মাগুরার দুই ভাষাসৈনিকের কথা

আপডেট: 05:44:50 20/02/2021



img

এস আলম তুহিন, মাগুরা : বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মাগুরার অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের মধ্যে খান জিয়াউল হক ও হামিদুজ্জামান এহিয়া প্রাতঃস্মরণীয়।

খান জিয়াউল হক
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেওয়ার কারণে তৎকালীন মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন মাগুরার ভাষাসৈনিক জিয়াউল হক।
তিনি বলেন, ‘যেহেতু মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলাম, তাই মুসলিম লীগ নেতারা আমাকে ভাষা আন্দোলন থেকে সরে যেতে বলেন। বাধ্য হয়ে মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করি। এরপর সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে মিছিলে যোগ দিই আমি।’
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেছেন মাগুরার শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠক খান জিয়াউল হক। তিনি ১৯৫০ সালে যশোর এমএম কলেজের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। দেশব্যাপী ভাষা আন্দোলনের সময় খুলনার আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন তিনি। সে সময় সামনে থেকে যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তারই বন্ধু আমিনুল ইসলাম চান্দু মিয়াও আরেকজন সাহসী ভাষাসৈনিক। ভাষা আন্দোলনের সময় একসঙ্গে রাজপথে ছিলেন তারা, এমনকি একইসঙ্গে গ্রেফতারও হয়েছিলেন এই দুই বন্ধু।
তৎকালীন ছাত্র নেতা জিয়াউল হক বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যাওয়া, মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করার কারণে পরে অনেক হয়রানি হতে হয়। মুসলিম লীগের নেতাদের এবং পুলিশের বাধার কারণে একসময় যশোরের কলেজ ছেড়ে মাগুরায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসি। তখনও মাগুরায় তেমন কোনো আন্দোলন শুরু হয়নি। নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়া সংগঠিত করছিলেন এখানকার সবাইকে। আমি ও চান্দু মিয়াও তার সঙ্গে কাজ শুরু করি।’
‘২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঘটনা জানতে পেরে আমরা মাগুরার সংগঠক আবু মিয়ার সঙ্গে দেখা করি। সেখান থেকেই ঠিক করা হয়, পরদিনই মিছিল ও সমাবেশ করা হবে। সেদিন সকালেই সবাই সেগুনবাগিচায় একত্রিত হই। সেখানে আবু মিয়ার সভাপতিত্বে সমাবেশ হয়। সমাবেশ শেষে আমরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে চৌরঙ্গী মোড়ে আসতেই পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে গেলেও আমি, জলিল খান এবং চান্দু মিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়ি। আমাদের পার্শ্ববর্তী জিআরও অফিসে বসিয়ে রাখা হয়। কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হলে আমরা নোমানী ময়দানে আবার একত্রিত হই,’ স্মৃতিচারণ করছিলেন জিয়াউল হক।

হামিদুজ্জামান এহিয়া
ভাষাসৈনিক হামিদুজ্জামান এহিয়া মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এএফএম কামরুজ্জামান, মা হামিদা খাতুন। তিনি মাগুরা হাইস্কুল (বর্তমানে মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, মাগুরা কলেজ (বর্তমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ) থেকে আইএ এবং একই কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।
বায়ান্নর উত্তাল আন্দোলনের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশব্যাপী। মাগুরাও সে আন্দোলনের ফলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। হামিদুজ্জামান ছিলেন এ আন্দোলনের সামনের সারিতে। ঢাকায় ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে মাগুরায় অনুষ্ঠিত প্রতিটি সভা সমাবেশের উদ্যোক্তা ও সংগঠক হিসেবে তিনি অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় পর্যন্ত হামিদুজ্জামান (এহিয়া) দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
এহিয়া তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সভায়ও যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর শহীদ দিবস পালনসহ বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫৪ সালে হামিদুজ্জামান এহিয়ার নেতৃত্বে মাগুরার নাকোল শ্রীপুর স্কুলের ছাত্ররা বাঁশ দিয়ে শহিদমিনার নির্মাণ করে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শোকর‌্যালি ও আলোচনাসভার মাধ্যমে শহিদদিবস পালন করে। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তিনি ১৯৫৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বেলুচ আর্মড ফোর্সের হাতে গ্রেফতার হন। সেই সময় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই ঘটনার কারণে নাকোল রাইচরণ মাধমিক বিদ্যালয় থেকে তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়ে যায়। তবু তিনি ভাষা আন্দোলন এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে সরে যাননি। অদম্য থেকেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল থেকে আসা একদল ছাত্রের সাথে থেকে মাগুরার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে সহপাঠীদের নিয়ে নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাগুরা মডেল হাইস্কুল, মাগুরা ইসলামিক কলেজে ছাত্রদের সাথে মাতৃভাষা রক্ষার্থে মিছিল, সভা-সমাবেশ, প্রচারপত্র বিতরণের কাজ করেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে ছিল তার নিয়মিত যোগাযোগ। ভাষা আন্দোলনকে গতিময় করতে তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ছুটে বেড়িয়েছেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। দেয়াল লিখন, মিছিল পরিচালনা, লিফলেট ছাপিয়ে প্রত্যন্ত বিভিন্ন স্থানে হামিদুজ্জামান এহিয়া ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুলিশি বাধা-বিপত্তি, নিপীড়ন অতিক্রম করে তিনি ছাত্রদের সংগঠিত করেছেন। তার নেতৃত্বে স্কুলের গণ্ডি না পেরুনো ছাত্ররা বিক্ষোভ করেছে। তিনি জেল থেকে ফিরে পুনরায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন