মহেশপুরে অর্ধশত পুকুরে ‘মণিপুরি ইলিশ’

আপডেট: 01:42:48 22/09/2020



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : বাজারে প্রায় সময়ই ইলিশ মাছের দাম চড়া, ইচ্ছা থাকলেও সবার কেনার ক্ষমতা নেই। আবার বছরের অধিকাংশ সময় ঠিকমতো ইলিশ পাওয়াও যায় না। জাতীয় এই মাছটির স্বাদ তাই অনেকের কাছেই আজ যেন অচেনা।
এমন পরিস্থিতিতে ঝিনাইদহের মহেশপুরে শুরু হয়েছে ‘মণিপুরি ইলিশ’-এর চাষ। মাছটি দেখতে মাথার অংশ ইলিশের আর পেছনের অংশ পুঁটি মাছের মতো, কিন্তু স্বাদ ও গন্ধে পুরোটাই ইলিশ। অনেকে মাছটিকে ‘পেংবা’ নামে চেনেন।
মাছচাষিরা বলছেন, এবছরই তারা প্রথম এই মণিপুরি ইলিশের চাষ করেছেন। উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ও পান্তাপাড়া ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে প্রায় অর্ধশত পুকুরে ১২ লাখ পোনা ছাড়া হয়েছে। দুই মাস আগে পোনা ছেড়ে আশা করছেন সাত থেকে আট মাস বয়স হলেই বাজারে তুলতে পারবেন মাছ।
মিঠাপানিতে উৎপাদিত এই মাছ বাজারে এলে ইলিশের চাহিদা অনেকটা পূরণ হবে। মৎস্য বিভাগ বলছে, তারাও আশাবাদী যে, এই মাছ চাষে ইলিশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি চাষিরাও লাভবান হবেন।
সরেজমিনে কথা হয় একাধিক মাছচাষির সঙ্গে। তারা জানান, মহেশপুর উপজেলায় প্রচুর বিল-বাঁওড় ও পুকুর রয়েছে। এখানে প্রচুর মাছ চাষ হয়। এই মাছচাষিদের একজন পান্তাপাড়া গ্রামের আলিউজ্জামান প্রথম ‘মণিপুরি ইলিশ’ তাদের এলাকায় নিয়ে আসেন। এর আগে কারো এই মাছ সম্বন্ধে ধারণা ছিল না।
তুলসীতলা গ্রামের মাছচাষি আব্দুল আলিম জানান, উপজেলার পান্তাপাড়া ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের পান্তাপাড়া, তুলসীতলা ও বাগানমাঠ গ্রামে অর্ধশত পুকুরে মণিপুরি ইলিশের চাষ হয়েছে। আলিমুজ্জামান প্রথম মাছটি মাছ এই এলাকায় আনেন। বর্তমানে আয়াত আলী, আত্তাব আলী, সজীব হোসেন, ওসমান গনি, জায়েদ আলী, আব্দুর রহিম, নয়ন মিয়া, সাহাবুদ্দিন আহম্মদ, ইদ্রিস আলী, মনিরুল ইসলাম, মকছেদ আলী, জুলমত আলী, আলিউজ্জামানসহ অনেকেই এই মাছের চাষ করছেন। প্রথম বছরেই এই পুকুরগুলোতে ১২ লাখ পোনা ছাড়া হয়েছে।
আব্দুল আলিম আরো জানান, তিনি চার বিঘা আয়তনের একটি পুকুরে ৬০ হাজার পোনা ছেড়েছেন। প্রতিটি বাচ্চা মাছ এক টাকা ৫৫ পয়সা করে কিনতে হয়েছে। পুকুরে পোনা ছাড়ার সময় কেজিতে গড়ে পাঁচ হাজার বাচ্চা ছিল; যা গত দেড় মাসে অনেকটা বড় হয়েছে। বর্তমানে ৩৫টি মাছে এক কেজি ওজন হচ্ছে।
আব্দুল আলিম জানান, এই মাছের বয়স ৭-৮ মাস হলে বাজারে বিক্রি করবেন। তখন একটি মাছের ওজন হবে চারশ’ থেকে ছয়শ’ গ্রাম।
এই চাষি বলেন, অন্য সব মাছের মতোই এর খাবার দিতে হয়। তবে খাবার একটু বেশি প্রয়োজন হয়। এই মাছ দ্রুত বড় হয়, যে কারণে তাদের খাবারও বেশি প্রয়োজন হয়।
মো. আলিউজ্জামান জানান, বাংলাদেশে এবারই প্রথম পেংবা বা মণিপুরি ইলিশের চাষ হচ্ছে। তিনি ময়মনসিংহ থেকে এই মাছের পোনা আমদানি করেন।
তিনি জানান, মাছটি ভারতের মণিপুরি রাজ্যে চাষ হচ্ছে কয়েক বছর। সেখানে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ইলিশের সংকটে জামাইষষ্টিতে এই মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকে। সেখান থেকে ময়মনসিংহের একটি হ্যাচারি মালিক ২০১৯ সালে মা মাছ সংগ্রহ করেন। এরপর সেই মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা তৈরি করেছেন। এই বাচ্চা তিনি প্রথম সংগ্রহ করে নিজ এলাকায় নিয়ে আসেন। বর্তমানে তার পুকুরে দুই লাখ পোনা বড় হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, তার এই চাষ দেখে এলাকার অনেক চাষি এগিয়ে এসেছেন। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ পোনা বড় হচ্ছে তিনটি গ্রামের অর্ধশত পুকুরে।
বাগানমাঠে পুকুর করে মাছ চাষ করছেন আনোয়ার হোসেন নামে এক চাষি। তিনি জানান, তারা নতুন জাতের এই মাছের চাষ করেছেন। যেখান থেকে পোনা সংগ্রহ করেছেন, তারা জানিয়েছেন এই মাছটি ভারতের মণিপুরি রাজ্যে চাষ হচ্ছে। তারা ইলিশের বিকল্প হিসেবে এই মাছটিকে গ্রহণ করেছেন। মাছটির মাথা দেখতে ইলিশের আর পেছনের অংশ পুঁটিমাছের মতো। স্বাদ ও গন্ধ ইলিশের মতো হওয়ায় তারা আশা করছেন, বাজারে উঠানোর পর ইলিশের চাহিদা অনেকটা পূরণ হবে। তবে নতুন জাত হওয়ায় বাজারমূল্য কত হবে তা নিয়ে চিন্তিত চাষিরা। ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পারলেই তারা লাভবান হবে।
ময়মনসিংহ জেলার ‘বন্ধন হ্যাচারি’র মালিক কামাল হোসেন জানান, তারা এ বছর পেংবা মাছের প্রায় ১৫ লাখ পোনা বিক্রি করেছেন; যার বেশিরভাগই ঝিনাইদহে দেওয়া হয়েছে। তাদের এলাকায় সাামন্য কিছু চাষ হয়েছে।
তিনি আরো জানান, মাছটি একেবারেই নতুন জাতের। যে কারণে শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছেন। তবে ভারতে ‘মণিপুরি ইলিশ’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে মাছটির।
এ বিষয়ে মহেশপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, মাছটি চাষিরা সংগ্রহ করলেও তারা সর্বক্ষণ দেখভাল করছেন। কখন কী পরিচর্যা করতে হবে তা দেখিয়ে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, মাছটি ‘পেংবা’ নামে অনেক স্থানে পরিচিত। তবে ভারতের মণিপুরি রাজ্যে এর বেশি চাষ হওয়ায় এটা ‘মণিপুরি ইলিশ’ হিসেবে পরিচিত। মাছটিতে ইলিশের স্বাদ থাকায় ইলিশের চাহিদা অনেকটা পূরণ হবে। বাজারে একটু দাম পেলে চাষিরাও লাভবান হবেন।

আরও পড়ুন