মেধাবী ছাত্রটি এখন ইজিবাইকচালক

আপডেট: 11:27:11 25/07/2020



img
img

কাজী মৃদুল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) : দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে কষ্টেও হলেও চলে যাচ্ছিল সংসার। বড় ছেলে মোস্তফা কামাল কোটচাঁদপুর উপজেলার সাবদালপুর দারুল উলুম আলিম মাদরাসার শেষ বর্ষের ছাত্র। আর মেয়ে স্বর্ণালী একই মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।
‘ছেলে-মেয়ে দুটো আমার ভীষণ মেধাবী। আমি পঙ্গু, একটি পা নেই। অভাবের সংসার হলেও কারো কাছে কখনো হাত পাতিনি। এ অবস্থায় চায়ের দোকান দিয়ে সংসারের চাহিদা যতটুকু পেরেছি মিটিয়ে এসেছি। স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়ে দুটিকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবো। আজ সে স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যাওয়ার পথে। করোনা নামের অদৃশ্য ব্যাধিটি মানুষের মাঝে চরম আতংক সৃষ্টি করেছে। চায়ের দোকানে এখন আর তেমন মানুষ বসতে চায় না। চা বিক্রি একে বারেই কমে গেছে। তাই সংসার চালাতে আর পারছি না।
‘সরকারি অনুদান একদিন দশ কেজি চাল, দুই কেজি আলু পেয়েছি। আর ভাগ্যে জোটেনি। এ অবস্থায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই পড়াশুনা ছাড়িয়ে মেধাবী ছেলেকে নামাতে হয়েছে রাস্তায়। ছেলেটি এখন ইজিবাইক চালক।’
তীব্র হতাশার সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন আর ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে বার বার চোখ মুছছিলেন নজরুল ইসলাম। স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় ভেঙে পড়েছেন তিনি।
ওই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজ খান বলেন, চা বিক্রেতা নজরুল ইসলামের চাষের জমি ছিল এক বিঘা। সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে তার কাঁচা ঘরবাড়ি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হলে জমিটি বন্ধক দিয়ে ঘর মেরামত করেছেন। বাকি টাকা দিয়ে চায়ের দোকানে কিছু মালামাল তোলেন। এর পর আবার করোনার কবলে পড়ে বেচাকেনা না থাকায় দোকানের পুঁজিও শেষ হয়ে গেছে তার। যে কারণে সংসার চালানো পঙ্গু নজরুলের পক্ষে কোনো মতেই আর সম্ভব হচ্ছিল না।
চা-দোকানি নজরুল ইসলামের ছেলে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আব্বার বড় ইচ্ছা ছিল আমি লেখাপড়া শেষ করে সংসারের হাল ধরবো। কিন্তু সংসারের অবস্থা দেখে বাধ্য হয়েই লোন তুলে একটি ইজিবাইক কিনে ভাড়া মেরে বেড়াচ্ছি। করোনার কারণে যাত্রীও কম। একদিকে লোনের কিস্তি অন্যদিকে সংসারের কথা চিন্তা করে প্রচুর খাটতে হয়। সারাদিন খুব পরিশ্রম হয়ে যায়। রাতে বাড়ি ফিরে আর বই নিয়ে বসার শক্তি থাকে না।’
মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কারো সহযোগিতা পেলে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারতাম। এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছি।’
সংশ্লিষ্ট মাদরাসাটির প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, ‘মোস্তফা কামাল আমার প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্র। আমরা মাদরাসার বেতনসহ অন্যান্য বিষয়গুলো দেখতে পারি। কিন্তু তাদের সংসারের বিষয়টি আমরা তো দেখতে পারছি না। করোনাভাইরাসের কারণে তার পঙ্গু বাবার চায়ের দোকানে তেমন বেচাকেনা না হওয়াতে সংসারে অভাব-অনটন ওদের পরিবারের ওপর জেঁকে বসেছে। যে কারণে বাধ্য হয়েই ছেলেটিকে ইজিবাইক চালিয়ে উপার্জন করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে মোস্তফা কামাল লেখাপড়ায় ফিরতে পারবে কিনা জানি না। আর ফিরলেও তার পক্ষে ভালো ফল করা কঠিন হয়ে পড়বে।’
বিষয়টি নিয়ে সাবদালপুর ইউপি চেয়ারম্যান এবং ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি নয়াব আলী নাছির বলেন, ‘নজরুল ইসলামকে পঙ্গু ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর সাহায্য তেমন একটা ইউনিয়ন পরিষদে না আসায় আমরা এসকল মানুষকে তেমন কিছু সাহায্য করতে পারি না। তবে আগামীতে দেখবো ওই পরিবারের জন্য কিছু করা যায় কিনা।’

আরও পড়ুন