মণিরামপুরে কোয়ার্টার বরাদ্দে বিস্তর অনিয়ম

আপডেট: 11:23:39 09/10/2021



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর): মণিরামপুর উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টার বরাদ্দে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
পরিষদের কোয়ার্টার বরাদ্দে মানা হয়নি কোনো নিয়মনীতি। কর্মচারীর নামে কোয়ার্টার ভাড়া নিয়ে এখানে থাকছেন কর্মকর্তারা। পরিষদে চাকরি করেন না- এমন লোকও থাকছেন কোয়ার্টারে। এছাড়া, প্রভাব খাটিয়ে পরিষদের গেজেটেড কোয়ার্টারে থাকছেন দ্বিতীয় শ্রেণির এক কর্মকর্তা।
আবার অনেকের বিরুদ্ধে ভাড়া পরিশোধ না করার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন এভাবে চলে আসলেও এসব অনিয়ম রোধে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা।
উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টার বরাদ্দ দেওয়া, কোয়ার্টার বসবাসের উপযোগী কি না এবং ভাড়া ঠিকমতো আদায় হচ্ছে কি না- এসব দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা প্রকৌশলীর।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিষদের কোয়ার্টারে কখন কে উঠছেন বা নামছেন, কে কত ভাড়া দিচ্ছেন বা দিচ্ছেন না- এই সংক্রান্ত পুরো তথ্য নেই দপ্তরটিতে।
যদিও তথ্য আইনে আবেদন করে এ সংক্রান্ত  কিছুটা তথ্য মিলেছে। সেই তথ্যসূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবুজার সিদ্দিকী এক বছরেরও অধিক সময় থাকছেন পরিষদের ‘হাসনাহেনা’ কোয়ার্টারে। তিনি নিজের নামে বরাদ্দ না নিয়ে একই দপ্তরে প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. মো. সাময়ানের নামে কোয়ার্টার নিয়েছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবুজার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি যে সরকারি কোয়ার্টারে থাকি সেটা যেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ না জানেন সেজন্য সাময়ানের নামে বরাদ্দ নিয়েছি।’
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মৌসুমি আক্তার দীর্ঘদিন থাকেন ‘চামেলী’ কোয়ার্টারে। তিনিও অফিসের প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া ট্রেনার মাফুজুর রহমানের নামে ঘর বরাদ্দ নিয়ে থাকছেন।
জানতে চাইলে মৌসুমি আক্তার বলেন, ‘কোয়ার্টার থাকার উপযোগী না হওয়ায় স্টাফের নামে বরাদ্দ নিয়েছি।’
উপজেলা প্রকৌশল অফিসের হিসাব সহকারী আলী কদর একই দপ্তরের প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া দিলীপকুমার সানার নামে বরাদ্দ নিয়ে থাকেন ‘জুঁই’ কোয়ার্টারে।
আলী কদর বলেন, ‘মণিরামপুরে যোগদানের পর থেকে দেখছি একজন অন্যজনের নামে কোয়ার্টার নিয়ে থাকছেন। তাই আমিও একইভাবে উঠেছি।’
উপজেলার লাউড়ি কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ কেএম মফিজুর রহমান উচ্চবেতনে চাকরি করেন। উপজেলা পরিষদের বাইরে একটি একতলা বাড়ি রয়েছে তার। সেই বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন তিনি।
এই অধ্যক্ষ উপজেলা পরিষদ মসজিদের ইমাম হওয়ায় দেড় হাজার টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে ২০১৩ সাল থেকে পরিবার নিয়ে থাকছেন ‘জুঁই’ কোয়ার্টারে।
মণিরামপুর উপজেলা পরিষদে ইউএনও এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের বাসভবন বাদে দ্বিতল বিশিষ্ট ‘হাসনাহেনা’, ‘জুঁই’ ও ‘চামেলী’ নামে তিনটি কোয়ার্টার রয়েছে। তিন কোয়ার্টারে ১২ জন কর্মকর্তা থাকতে পারবেন। তারমধ্যে হাসনাহেনা কোয়ার্টারটিতে চারজন গেজেটেড কর্মকর্তা থাকার বিধান রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হয়েও এই কোয়ার্টারে দীর্ঘদিন থাকছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদ। ফলে পরিষদে কর্মরত গেজেটেড কর্মকর্তারা চাইলেও কোয়ার্টারে উঠতে পারছেন না।
বিষয়টি জানতে একাধিকবার এই কর্মকর্তার ফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে, পরিষদে ব্যাচেলর ভবনে (ডরমেটরি) রয়েছে ১৮টি বেড। সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে কেউ কেউ থাকছেন বলে অভিযোগ। ভবনের দোতলায় বিনোদনের কক্ষটি রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মফস্বল এলাকায় সরকারি কর্মকর্তারা মূল বেতনের ৩৫-৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া পান। উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টারে যারা থাকেন তারা কেউ সেই অনুপাতে ভাড়া দেন না বলে অভিযোগ।
উপজেলা প্রকৌশল অফিসের একটি সূত্র বলছে, অনেক আগে রেজুলেশনের মাধ্যমে গেজেটেড কোয়ার্টারের ভাড়া তিন হাজার ২০০ টাকা ও বাকি দুটি কোয়ার্টারের ভাড়া দুই হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেকে ঠিকমতো এই ভাড়াও দেন না বলে অভিযোগ। ফলে পরিষদ প্রতিমাসে অনেক টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কোয়ার্টারে বসবাসকারীদের অভিযোগ, কোনো কোয়ার্টার বসবাসের উপযোগী নয়। এখানে ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। পলেস্তরা খসে পড়ছে। পানির সমস্যাও রয়েছে।
জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী সানাউল হক বলেন, কোয়ার্টার নিয়ে সব তথ্য দিতে গেলে সময় লাগবে। তবে একজনের নামে বরাদ্দ নিয়ে অন্যজন থাকাটা অন্যায়।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমা খানম বলেন, ‘গত বছর ভাড়া নিয়ে সমস্যা দেখতে পেয়ে কয়েকজনকে নোটিস করেছি। এর অতিরিক্ত কোনও পদক্ষেপ নিতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘‘একটি চিঠি করে দ্রুত ইউএনও’র কাছে কোয়ার্টার সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য চাইবো। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।’’ কোয়ার্টারে সমস্যা থাকলে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে রাজস্ব আদায়ের কাজকে ত্বরান্বিত করা হবে বলে জানান নাজমা খানম।

আরও পড়ুন