মহামারীকালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত কেন

আপডেট: 09:25:19 29/06/2020



img

কাদির কল্লোল : বাংলাদেশে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে শ্রমিকরা সোমবার তাদের সন্তানদের নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। অন্যদিকে, এই কর্মসূচির পরই সরকারের শ্রম প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে পাটকল শ্রমিকনেতাদের বৈঠক কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ার পর তারা আমরণ অনশন করার হুমকি দিয়েছেন।
সরকার অব্যাহত লোকসানের কথা তুলে ধরে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক কর্মসূচির মাধ্যমে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
কিন্তু করোনাভাইরাস দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে যখন বেসরকারি খাতে অনেকে চাকরি হারাচ্ছেন, তখন সরকার এমন পদক্ষেপ কেন নিয়েছে, পাটকল শ্রমিকরা সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
সরকার বলেছে, অনেক আগের সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দিয়ে অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা এক হয়ে ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছেন।
এই আন্দোলনের প্রথমদিনে আজ সরকারি প্রতিটি পাটকলের গেটের সামনে শ্রমিকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দুই ঘণ্টা অবস্থান করেছেন।
পাটকল শ্রমিকনেতারা শ্রম প্রতিমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সোমবার তার সঙ্গে বৈঠকেও যোগ দিয়েছিলেন। সেই বৈঠকে কোনো ফল হয়নি।
শ্রমিকনেতারা বলছেন, করোনাভাইরাস দুর্যোগের এই সময়ে সরকার কেন তাদেরকে অবসরে পাঠাচ্ছে, এই প্রশ্নে তারা সঠিক কোনো জবাব পাননি।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, পাটকলগুলো বছরের পর বছর ধরে লোকসানে থাকায় এখন এগুলো বন্ধ করা ছাড়া সরকারের বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, এখন শ্রমিকরা তাদের পাওনা ঠিকমতো পাচ্ছেন কিনা- সেটা নিশ্চিত করা উচিত।
"রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লোকসান দিতে দিতে এমন জায়গায় এসে পৌঁছায়ছে যে, এখন এটা সামনে নাকি পিছনের দিকে যাবে, এটা বোঝার মতো শক্তি আমরা হারায় ফেলছি।"
তিনি আরো বলেছেন, "এখন আর আগে-পরের বিষয় নয়। এখন গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের যে কথা বলা হইছে,তাতে একজন শ্রমিক ১২ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা পাবে। আর সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ টাকাও পাবে। একসাথেই তা দেওয়া হবে। সুতরাং এখন আর তখন বড় বিষয় নয়, শ্রমিকরা যাতে না ঠকে, সেটাই হচ্ছে বড় কথা।"
শ্রমিকনেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে খুলনার খালিশপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি পাটকল বন্ধ করা হয়েছিল।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেগুলোও চালু করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লাভজনক করার জন্য সংস্কার কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছিল।
তারা মনে করেন, সেই কার্যক্রমও গাফিলতি এবং অবহেলার ফাঁদে পড়েছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহানা শারমিন বলেছেন, সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং আধুনিকায়ন না করার কারণে পাটকলগুলো লোকসানেই থাকছে। কিন্তু দায়ভার শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে তাদেরকেই বিদায় করা হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
"২০১৬সালেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর খরচ এবং লাভ সমান সমান ছিল। লোকসান ছিল না। ২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যা করা হচ্ছে, তা হচ্ছে, পাট কেনা হচ্ছে না সময়মতো। তারপর যে পণ্য তৈরি হচ্ছে, তা সরকারের করপোরেশনের খামখেয়ালির কারণে বাজার পাচ্ছে না।
''পাটের মৌসুমেও একটা দাম ঠিক করে দেওয়া হয়। ফলে ভালো পাট পাওয়া যায় না। খামখেয়ালি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে তিন বছর ধরে লোকসান হচ্ছে। এর কারণ কিন্তু খতিয়ে দেখা হয় না," বলছেন শাহানা শারমিন।
খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-এই চারটি বিভাগে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন।
গত দুই বছর ধরে তাদের বেতন ভাতাও আদায় করতে হয় আন্দোলন করে। এখন তাদের অবসর নেওয়ার প্রশ্ন এসেছে।
তারা এই করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝে চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না।
তবে পাটকলের লোকসানের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ মানতে রাজি নন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী।
রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বেসরকারি অংশীদারিত্বে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা সরকারের নীতির বড় ধরনের পরিবর্তন।
মন্ত্রী বলেছেন, তিনি বলেছেন, শত শত কোটি টাকা লোকসানের কারণে এই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে কররোনাভাইরাস পরিস্থিতিকে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
"এত লোকসান। এরপরে ব্যয়ের ক্ষেত্রে তাদের বেতনই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যায়। আর অন্য সমস্যাতো আছেই।"
বিভিন্ন সময় বেতন ভাতার দাবিতে পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনের সমালোচনা করে পাটমন্ত্রী বলেছেন, "প্রতি তিন মাস পর পরই এরা আন্দোলন করে রাস্তায় নেমে সরকারের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে যায়। আমাদের ব্যাংকে দেনা আছে। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব বিল বাকি আছে।।"
তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০১৪ সালে প্রায় নয় হাজার শ্রমিক অবসরে গেছেন, তাদের পাওনা দেওয়া হয়নি। সেই টাকা ভাঙিয়ে এখন কল চালানো হচ্ছে।
"এখন ২৫ হাজার শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক-এর আওতায় সব পাওনা দিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এছাড়া ব্যাংকের বকেয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের জন্য প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা দেনা রয়েছে।"
মন্ত্রী মি. গাজী আরো বলেছেন, "এই টাকাগুলো এখন শোধ করতে হবে এবং যত তাড়াতাড়ি এটা মুক্ত করতে পারবো তত তাড়াতাড়ি বেসরকারি অংশীদারিত্বে দিয়ে নতুন করে শুরুর চেষ্টা করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই কাজ দ্রুত ছয় মাসের মধ্যে করতে পারবো কিনা- আমি বলেছি পারবো। আমরা এক বছর আগে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু তা করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে।"
শ্রমিকনেতারা বলেছেন, করোনাভাইরাস দুর্যোগে সরকারের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকার তড়িঘড়ি করে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা-এই প্রশ্ন তাদের মধ্যে রয়েছে।
পাটকলশ্রমিকরা মঙ্গল এবং বুধবার প্রতিটি কারখানার গেটে অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছেন। এরপর তারা আমরণ অনশনের কর্মসূচি রেখেছেন।
এদিকে বিরোধীদল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন