি আরো জানান, তার বয়স যখন চার বছর তখন কালো জ্বর হয়েছিল। বাবা মায়ের চিকিৎসা করানোর টাকা না থাকায় পা দুটি বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। এরপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে জীবনের ছত্রিশটি বছর পার করেছেন।
মাসুদ আফসোস করে বলেন, ছত্রিশ বছর ধরে আমি প্রতিবন্ধী অথচ মাত্র আড়াই বছর পূর্বে ২০১৭ সালে জয়পুর ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় একটি প্রতিবন্ধী কার্ড পেয়েছি এবং তাতে যে ভাতার টাকা পাই তা আমার চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য।
তিনি আরো বলেন, ভাড়ার ভ্যান চালিয়ে যা উপার্জন করি তাতে সংসার ও ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালানো খুবই কষ্টসাধ্য। আবার আমার নিজেরও সামর্থ্য নেই যে, একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান কিনবো। সমাজের বিত্তবান কেউ যদি আমাকে একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান কিনে দিত তাহলে হয়তো আমার সংসার আরেকটু ভালোভাবে চলতো।
এ ব্যাপারে জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতার ফকির বলেন, ২০১৭ সালে প্রতিবন্ধী মাসুদকে একটি কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। মোটরচালিত ভ্যান পাওয়ার ব্যাপারে তিনি সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা করবেন।

আরও পড়ুন