মাছবাজার উঠে গেল, ধুঁকছে সবজিবাজারও

আপডেট: 10:52:32 12/05/2020



img
img
img

শহিদুল ইসলাম দইচ : যে লক্ষ্য নিয়ে যশোরের বড়বাজার ফাঁকা মাঠে স্থানান্তর করা হয়েছিল, দৃশ্যত তা ভেস্তে যেতে বসেছে। ১৩ দিনের মাথায় বন্ধ হয়ে গেল মাছের বাজার। সবজির বাজারও ধুঁকছে। বন্ধ হতে পারে এটাও।
মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে এমন পরিস্থিতি কেন হলো, তা নিয়ে ভাবছেন কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ী-ক্রেতারাও তাদের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সামনের সপ্তাহ নাগাদ নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই দফা স্থান বদলের পর যশোর বড়বাজার আনা হয়েছিল মুনশি মেহেরুল্লাহ ময়দান (টাউন হল মাঠ) ও কেন্দ্রীয় ঈদগাহে। প্রথম কয়েকদিন বেশ জমজমাটই ছিল বাজার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা কমতে থাকে। আর আজ মঙ্গলবার তো বন্ধই হয়ে গেল মাছের বাজার।
যশোর বড়বাজার মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শ্রীকৃষ্ণপদ বিশ্বাস বললেন, তাদের পক্ষে টাউন হল ময়দানে বসে মাছ বিক্রি করা আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। বাধ্য হয়ে তারা উঠে এসেছেন। তবে এটা তাদের কোনো আন্দোলন না।
তিনি আজ দুপুরে সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘টাউন হল ময়দান বেশ বড় জায়গা। সেখানে ফাঁকা ফাঁকা অবস্থান করা যায়। কিন্তু অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বলতে কিছুই নেই। এমনকি পানি খাওয়ার জন্য একটা কলও নেই। রোদে পুড়ে ব্যবসায়ীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থাও তো এখন নেই। আমরা কীভাবে ওখানে বসে ব্যবসা করব?’
তিনি বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি আমরা বুঝি। তাই প্রশাসন যখন যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, তা মেনে নিয়েছি। কিন্তু ব্যবসা তো করি দুটো পয়সা রোজগার করার জন্য। টাউন হল মাঠে মেলা দেখার মতো প্রথম প্রথম কিছু লোক এসেছিল। এখন আর খরিদ্দার নেই। কড়া রোদে খরিদ্দাররা বাজার করবে কীভাবে? আমরাই বা কতদিন লোকসান দিয়ে চলতে পারব? তাই একে একে মাছ ব্যবসায়ীরা বাড়িতে ফিরে গেছে। আজ কোনো বেচাকেনা হয়নি।’
বড়বাজার মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সংখ্যা ১২০। সমিতির বাইরেও কিছু ব্যবসায়ী আছেন। তারা সবাই প্রশাসনের নির্দেশনামতো টাউন হল মাঠে এসেছিলেন। কিন্তু আজ তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনকে ওই মাঠে দেখা যায়। মাছ বলতেও তেমন কিছুই ছিল না। কাউকে কাউকে ফেরি করে পাড়া-মহল্লায় মাছ বিক্রি করতেও দেখেছেন অনেকে।
টাউন হল মাঠে মাছের বাজার বসানোর দুইদিনের মাথায় ব্যবসায়ীরা তাদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন। বলেছিলেন, সব আড়ত বড়বাজারে। সেখান থেকে মাছ কিনে আনতে হয়। বরফকলও বড়বাজার লাগোয়া। ফলে ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে। অবিক্রিত মাছ পরের দিন বিক্রির জন্য রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে বড়বাজারে। টাউন হল মাঠে তা নেই। ইতিমধ্যে এক ব্যবসায়ীর মাছ চুরিও হয়েছে।
ঝড়-বৃষ্টি হলে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বেন জানিয়ে তারা বলছেন, ঠা ঠা রোদ্দুরে খরিদ্দারই বা কীভাবে আসবে? খাঁ খাঁ করছে মাঠ।
এই প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বড়বাজারের ইজারাদার মীর মোশাররফ হোসেন বাবু সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের আসলে খুবই অসুবিধা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে আমি বসে কথা বলেছি। কিন্তু কোনোভাবেই তারা টাউন হল মাঠে আর বসতে চাইছে না। কেন্দ্রীয় ঈদগাহের সবজি ব্যবসায়ীদের মনোভাবও ক্রমে নেতিবাচক হচ্ছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক, পৌরসভার মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।’
সরেজমিনে আজ যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে অল্পকিছু সবজি বিক্রেতাকে বসতে দেখা যায়। ক্রেতার সংখ্যাও ছিল কম। অথচ দুই সপ্তাহ আগে যখন এখানে বাজার বসানো হয়েছিল, তখনকার চিত্র ছিল পুরো উল্টো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবজি ব্যবসায়ীদের অন্তত ৭০ ভাগ এই ক’দিনে হারিয়ে গেছেন। যারা এখনো টিকে আছেন, তারা কয়দিন থাকতে পারবেন, তাও অনিশ্চিত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের রান্নাঘরে কিন্তু চুলা জ্বালাতে হবে। সেই কারণে মাছ-সবজির চাহিদা ঠিকই আছে। কিন্তু ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, পালবাড়ি বা স্টেশন বাজারের মতো প্রতিষ্ঠিত জায়গায়। ওইসব বাজারেও পর্যাপ্ত নিত্যপণ্য বিক্রি হয়।
কেন্দ্রীয় ঈদগাহে বসা সবজি দোকানি রিপন শেখ বলেন, ‘‘আমি বড়বাজারে সবজি বিক্রি করতাম। আড়ত থেকে মাল কিনে পাশেই দোকানে সবজি তুলতাম। ঈদগাহে দোকান সরিয়ে আনার ফলে বাড়তি ভ্যানভাড়া, লেবার, পানি ও নাইটগার্ডের খরচ দিতে হচ্ছে। এর পরে তো খাজনা-ট্যাক্স আছেই। আগে প্রতিদিন দুই ভাই মিলে দোকানদারি করে এক হাজার থেকে ১২শ’ টাকা আয় করেছি। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে প্রতিদিনই অবস্থা খারাপ হচ্ছে। খরিদ্দার নেই। দোকানের সবজি বৃষ্টিতে ভেজে, রোদে পুড়ে নষ্ট হয়। মাল বিক্রির পর যেটা থেকে যায় তা আর পরের দিন বিক্রি করতে পারি না। লসের পরে লস হচ্ছে। খুবই সংকটে পড়েছি।’’
যশোর বড়বাজারের কাঁচামালের আড়তদার সাহাবুদ্দিন মাতবর সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘এখন আড়তে মাল বিক্রি না হওয়ার কারণে অনেকটাই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খুচরা দোকানিরা বাড়তি খরচ করে লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছে না।’
টাউন হল মাঠে বসা মাছ বিক্রেতা আজগর বিশ্বাস, মতিয়ার বিশ্বাস, আবুল বিশ্বাসসহ অনেকেই সুবর্ণভূমির কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বলেন, লাভের বদলে লোকসান হচ্ছে। এখানে আর দোকানদারি করার ইচ্ছা নেই তাদের।
ক্রেতা জালাল উদ্দিন, হায়দার আলী, দিন মোহাম্মদ, রেবেকা সুলতানা, জসিম উদ্দিন প্রমুখ সুবর্ণভ‚মিকে বলেন, এখানে বাজার আসায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা করা যাচ্ছে। কিন্তু সব কিছুর দাম বেশি। আবার রোদে দাঁড়ানো যায় না। মানুষ কীভাবে কেনাকাটা করবে?
গোটা বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসক মো. শফিউল আরিফের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শারীরিক দূরত্ব রেখে কেনাকাটায় যাতে সুবিধা হয়, সেই কারণে বড়বাজার ফাঁকা জায়গায় আনা হয়। এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের যদি অসুবিধা হয়, তাহলে জনগণের কথা চিন্তা করেই বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি নিয়ে মেয়র সাহেবের সঙ্গেও কথা বলব।’
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাউদ্দিন সিকদার সুবর্ণভূমিকে বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পৌরসভার মেয়র- সবাই অবহিত আছেন। করোনা প্রতিরোধ কমিটির সামনের মিটিংয়ে আলোচনার মাধ্যমে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, করোনা প্রতিরোধে ভ‚মিকার অংশ হিসেবে সবজি ও মাছবাজার সরানো হয়েছিল। বাজারের বর্তমান অবস্থাও আমলে নেওয়া হয়েছে। করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

ছবি : তারিক হাসান বিপুল

আরও পড়ুন