মাদরাসায় শিক্ষার্থী নেই, আছে গরু

আপডেট: 04:34:07 28/11/2019



img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : প্রায় দেড় মাস আগে তোলা হয়েছে একটি টিনের ঘর। তবে এখনো বেড়া দেওয়া হয়নি। নেই কোনো বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিলসহ আসবাবপত্র। তাই ফাঁকা ঘরের মধ্যে এটি কার্যত গরু-ছাগলের চারণভূমি। অথচ কাগজ-কলম আর সাইনবোর্ডে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত ১৯৮২ সালে। এই চিত্র নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চরব্রাহ্মণডাঙ্গা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার।
এলাকার বিভিন্ন পেশার মানুষ জানান, এখানে কোনো দিন ক্লাস হয়নি। কোনো শিক্ষক-কর্মচারীদেরও দেখা মেলেনি। গত ১২ জুন প্রধানমন্ত্রী সারাদেশের ইবতেদায়ি মাদরাসগুলো এমপিভুক্তির ঘোষণা দিলে চরব্রাহ্মণডাঙ্গায় হঠাৎ করে মাদরাসার নামে ঘর তুলে কতিপয় ব্যক্তি ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠা সাল ১৯৮২ দেখানো হয়েছে।
চরব্রাহ্মণডাঙ্গার সাবেক ইউপি সদস্য খায়রুল ইসলাম জানান, এটি নামসর্বস্ব মাদরাসা। এর কার্যক্রম খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। সরকার ইবতেদায়ি মাদরাসা এমপিওভুক্তির ঘোষণায় ফায়দা লুটতে এলাকার কয়েক ব্যক্তি হঠাৎ করে একটি ঘর তুলে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। আর পাশের মসজিদের জমি ব্যবহার করে মাদরাসাটি উঠানো হয়েছে। এমপিওভুক্তির কথা বলে পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকপ্রতি চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
চরব্রাহ্মণডাঙ্গার তাইজুল ইসলাম জানান, প্রায় দেড় মাস আগে একটি টিনের ঘর তুললেও নেই কোনো বেড়া। চেয়ার, টেবিল, আসবাবপত্রসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ নেই এখানে। কখনো ক্লাস হয়নি। অথচ ইবতেদায়ি মাদরাসায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস রয়েছে। এ বছর চরব্রাহ্মণডাঙ্গা ইবতেদায়ি মাদরাসা থেকে ১২ জন পরীক্ষার্থী লোহাগড়ার নখখালী দাখিল মাদারাসা কেন্দ্রে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এসব পরীক্ষার্থীর অনেকেই দুই থেকে তিন বছর আগে ব্রাহ্মণডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে আবার ব্রাহ্মণডাঙ্গা হাফেজিয়া মাদরাসার ছাত্র। ভুয়া পরীক্ষার্থীর বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে দুটি বিষয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর তারা আর কেন্দ্রে যায়নি। এ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এছাড়া এই এবতেদায়ি মাদরাসার কাছে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। হঠাৎ করে মাদরাসাটি দৃশ্যমান হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত দাবি করেছেন এলাকাবাসী। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি দিয়েছেন তারা।
এ ব্যাপারে মাদরাসার সুপার মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, সরকার এমপিওভুক্তি ঘোঘণার পর নতুন করে মাদরাসার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামি জানুয়ারি থেকে ক্লাস চলবে।
ভুয়া পরীক্ষার্থীর বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, এলাকাবাসী জোর করে ১২ জনের পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়।
পরীক্ষার্থীদের বেশির ভাগই দুই-তিন বছর আগে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তারাই আবার মাদরাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় কীভাবে অংশগ্রহণ করলো?- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়মানুযায়ী স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানোন্নয়নের জন্য মাদরাসা থেকে পরীক্ষা দিতে পারে।
এছাড়া মাদরাসার নামে ৩৪ শতক জমি আছে এবং এর কিছু অংশ মসজিদের জন্য রেকর্ড হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি আরো বলেন, ঘর নির্মাণসহ অন্যান্য খরচ শিক্ষকদের টাকায় করতে হচ্ছে। এখন টাকার অভাবে ঘরটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল আহাদ রেগে ওঠেন। তিনি এ ব্যাপারে কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
লোহাগড়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার ও নখখালী কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদুল করিম জানান, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দুটি বিষয়ে অংশগ্রহণের পর চরব্রাহ্মণডাঙ্গা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার ১২ শিক্ষার্থী আর পরীক্ষায় দিতে আসেনি। আর প্রথম থেকেই একজন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তবে কেন তারা অনুপস্থিত ছিল, তা জানা নেই।
এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা অফিসার এসএম ছায়েদুর রহমান বলেন, কিছুদিন আগে সরকারের পক্ষ থেকে ইবতেদায়ি মাদরাসা এমপিওভুিক্তর ঘোষণা এসেছে। তবে এখনো যাচাই-বাচাই চলছে। কোনো মাদরাসাকে এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। যদি যোগ্যতা অনুযায়ী এমপিওভুক্তির পর্যায়ে পড়ে তবেই তাদের চূড়ান্ত করা হবে।

আরও পড়ুন