মণিরামপুরে ২০ দিনে কুপিয়ে পিটিয়ে তিনজনকে হত্যা

আপডেট: 02:35:42 18/02/2021



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : গত ২০ দিনে মণিরামপুরে এক যুবক ও দুই ছাত্রকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুই ছাত্রের মধ্যে একজনকে ছিনতাইকারী এবং অপরজনকে চোর সন্দেহে নির্যাতন করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের দুটি ঘটনা ঘটেছে কাশিমনগর ইউনিয়নে, বাকিটা ঝাঁপায়। নিহতদের মধ্যে দুইজনের বিরুদ্ধে মাদক ও চুরির অভিযোগ রয়েছে অহরহ।
তিনটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ জড়িত কয়েকজনকে আটকও করেছে।
পিটিয়ে ও কুপিয়ে তিন হত্যার প্রথমটি ঘটে কাশিমনগর ইউনিয়নের শিরিলি মদনপুর গ্রামে গত ২৯ জানুয়ারি রাত নয়টার দিকে। ওই গ্রামের আমিন মোড়লের ছেলে মুকুল হোসেন বাড়ির পাশে মাছের ঘেরে গেলে চোখে লাইট মারা নিয়ে এলাকার মোন্তাজ আলীর ছেলে টিপু সুলতানের সাথে তার কথাকাটাকাটি হয়। এরপর মোন্তাজ আলী ও টিপুসহ তাদের লোকজন পিটিয়ে ও কুপিয়ে মুকুলকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখে। পরে রাত দশটার দিকে স্বজনরা তাকে যশোর সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মুকুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবর পেয়ে ওই রাতেই মণিরামপুর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে। যাদের নাম উল্লেখসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করেন মুকুলের বাবা। পরে পুলিশ মাজেদা বেগম নামে আরেক আসামিকে আটক করলেও বাকিরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নিহত মুকুলের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে থানায় আটটি মামলা রয়েছে। তিনি এলাকায় 'মাদকের কারবারি' হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মুকুলের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই জিয়াউল হক। তিনি বলেন, মুকুল হত্যার ঘটনায় সাতজন এজাহারনামীয় আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারমধ্যে টিপু ও দীপু নামে দুইজন আদালতে খুনের দায় স্বীকার করেছেন। বাকি তিন আসামি এলাকা ছাড়া। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
মণিরামপুরে পিটিয়ে হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে চলতি মাসের ৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার। ওইদিন সকালে মোটরসাইকেল ছিনতাইকারী সন্দেহে বোরহান কবির নামে দ্বাদশ শ্রেণির এক মেধাবী ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে নাইম হোসেন নামে এক যুবক। পরদিন রোববার ভোরে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় বোরহানের। ওই ঘটনায় পুলিশ নাইমকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়।
বোরহান উপজেলার বিজয়রামপুর গ্রামের আহসানুল কবিরের ছেলে। তিনি মণিরামপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ঘটনার দিন সাইকেল চালিয়ে তিনি উপজেলার খালিয়ে গ্রামে যান। তার কয়েকদিন আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন বোরহান।
তবে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হলেও ছিনতাইতো দূরের কথা কখনো বোরহানকে নিয়ে একটা চুরির অভিযোগ দিতে পারেননি কেউ।
বোরহান হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই সাহাবুল আলম বলেন, নাইমকে একদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অধিকতর তদন্ত চলছে। মামলার স্বার্থে এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
এদিকে, বোরহান হত্যার ঘটনায় আরো একজনকে আসামি করতে আদালতে আবেদন করেছেন বোরহানের বাবা। তবে সেই ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো তথ্য পাননি বলে জানিয়েছেন।
এছাড়া, মণিরামপুরে পিটিয়ে হত্যার তৃতীয় ঘটনাটি ঘটেছে ১৬ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাতে উপজেলার খোজালিপুর গ্রামে। ওই গ্রামের মশিয়ার গাজীর আলিম দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া ছেলে মামুন হাসানকে চোর সন্দেহে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের ১২ ঘণ্টা পর হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। ওই ঘটনায় বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিহতের বাবা ১২ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেছেন। মামুনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ খুব দ্রুত জড়িত অভিযোগে একই এলাকার সোহাগ, আলতাফ ও লাভলুকে গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১১ টায় খোজালিপুর গ্রামের আয়নালদের বাড়িতে মোবাইল ফোন চুরি করতে গিয়ে সহযোগী আরমানের সাথে ধরা পড়েন মামুন। তখন ক্ষিপ্ত লোকজন মামুনকে হাত-পা বেঁধে মারপিট করা হয়। বুধবার সকালে পুলিশের সহায়তায় স্বজনরা তাকে মণিরামপুর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল তিনটার দিকে মারা যান মামুন।
মামুন নেশাগ্রস্ত ছিলেন। নেশার টাকা যোগাড় করতে তিনি নিজগ্রামসহ আশপাশের গ্রামে বৈদ্যুতিক সেচপাম্প (মোটর) ও মোবাইল চুরি করতেন। আটমাস আগে একবার মোবাইল চুরির অভিযোগে মামুনের বিরুদ্ধে গ্রাম্য সালিশ হয়।
এছাড়া, চুরির অভিযোগে মামুনের বিরুদ্ধে মণিরামপুর থানায় কখনো কোনো মামলাও হয়নি।
জানতে চাইলে মণিরামপুর থানার ইনসপেক্টর (তদন্ত) শিকদার মতিয়ার রহমান বলেন, মণিরামপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল। অপরাধ দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে। বিচ্ছিন্ন তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। জড়িতদের মধ্যে অনেককে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

আরও পড়ুন