মিজানুর রহমান তোতার পাঁচটি কবিতা

আপডেট: 01:34:17 10/09/2020



img

দিবানিশি স্বপ্নের খেলা

আত্মপ্রত্যয়সিদ্ধ মনোভাবে অটল স্বচ্ছন্দ গতি।
হৃদয়ের গভীর ক্ষতে চুপিসারে ঢুকে নাড়া দেয়।
ভালোবাসার আসক্তির তৃষ্ণা।

সময়ে আচ্ছন্ন জটিলস্পর্শে অদ্ভুত এক অনুভূতি।
গভীর অনুভবে প্রেমময় জীবনের সন্ধানে কাতর।
প্রস্ফুটনে অচ্ছেদ্য বন্ধন।

অরণ্যের নৈঃশব্দ মাড়িয়ে সমুদ্রের তলে স্বপ্নরাশি।
রক্তের স্রোতে আশাভঙ্গের রূপ লাবণ্যঘেরা স্বস্তি।
চরম আঘাতের অন্তর্বাস।

জ্বলন্ত আলোকপাত অবগাহনে দৃষ্টি পাল্টালো।
দিনের সঙ্গে রাতের যুদ্ধে ক্লান্ত অবসন্ন দেহ।
জীবন সত্যের উম্মোচন।

বৈচিত্র্যহীন রূপায়িত স্বপ্নের বেড়াজাল ছিন্নভিন্ন।
অবিশ্বাসী প্রেতাত্মার দৃশ্যছবি নাড়া দেয় স্পষ্ট।
স্মৃতির বাতি জ্বলজ্বল।

একাকিত্বের হাহাকারের আত্মকথন অন্তর্ভেদী।
বিশেষত্ব বিশ্লেষণে শূন্যতার মোড়কে পদচিহ্ন।
অনুভবে অবাস্তব চেহারা।

নাটকীয় কাহিনী বিস্তৃত অস্থির মানদণ্ডে বন্দি।
রুদ্ধশ্বাস উন্মাদনায় ছটফট গড়াগড়ি বিছানায়।
খেলছি দিবানিশি স্বপ্নের খেলা।



হাঁটছি স্বপ্নের সিঁড়িতে

ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি আমি খুবই বোকা।
আমার দিয়ে কিচ্ছু হবে না।
অলীক স্বপ্নে থাকি বিভোর।
কোন বাসনা নেই।
নেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
জীবনে কিছুই করতে পারবে না।

সব কাজেই শুধু দোষ ত্রুটি।
কিন্তু কেন এসব বলে তার জবাব কারো কাছ থেকে কখনো মেলে না।
একথা সেকথা ঘুরে ফিরে কথার ছলে বলতে কেউ করে না দ্বিধা।
নিজেকে প্রশ্ন করি আসলেই কি আমি বোকা, স্বপ্ন দেখি?

পড়ন্ত বেলায়ও একইভাবে জোরালো ভেসে আসে কানে নানা কথা নানাভাবে।

আচ্ছা সবাই বলুন তো-
অন্ধকারকে মাড়িয়ে ক্ষীণউজ্জ্বল সম্ভাবনাকে খুঁজি, এটা কি স্বপ্ন?
আশায় আশায় বেঁচে আছি, এটা কি স্বপ্ন?
কারো কোনো অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করি- এটা কি আমার অপরাধ?
উচিত কথা বলা কি দোষের?

কীসের নেশা, চিন্তাঘুম না চোখের পাতা বন্ধ।
জেগে আছি না ঘুমিয়ে?
সাত রঙে খেলা করে আমার মনচোখে।
ঘিঞ্জি পূর্বাভাস ডানা মেলে অস্থির হৃদয়ের কল্পনার রাজ্যে।
এটাকে কী বলা যায়- দুঃস্বপ্ন?

এমনিভাবে অনন্তকাল কি অস্তিত্বের রহস্য প্রশ্নদীর্ণ হবে, হবে গ্লানিময়;
জবাব দেবে কি কেউ?

হেঁটে চলেছি আঁকাবাঁকা স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে।
কোথায় গন্তব্য জানি না।
সবসময় সুন্দর হৃদয়ের খোঁজ করি।
কী হবে জানি না।
তবে এটুকু জানি-
পূর্ণতায় ভরবে বাসনার ঝুড়ি।
গড়ে উঠবে সার্থকভাবে বেঁচে থাকার ঠিকানা।
শান্তি, স্বস্তি, প্রাণতরঙ্গ।

সুখের বার্তায় আপ্লুত হয় না সুখদর্শন।
অন্ধকারে জোনাকির আলো।
দুমড়ে মুচড়ে ফেলছি সাজানো গোছানো তিল তিল করে গড়ে তোলা ফুলডালি।
সাধের অস্তিত্ব মুহূর্তে বিলীন করছি।
চারপাশের চিত্র দেখে রাগে দুঃখে টেনে টেনে ছিড়ছি মাথার চুল।
এসব স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন?

নৈঃশব্দে নিমগ্ন হাঁটছি বাঁকা চাঁদের সিঁড়িতে- এটাকে কী বলা যায়?

হ্যাঁ হ্যাঁ হাঁটছি।
হৃদয় ছোঁয়া কথামালা গেঁধে স্বপ্নের বীজ বুনছি।
ভাবছি আবোলতাবোল।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখ চলে যায় আমার অতীতের স্মৃতিমাখা দিনে।
চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার ছেলেবেলা।
ডোঙায় চড়ে স্বপ্নের সমুদ্রপাড়ি দিচ্ছি।
ঘুরে ফিরছি পুকুর, ডোবা, খাল।

ঢেউয়ে তাকিয়ে একনিরিখে দেখছি চাঁদের আলোর দোল।

চলমান ভাঁজে ভাঁজে লেপ্টে ধরে শব্দ ভাষা দৃশ্যমান কাঙ্ক্ষিত সুখ।
নিজের সুখ খুশিতে আত্মহারা।
এলোমেলো পথে ভিন্ন চিন্তাধারায় গ্রাস।
এটাকেই বা কী বলা যায়?

এসব কি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তারুণ্যের সংস্করণ?

জীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতার আলোকে কারোরই জীবন খারাপ নয়।
কেউ কারো চেয়ে নয় ছোট-বড়ো।
গাড়ি, বাড়ি, টাকাকড়ির অন্ধমোহ সাময়িক।
সুখ শন্তি স্বস্তি, ভালো থাকা, ভালো লাগা সব মনের ব্যাপার।
ভালো-মন্দ মিলিয়েই জীবন।
সুখ নেবে অথচ শান্তি নেবে না।
নেবে না কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, কষ্ট যন্ত্রণা।
এটি তো হতে পারে না।
চাওয়া পাওয়া নিয়ে বিভোর থাকা নয় তো জীবন।
জীবন মানেই বিশাল জগত।
ভালো চিন্তা, ভালো কিছু সৃষ্টি, সমাজের জন্য কিছু করাটাই জীবন।
নিজের ভালো সখ আহ্লাদের মাঝে গণ্ডিবদ্ধ রাখা নয় জীবন।
তাই তো বলি কেউই বোকা নয়, ক্ষণিক বোকা বানানো।
স্বপ্ন সিঁড়ি বাঁকা নয় সোজা।
এসব কথা কি মিথ্যা?
ব্যক্তিগত উপলব্ধি, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন মাড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলি।
জীবন মানেই এক জ্বলজ্বলে নক্ষত্র।



স্পর্ধিত প্রয়াসের ডাক

একতরফা প্রেম ভালোবাসা কখনো হয় না।
একা ভালো থাকবো।
সুখের নহর বইয়ে দেবো।
গুনগুনিয়ে গান গাইবো।
সেটি হয় না, কখনোই হতে পারে না।
তাহলে সত্য হয়ে যাবে মিথ্যা।

কারো শোনাতে হবে।
বলতে হবে কাউকে।
কেউ শুনুক আর নাইবা শুনুক।
ডাকতে হবে হুংকার ছেড়ে।
বলতে হবে, এই শুনছো?
লম্বা ভাবনা ছেড়ে আসো।

মনে এক আর মুখে আরেক স্বভাব ত্যাগ করো।
মানুষের কাতারে আসো।
ডুবে ডুবে চুপিসারে ঢোক গিলো না।
কারো গালমন্দ করো না।
সেই গাল লাগবে নিজের গায়ে।
তাতে জ্বলবে আগুন।

সৌহার্দ্য সম্প্রীতির নামে নিজেকে উজাড় করো।
সমাজে প্রতিষ্ঠিত করো মিথ্যার বেসাতি ছেড়ে।
সমাজকে আর কলুষিত করো না।
পাপের পাল্লা করো না ভারি।
প্রেমের অভিনয় করো না।

সবার দিকে তাকিয়ে আছে সবাই।
কেউ একা নয়।
একা বেশিদিন ভালো খাকা যায় না।
কখনো তা হয়নি।

স্পর্ধিত প্রয়াসের ডাক সবাইকে নিয়ে সুন্দর থাকো।
ভবিষ্যতের জন্য শুধরাও, নিজেকে ভালো রাখো।



সুখপাখির স্মৃতি

সত্য মিথ্যার বেড়াজালে মধুময় ভালোবাসা।
স্মৃতিময় ভালোবাসা।
হঠাৎ গেল থমকে।
মুহূর্তে এলোমেলো।

অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প, চিন্তার খেলা।
সবকিছু ছাপিয়ে টানে হৃদয়ের ভালোবাসা।
সেই ভালোবাসা নেই।
নেই কাছে টানাটানি।
পাশে বসাবসি।

চোখের সামনে দাঁড়ায় হাজার পৃষ্ঠার স্মৃতি।
বেদনার স্মৃতি।
সুখের স্মৃতি।
ভালোবাসার আলিঙ্গন ঘিরে আছে কল্পনায়।
দুশ্চিন্তার মাঝে সুখের মুখখানা ভেসে বেড়ায়।

ঠোঁটের হাসিটা মিষ্টি ছড়ায় যন্ত্রণাকাতরেও।
বলে ফাঁকা জায়গা দাও আমি ঘুমাবো।
হাতটা ধরে বুকে রাখো।
কাছে বসে গল্প করো।

শূন্যতায় নতুন বর্ণনা স্বীকার করতে কুণ্ঠিত।
বিচ্ছিন্ন নির্জন বিশ্বাসী দারুণ স্বল্পভাষী।
ছিন্নতার স্মৃতি শূন্য হৃদয়ে।
আবেগের স্রোতে ভাসছে আমার সুখপাখি।
হৃদয়ের শিকল ছিড়ে পালিয়ে গেছে।

কেউ খোঁজও দিতে পারে না।
সবসময় খুঁজে ফিরি এদিক সেদিক।
নীল আকাশে টুকরো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়।
খুঁজেছি সেখানেও স্বপ্নের ভেলায় চড়ে।

হাফিয়ে উঠেছি খুঁজতে খুঁজতে।
অনন্তপ্রেমে কাঁটা বিঁধলো ভালোবাসার ভালোবাসায়।
অশুভ সংকেতে নাড়া দেয় হৃদয়।
তবু ভাবি স্মৃতিগাথা সুখপাখি আসবেই।
ছটফট করে ধরা দেবে আপন ভুবনে।
আসবে আমার হৃদয়ে ফিরে।

আলোর রেখায় মগ্ন হয়ে উদভ্রান্তে ছুটে যায়।
হাত বাড়িয়ে বলি ফিরে এসো।
আসো আমার সুখ দুঃখের যন্ত্রণার ঘরে।
না ফিরলো না সুখপাখি।
আসলো না-
মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।  

ছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে গুমরে কেঁদে ওঠে মন।
সত্যিই বুকটা ফেটে যায়।
নীরবে অঝোরে কাঁদছি।
শান্তি নীড়ের খাঁচা ভেঙে উড়ে গেছে সুখপাখি।
সংসারের ঘানি টেনে ক্লান্ত শ্রান্ত পাখিটি।
রক্ত ঘামিয়ে করেছে পানি, থেকেছে বন্দি।

তাই তো অনেক চিন্তায় চিৎকার দিয়ে বলি-
সুখপাখি আর তুমি ফিরে এসো না।
আকাশে মিলিয়ে যাও।
যেখানে গেছো।
ভালো আছো।

আর কোনদিনই এসো না।
মিথ্যা মায়াজালে জড়াবে না।
হবে না যন্ত্রণায় কাতর।
মেঝেতে উপুড় স্মৃতির বাসনা।
সুখপাখির স্মৃতি আমি ভুলে যেতে চাই।



আমি ভালোবাসবই

তবুও আমি তোমাকেই ভালোবাসব।
যতোই এড়িয়ে যাও।
দূরে সরে গিয়ে খ্যামটা নাচ দেখাও।
তোমার প্রেম করেছে আকর্ষণ।
তোমার হাঁটাচলা দেহের অঙ্গভঙ্গি দারুণ।

অপরূপ ভাবের ব্যঞ্জনা-
কথা টেনে নিয়েছে ভিন্নমাত্রায়।
কিছুতেই ভুলতে পারছি না।
এবং ভুলবো না।
গাছতলায় দাঁড়িয়ে হাত ধরে টান দিয়েছো।
বিশুদ্ধ ভালোবাসায় মনকে কেড়ে নিয়েছো।

নিঃশব্দে প্রেমনৃত্য চাহনিতে মধুর আলিঙ্গন।
চোখ বুজলে ভেসে ওঠে বিশেষ মুহূর্তের দৃশ্য।

আরো কি জানো?
বর্ষায় কাকভেজা তুমি।
বৃষ্টিভেজা শরীরে লেপ্টে ছিল নীলাম্বরী।
সে এক অদ্ভুত অনুভূতির শিহরণ।

বলা হয়নি কারণ-
আবেগ ছিল তোমার তুঙ্গে।
তুমি নিশ্চয়ই ভেজা শরীরেরও ছবি এঁকেছিলে মনে।
শরীরের ছন্দ হিল্লোলে বিস্ময়ে হেলেদুলে হাঁটার দৃশ্য।
আজো ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে।

কী করে ভুলবো বলো?
পারবো না কোনমতেই।
তুমি ভেবে দেখো।
অর্থাৎ তুমি কি ভুলতে পারবে?

তোমার ঠোঁটের এক চিলতে হাসি।
মনচোখে সারাক্ষণ খেলা করে।
বাসা বাঁধে বাসনার জগতে।

অনুভূতির টুকরো স্মৃতি ঘোরে মনের ভেতর।
ভুলতে পারবো না কিছুতেই।
তুমি গভীরভাবে স্মৃতিগুলো মনে রাখো।
আমি কিন্তু ভালোবাসবোই।