মণিরামপুরে ঘর দেওয়ার নামে বিপুল টাকা বাণিজ্য!

আপডেট: 09:27:32 27/02/2021



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের ঝাঁপা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সামছুল হক মন্টু ও তার পরিষদের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুস্থ, অসহায় ও ভিক্ষুকদের মতো প্রান্তিক পর্যায়ের চার শতাধিক লোকের কাছ থেকে ঘরের লোভ দেখিয়ে জনপ্রতি পাঁচ  হাজার থেকে দশ হাজার টাকা করে নিয়েছেন তারা। অবশ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্যের দাবি, ঘরের জন্য টাকা দেওয়া ভুক্তভোগীর সংখ্যা এক থেকে দেড় হাজার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এ অনিয়মের সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছেন চেয়ারম্যান মন্টু তার সংরক্ষিত দুই নারী ইউপি সদস্য লাকী খাতুন ও শাহিনারা খাতুন, দুই ইউপি সদস্য ইউছোপ আলী ও আব্দুর রশিদ এবং ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তা ডলি খাতুন।
সরেজমিনে শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দিনভর অন্তত ৫০ জন ভুক্তভোগীর সাথে কথা হয়েছে সুবর্ণভূমির। তারা সবাই টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও চেয়ারম্যান সামছুল হক মন্টু দাবি করছেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে এসব 'মিথ্যে অভিযোগ' আনছেন প্রতিপক্ষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আড়াই বছর আগে ঝাঁপা ইউনিয়নে 'জমি আছে ঘর নাই' আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় একলাখ টাকার ১০৩টি ঘরের বরাদ্দ আসে। ওই ১০৩টি ঘরকে পুঁজি করে শুরু হয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের অর্থবাণিজ্য। নতুন ঘর পেতে গৃহহীনরা ছুটতে থাকেন চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে। তখনই ঘরপ্রতি দশ হাজার টাকা করে দাবি করেন জনপ্রতিনিধিরা। টাকা ছাড়া ঘর মিলবে না ভেবে ধার-দেনা করে বা সুদে টাকা নিয়ে অসহায় দুস্থরা চেয়ারম্যান মেম্বারদের হাতে টাকা তুলে দেন।
তবে গরিবের বিপুল টাকা পকেটস্থ হলেও গত আড়াই বছরে কাউকে একটি ঘর দিতে পারেননি মন্টু চেয়ারম্যান। ঘর কিংবা টাকা ফেরত- কোনোটা না পেয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পিছু হাঁটতে হাঁটতে হয়রান হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। ঘরের আশায় এবং ভয়ে মন্টু চেয়ারম্যান ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে এতদিন কেউ মুখ না খুললেও বিপত্তি ঘটে দুই-তিনদিন আগে। গত বুধবার ভুক্তভোগী চার নারী উপজেলার রাজগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আবুল বাসারের শরণাপন্ন হন। তখন তাদের একটি ছবি নিজের ফেসবুকে ছাড়েন আবুল বাসার। এই নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে পরের দিন চার নারীর মধ্যে তিনজনকে ডেকে দশ হাজার করে ৩০ হাজার টাকা ফেরত দেন ঝাঁপা ইউপির উদ্যোক্তা ডলি খাতুন। তিনি ওই তিনজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। তিনজনের টাকা ফেরতের বিষয়টি প্রচার হলে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ মুখ খুলতে শুরু করেন। যার মধ্যে ৭০-৮০ জনের একটি তালিকা এসেছে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে।
ঝাঁপা উত্তরপাড়ার ভিক্ষুক রাশিদা বলেন, 'আমার মা ও আমি ভিক্ষা করে খাই। থাকার ঘর নেই। আমাদের গ্রামের আব্দুল আজিজ নামে একজন সরকারি ঘর পাইছে। তাই দেখে আমি চেয়ারম্যানের কাছে যাই। তিনি ঘর বাবদ দশ হাজার টাকা চান। সমিতি (এনজিও) থেকে দশ হাজার টাকা তুলে চেয়ারম্যানের হাতে দিছি। আজও ঘর পাইনি।' একই পাড়ার ফাতিমা নামে এক বিধবা নারী দুই বছর আগে চেয়ারম্যানকে চার হাজার টাকা দিয়েও ঘর পাননি বলে জানিয়েছেন। একই পাড়ার ভিক্ষুক মাজেদা, কুলসুম, রোকেয়া ও রাবেয়া ঘরের আশায় দশ হাজার করে টাকা দিয়েছিলেন উদ্যোক্তা ডলির কাছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে টাকা ফেরত দিলেও রাবেয়ার টাকা ফেরত দেননি ডলি। তবে ডলি খাতুন টাকা নেওয়া বা ফেরত দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি।
একইভাবে হানুয়ারের তিনটি ওয়ার্ডের বহু অসহায় নারী-পুরুষকে ঘর দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নারী ইউপি সদস্য লাকী খাতুনের বিরুদ্ধে। হানুয়ার কলেজপাড়ার ফাতেমা, রহিমা, পরিজান ও ফুলি বেগম নামে চার নারী লাকী মেম্বারকে পাঁচ হাজার এবং বৃদ্ধ হাসান সাড়ে সাত হাজার টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে লাকী মেম্বার টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেননি।
দোঁদাড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক মিলন ও মনোয়ারা বেগম জানান, তারা মেম্বার শাহিনারাকে ঘরের আশায় দশ হাজার করে টাকা দিয়েছেন। শুধু মিলন বা মনোয়ারা নন, ওই গ্রামের অন্তত ২০ জন দুস্থ লোক মহিলা মেম্বারকে দশ হাজার করে টাকা দিয়ে বিপাকে আছেন।
ঝাঁপা ইউনিয়নের ষোলখাদা গ্রামের অন্তত ২০ জনের কাছ থেকে ইউপি সদস্য শাহিনারা খাতুন, মেম্বার ইউছোপ আলী ও চেয়ারম্যান মন্টুর দোসর সিদ্দিক নামে একব্যক্তি দশ হাজার করে টাকা নিয়ে ঘর দেননি। হানুয়ার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে একই প্রকল্প দেখিয়ে হাজার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে ভুক্তভোগী আবু মুসা সাত হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন। তবে অভিযুক্তদের একাধিকবার মোবাইলে কল করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
জানতে চাইলে চেয়ারম্যান সামছুল হক মন্টু বলেন, 'ঘর দেওয়ার বিষয়ে আমি কারও কাছ থেকে একটি টাকা নিইনি। প্রকাশ্যে ইউনিয়নের সবাইকে নিষেধ করেছি, মেম্বাররা কোনো ব্যাপারে টাকা চাইলে দেবেন না। প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে চক্রান্ত করছে।'
তবে ঘরের নামে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীসহ ঝাঁপা ইউনিয়নের সচেতন মানুষ।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, ঘর দেওয়ার কথা বলে ঝাঁপা ইউপির চেয়ারম্যান-মেম্বারদের টাকা নেওয়ার ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে।

আরও পড়ুন