মারা গেলেন কাবুল

আপডেট: 03:03:41 01/06/2020



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : মারা গেলেন মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল; যিনি যশোর শহরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-লেখালেখির জগৎ ছাড়াও শ্রমিক আন্দোলনে অতি পরিচিত মুখ ছিলেন। সম্প্রতি তার শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ার এক মাস এক সপ্তাহ পর আজ রাত নয়টার কিছু সময় আগে ঢাকায় মারা যান কাবুল।
এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন মরহুম কাবুলের মামা অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান সাবু, ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, যশোর জেলা কমিটির সেক্রেটারি জিল্লুর রহমান ভিটু, যুবমৈত্রী জেলা সভাপতি অনুপকুমার পিন্টু।
ছোট মামা অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান সাবু সুবর্ণভূমিকে জানান, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় আজই কাবুলকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রাত নয়টার কিছু সময় আগে তিনি সেখানে মারা যান।
যুবমৈত্রী যশোর জেলা কমিটির সভাপতি অনুপকুমার পিন্টু সুবর্ণভূমিকে জানান, গত মাসের (এপ্রিল) মাঝামাঝি সময়ে মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২২ এপ্রিল যশোরের কুইন্স হসপিটালে এমআরআই করা হয়। তাতে তার মাথায় মাল্টিপল টিউমারের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। দেরি না করে তিনি ঢাকায় চলে যান। সেখানে মেয়ের বাসায় থেকে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। এতে তার ফুসফুসের ক্যানসারও ধরা পড়ে।
অনুপ ওয়ার্কার্স পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার বরাত দিয়ে জানান, চিকিৎসার অংশ হিসেবে মহাখালী ক্যানসার হাসপাতালে কাবুলের শরীরে পাঁচ দফা রেডিয়েশন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেমোথেরাপি দেওয়ার সুযোগ হয়নি।
অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান সাবু জানান, মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলের বয়স হয়েছিল ৬০। মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামে জন্ম নেওয়া কাবুল জনতা ব্যাংকে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে যশোর শহরের বারান্দিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন তিনি।
কাবুল স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে, মাসহ বহু শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুসারী রেখে গেছেন। তার মেয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ছেলেও পড়ছেন ঢাকায়।
মরদেহ কখন যশোরে আনা হবে, রাতেই তা নিশ্চিত করতে পারেননি সাবু। তবে তিনি জানান, লাশ যশোরে আনা হবে এবং দাফন হবে মণিরামপুরের ঝাঁপা গ্রামে। মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে চাকরি করলেও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। সামরিক শাসক এরশাদের জমানায় গ্রেফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি রাজনীতি ছাড়েননি জীবনের শেষলগ্ন পর্যন্ত।
এছাড়া তিনি কলাম লেখক হিসেবে এই অঞ্চলে সুপরিচিত ছিলেন। মার্কসবাদী রাজনীতিসহ সমসাময়িক বিষয়াদিতে পাণ্ডিত্য থাকায় গণমাধ্যমে তার লেখালেখি পাঠকপ্রিয়তা পায়। চাকরিরত অবস্থায়ও তিনি বেশ কিছুদিন দৈনিক যশোর পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে অলিখিতভাবে দায়িত্ব পালন করেন। যুক্ত ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির মুখপাত্র ‘নতুন কথা’র সঙ্গেও।
যশোর ইনস্টিটিউটের কার্যকরি কমিটিতে দুই দফা নির্বাচিত হয়ে তিনি লাইব্রেরি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন নান্নু চৌধুরী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের গভর্নিং বডির সদস্য।
মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল প্রেসক্লাব যশোর, পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি, অনির্বাণ ক্লাব, বেজপাড়া বাজার সমিতিসহ বহু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নির্বাচন পরিচালনা করেছেন বিভিন্ন সময়। গেল বছর অনুষ্ঠিত প্রেসক্লাব যশোরের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে তিনি সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন ও সম্পাদক আহসান কবীর।

রাজনৈতিক জীবন
মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল জীবনের শুরুতেই বামধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন। তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ সুবর্ণভূমিকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। যদিও গেল বছর ওয়ার্কার্স পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর এই দুইজন দুই পক্ষে অবস্থান নেন; তবে তাদের মধ্যে আন্তরিক ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বলে জানান জাহিদ।
ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা কমিটির সদস্য ও যুবমৈত্রীর সভাপতি অনুপকুমার পিন্টু জানান, মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল তাদের দলের শেষ কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। অসুস্থ হয়ে ঢাকায় যাওয়ার পর ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা তার চিকিৎসায় সহযোগিতা করেন।
ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু সুবর্ণভূমিকে মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেন। বলেন, সাল-তারিখ সব না মিললেও মোটামুটি কাছাকাছি যাবে তার বর্ণনা।
ভিটুর বর্ণনা মতে, মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল পারিবারিক কারণেই ছাত্রাবস্থায় বামধারার রাজনীতিতে দীক্ষা নেন। তখন পার্টির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)। তবে তিনি ছাত্রসংগঠনের দায়িত্বে কখনো ছিলেন না। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স পড়ার সময় তিনি বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগে সংগঠিত হন। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি এই পার্টির প্রার্থী সভ্য হন। পরের বছরই তিনি পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেন।
ভিটুর বর্ণনায়, এর আগে ১৯৮৩ সালের ১০ ডিসেম্বর সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৭ দিন ধরে কাবুলের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) অন্যতম নেতা ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান কাবুল। তখন তিনি এই শ্রমিক জোটে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করতেন। সেই সময়ের শ্রমিক আন্দোলনে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে জনতা ব্যাংক কর্মচারী ইউনিয়নেও তিনি যশোর অঞ্চলের প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সম্মেলনে কাবুল জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সরকারি চাকরিগত কারণে তার এই রাজনৈতিক পদ কখনো প্রকাশ করা হয়নি। নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে তিনি জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তিনি অন্তত দুই দফা অফিসের প্রমোশন প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সরকার ব্যাংকে শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলনের নেতাদের নিবৃত করতে প্রমোশন দিয়ে দিলে তিনি চাকরি রক্ষার্থে তা নিতে বাধ্য হন। সম্প্রতি তিনি অবসরপূর্ব ছুটিতে (এলপিআর) গিয়েছিলেন।
ভিটু জানান, ২০০৫ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির সম্মেলনে কাবুল জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর ওয়ার্কার্স পার্টি ভেঙে গেলে তিনি রাশেদ খান মেনন ও ফজলে হোসেন বাদশার নেতৃত্বাধীন অংশে থেকে যান। এই পার্টির সবশেষ সম্মেলনে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
কমিউনিস্ট লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টিতে যুক্ত থাকাবস্থায় মুস্তাফিজুর রহমান কাবুল মূলত দলের প্রকাশনা, শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট দেখাশোনা করতেন। বিবর্তন যশোর ও সুরধুনী প্রতিষ্ঠায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। গেল তিন দশকে পার্টির এমন কোনো প্রকাশনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে মুস্তাফিজুর রহমান কাবুলের হাত ছিল না।

আরও পড়ুন