মুকুলের মতো সাহসী সাংবাদিক বড়ই প্রয়োজন

আপডেট: 01:44:28 30/08/2020



img

অধ্যাপক মো. মসিউল আযম

আজ ৩০ আগস্ট ২০২০। বাইশ বছর আগের কথা। এ দিনটি ছিল যশোরের সাংবাদিক সমাজ তথা যশোরবাসীর কাছে একটি ভয়াল দিন। শোকের দিন। বিষাদের দিন। স্বজন হারানোর দিন। এদিনে হারিয়েছি আমার এক অতি স্নেহভাজন অনুজ কলম সৈনিক সাইফুল আলম মুকুলকে।
তার সাংবাদিকতা জীবনের আবির্ভাব অনেকটা ধূমকেতুর মত। ১৯৮৪-১৯৯৮ মাত্র ১৪ বছরের মেয়াদকাল। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে এ সমাজকে তিনি অনেক কিছু দিয়েছেন। আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে অনেক কিছু দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা যা পারিনি মুকুল তাই পেরেছেন, তাই করেছেন। আর এজন্যে মানুষরূপী ঘৃণ্য হায়েনারা রানার পত্রিকার দ্রোহী এই সম্পাদকের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে তপ্ত বোমার আঘাতে। ক্ষুরধার লেখনি থামিয়ে দিয়েছে চিরতরে।
১৯৬৭ সালের কথা। আমি তখন যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও পত্রিকা সম্পাদক। ওই সময় কলেজ ছাত্র সংসদ হতে বার্ষিক ম্যাগাজিন সম্পাদনার দায়িত্ব বর্তায় আমার উপর। আমি শরণাপন্ন হই পূর্বাচল প্রেসের মালিক ফজলুল বারীর। ওখানেই পরিচয় ঘটে মুকুলের বাবা গোলাম মাজেদ ভাইয়ের সাথে। তিনিও একই সময় প্রেস হতে একটি বই ছাপানোর কাজ করছিলেন। চাকরির ফাঁকে তিনি নিয়মিত সাহিত্য চর্চাও করতেন। কাজের সুবাদেই মুকুলের বাবার সাথে গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠতা।
একদিন সৌজন্য সাক্ষাতে হাজির হলাম বেজপাড়াস্থ মাজেদ ভাইয়ের বাসভবনে। এখানেই মুকুলের সাথে আমার প্রথম দেখা। তার বয়স তখন ১১ বছর। তার ছোট ভাই মঞ্জুরুল আলম টুটুল তখন সম্ভবত দুই বছরের শিশু।
পরবর্তীকালে গোলাম মাজেদ যশোর হতে সাপ্তাহিক গণমানস ও দৈনিক রানার পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। পরে প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সময় পেলেই আমি ছুটে যেতাম রানার অফিসে। সব সময় মুকুলকে দেখতাম দূর হতে। সে ইচ্ছা করেই এড়িয়ে চলতো। যেহেতু আমি অনেক সিনিয়র। ১৯৭৯ সালে মুকুলের বিয়ের বৌভাতের দাওয়াতে গিয়েছিলাম।
১৯৮৪ সালে মুকুলের বাবা গোলাম মাজেদ সামরিক জান্তার হাতে কারাভোগের পর জেল হতে মুক্তি পান। আমরা যশোরের সাংবাদিকসমাজ প্রেসক্লাবে তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা জানাই। জেল থেকে বের হবার কয়েকদিন পরই তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
এরপর বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ২৯ বছর বয়সে মুকুল রানার পত্রিকার হাল ধরেন। পত্রিকা প্রকাশে তিনিও বাবার আদর্শ ও নীতি থেকে বিন্দুমাত্র পিছুপা হননি কখনও। ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে মুখোশধারী ভদ্রলোক, দুর্নীতিবাজ, আমলা, চোরাচালানি, কালোবাজারি, মজুদতারদের মুখোশ বার বার উন্মোচন করে দিয়েছেন জনসম্মুখে। এর ফলে এক সময় দৈনিক রানার পত্রিকা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গণমানুষের পত্রিকা হিসেবে খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে।
আজ একটি বিষয়ের উল্লেখ না করলে এ প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে চিরদিনই অজানা রয়ে যাবে। এর প্রকৃত ইতিহাস হবে বিকৃত। কেউ মনে রাখবে না, চাপা পড়ে যাবে এসব বাস্তব কাহিনি।
যশোর শহরের গাড়িখানা রোডে দৈনিক টেলিগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক বিনয়কৃষ্ণ মল্লিকের অফিস ছিল ‘নাজমা পেপার হাউজ’। আমরা যশোরের কয়েকজন সাংবাদিকের সন্ধ্যার পর সেখানে ছিল নিয়মিত আড্ডাখানা। বিভিন্ন কারণে প্রেসক্লাব ছিল দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ অচলাবস্থায়। প্রেসক্লাবের অভাবে আমাদের সেখানেই ছিল বিকল্প বসা-উঠার স্থান। প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের এই আড্ডাখানার চা-নাস্তার যাবতীয় ব্যয় বহন করতেন বিনয় মল্লিক। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত চলতো আমাদের এই আসর। এরপর মুকুল সোজা চলে যেতেন রানার পত্রিকা অফিসে। বাবার অবর্তমানে একটি মফস্বল জেলা শহর থেকে পত্রিকা বের করা কী ধরনের দুঃসাহসিক কাজ তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না।
তখন যশোরের সাংবাদিকদের মিলনকেন্দ্র প্রেসক্লাব দিনের পর দিন বন্ধ থাকে। আমরা এর অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছিলাম। বিনয় মল্লিকের উপর আর কতদিন আমাদের এভাবে অত্যাচার চলবে। এর একটা সুরাহা হওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়ে। নাজমা পেপার হাউজে বসেই আমরা তিনজন- মুকুল, বিনয় মল্লিক ও আমি উদ্যোগ গ্রহণ করি প্রেসক্লাবের অচলাবস্থা নিরসনের। তৈরি করা হলো একটি রূপরেখা। আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল প্রেসক্লাবের বন্ধ দরজা খুলে দেওয়া; স্বার্থান্বেষী পদলোভীদের কবল থেকে মুক্ত করা; প্রেসক্লাবকে আবার সাংবাদিকদের মিলন কেন্দ্রে পরিণত করা; সাংবাদিকদের প্রেসক্লাবমুখী করা। আর নাজমা পেপার হাউজ নয়।
বিনয় মল্লিকের টেলিফোনে আমি পূর্বাঞ্চলের ব্যুরো প্রধান প্রদীপ ঘোষকে জানালাম আমাদের পরিকল্পনার কথা। সেদিন পূর্বাঞ্চল অফিস চত্বরে বসে আমি ও দৈনিক নতুন দেশ সম্পাদক মাহমুদুল হক, মুকুল, বিনয়কৃষ্ণ মল্লিক ও প্রদীপ ঘোষ পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সেদিনকার সিদ্ধান্ত মোতাবেক যশোরে কর্মরত সব সাংবাদিককে টেলিফোনের মাধ্যমে সকাল দশটায় উপস্থিত থাকার জন্যে বলা হয়।
প্রেসক্লাবের তালা ভাঙতে হবে- এই উৎসবে সেদিন যশোরের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সাড়া দেন, শামিল হন আমাদের সাথে। তখুনি গাফফার চৌধুরীকে দ্রুত পাঠানো হয় হাটখোলা থেকে তালা-চাবিওয়ালা মিস্ত্রি নিয়ে আসতে। আমি ওর হাতে ১০০ টাকা ধরিয়ে দিলাম এই দায়িত্ব পালনে। মুকুল যদি সেদিন আমাদের পাশে না থাকতেন, সাহস না জোগাতেন, তবে এই দুঃসাহসিক কাজ আমাদের পক্ষে কিছুতেই করা সম্ভব হতো না। সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সেদিন প্রেসক্লাব আবার হয়ে ওঠে মুখরিত।
মুকুল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কখনো অনৈতিক সুবিধা, অন্যায় আবদার প্রশ্রয় দেননি। তার গুণাবলীর মদ্যে অন্যতম ছিল সময়জ্ঞান। কখনো কারো সাথে কথা ও কাজের বরখেলাপ হয়নি। তিনি ছিলেন খুবই স্পষ্টবাদী। হক কথা মুখের উপর বলতে পিছুপা হননি কখনো। কোনো প্রকার চাটুকারিতা, তোষামোদ, পরনিন্দা চর্চা, অসাক্ষাতে নিন্দা করতে কখনো দেখিনি তাকে। আর সাধারণ মানুষের প্রতি তার ছিল গভীর মমত্ববোধ।
মুকুলের আদর্শ ছিল লেখনির মাধ্যমে এ দেশের গণমানুষের জন্য শোষণমুক্ত একটি সমাজ গড়া। এখন দেশে তার মতো একজন সাংবাদিকের খুবই অভাব। মুকুল আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার আদর্শ এখনো বেঁচে আছে। তাই এখনকার সাংবাদিকদের কাজ হবে তার সেই স্বপ্ন, সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করা।
      
[লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও উন্নয়ন কর্মী]

আরও পড়ুন