যশোরাঞ্চলে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বিপজ্জনক হচ্ছে!

আপডেট: 11:57:55 26/06/2020



img

কবীর সাঁই : যশোরাঞ্চলে করোনাভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ কি বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে? প্রতিদিন যেভাবে শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে মৃত্যুও বাড়তে পারে লাফিয়ে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ঠিক কত মানুষ এই মারণব্যাধিতে আক্রান্ত, সেই ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। তবে দিন দিন যে শনাক্ত ও মৃতের হার বাড়ছে, তার পরিষ্কার সাক্ষ্য দিচ্ছে পরিসংখ্যান। সংক্রমণের চতুর্থ ধাপে পৌঁছালে মৃত্যুর হার দ্রুত বাড়বে বলে দেশের একজন শীর্ষ অণুজীববিজ্ঞানী আশঙ্কার কথা বললেন।
বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের তথ্য সরকারিভাবে জানানো হয় গত ৮ মার্চ। এর এক মাসের কিছু সময় পর ১৩ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, দেশে করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। তখন পর্যন্ত ঢাকা ও পাশের কয়েকটি অঞ্চলেই মূলত করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটছিল। খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে তখনো করোনা রোগী শনাক্তের হার তলানিতে। অবশ্য পর্যাপ্ত পরীক্ষার ব্যবস্থাও এই অঞ্চলে করা হয়নি।
গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গেল এক সপ্তাহে যশোর জেলার সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের শরীর থেকে সংগ্রহ করা দুই শতাধিক নমুনা পজেটিভ রেজাল্ট দিয়েছে। এর সিংহভাগই নতুন শনাক্ত হওয়া রোগী; সামান্য অংশ ফলোআপ।
যশোর সিভিল সার্জনের দেওয়া হিসেব মতে, আজ শুক্রবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জেলায় মোট ৪৬৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন সাতজন। নিরাময় লাভ করেছেন ১৫৭ জন।
এর আগের দিন জেলা প্রশাসকের দপ্তরের দেওয়া হিসেবে মতে, জেলায় তখন পর্যন্ত ৪৩৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন পাঁচজন। অর্থাৎ পরের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় শনাক্ত রোগী বেড়ে যায় ৩৩ জন, মৃত্যু বাড়ে দুই।
গেল সপ্তায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জেনোম সেন্টারে যশোরের ৬৬১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২০১টি পজেটিভ ফল দেয়। এর বাইরে এই সময়কালে প্রায় প্রতিদিনই খুলনা মেডিকেল কলেজ ল্যাব থেকে যশোরের এক বা একাধিক নমুনা পজেটিভ হয়।
যশোরের আশপাশের জেলাগুলোর অবস্থাও কম-বেশি একই রকম। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে খুলনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এর পরই যশোর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার অবস্থান।
তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
এই বিষয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ অণুজীববিজ্ঞানী এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলছেন, এখনো পর্যন্ত যত নমুনা পজেটিভ ফল দিচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। তার মতে, পর্যাপ্ত পরীক্ষার অভাবে জানা যাচ্ছে না, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আসলে কত লোক। এছাড়া নমুনা যেভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার মধ্যেও গলদ রয়েছে। ফলে ‘ফলস নেগেটিভ’ রেজাল্টের সংখ্যাও কম না। আবার, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগের মধ্যে কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা যায় না। উপসর্গবিহীন এই সব মানুষ মূলত নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রমের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে অন্যরা সংক্রমিত হচ্ছেন ঠিকই।

কমিউনিটি ট্রান্সমিশন কী?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা বলেন, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এমন একটি পরিবেশকে নির্দেশ করে, যখন কোনোভাবেই বোঝা যাবে না মানুষ কোথা থেকে বা কার মাধ্যমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। দেখা গেল, একজন করোনায় আক্রান্ত রোগীর কোনো ধরনের লক্ষণ বা উপসর্গ নেই। অথচ তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবেশটা এমন যে, আপনি যে কারো কাছ থেকে অথবা যেকোনোভাবে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু তার উৎস জানা যাবে না।

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?
যশোর মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. গিয়াস উদ্দিন এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে বলছেন, ‘ফুল কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’। এই অঞ্চলের কোনো উপজেলা নেই, যেখানে করোনা রোগী নেই। চীনের উহানে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পর তা ধীরে ধীরে দুনিয়ার অন্য দেশে বিস্তৃত হয়। আমাদের দেশে এই ভাইরাসের অলিখিত সোর্স হলো চীন বা ইতালি থেকে আসা প্রবাসীরা। প্রথমে তাদের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এরপর ছড়িয়ে পড়েছে অন্যদের মধ্যে।
সুবর্ণভূমির প্রশ্নে এই অধ্যাপক বলেন, ‘যদি কোনো উপজেলা বা জনপদ বাদ থাকতো, তাহলে তাকে সীমিত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলা যেত। কিন্তু যশোরের আটটি ছাড়াও এই অঞ্চলের সব উপজেলায় করোনা রোগীদের অবস্থান শনাক্ত হয়েছে। ফলে এখনকার পর্যায় হলো ফুল কমিউনিটি ট্রান্সমিশন।’
যশোর স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রধান ডা. শেখ আবু শাহীন বলছেন, যখন কোনো ব্যক্তির করোনা আক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট সোর্স খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন তাকে সামাজিক সংক্রমণ বলা যেতে পারে। তবে এখন যশোরাঞ্চলে সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে কি-না তা তিনি নিশ্চিত না।
সিভিল সার্জন সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘আমি তো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ না। ফলে আমার পক্ষে বলা কঠিন। তবে ধারণা করতে পারি (সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে)।’
যশোরে প্রথম যাকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়, তিনি মণিরামপুর উপজেলার একজন স্বাস্থ্যকর্মী। তিনি কোথা থেকে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই তথ্য আজও উদ্ধার করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ।
এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘এমন আরো কয়েকটি কেস আছে, যেগুলোর উৎস সম্বন্ধে আমরা জানতে পারিনি।’

পরিস্থিতি কত ভয়াবহ হতে পারে?
দেশের অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, এখন করোনাভাইরাসের চতুর্থ পর্যায় (ফোর্থ স্টেজ) চলছে। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অণুজীববিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যুবক বা মধ্যবয়সীদের আক্রান্তের হার বেশি। এটা থার্ড স্টেজ। ফোর্থ স্টেজে বেশি করে আক্রান্ত হবেন বয়স্ক ব্যক্তিরা। তখন রোগী মৃত্যুর হারও বেড়ে যাবে অনেক। বয়স্ক ব্যক্তিদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম। কার্যকর চিকিৎসা না থাকায় তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
‘দেখবেন, বয়স্ক ব্যক্তিরা আক্রান্ত হচ্ছেন, আর ধপাস করে মরছেন। সেটা হবে খুবই উদ্বেগজনক, ভয়াবহ পরিস্থিতি,’ বলছিলেন দেশের শীর্ষ অণুজীববিজ্ঞানী ড. আনোয়ার।

তাহলে উপায়?
অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন কার্যকরের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গোটা দেশকে ভাগ করা হয়েছে তিন ভাগে- রেড, ইয়োলো ও গ্রিন। রেড জোনে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের কথা। ইতিমধ্যে রাজধানীর একটি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল লকডাউনের আওতাভুক্ত হয়েছে। যশোরের ২০টির বেশি এলাকা রেড জোনভুক্ত। কিন্তু এসব এলাকা কার্যকর লকডাউন হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে জনমনে। বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, তারা যে রেড জোনে বসবাস করছেন, সেটাও বুঝতে পারছেন না। জনজীবন কার্যত স্বাভাবিক।
অবশ্য যশোর জেলা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কমিটির একাধিক কর্তা বলছেন, শহরের ওয়ার্ড বা গ্রামাঞ্চলের ইউনিয়নজুড়ে রেড জোন ঘোষণা করা হলেও লকডাউন করা হচ্ছে যে বাড়িতে করোনা রোগীর অবস্থান, তার চারদিকে ১০০ মিটার পর্যন্ত। গোটা ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন লকডাউন করার মতো সামর্থ প্রশাসনের আছে কি-না, তা নিয়েও সন্দিহান সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা। কারণ বড় এলাকা লকডাউন করা হলে আওতাভুক্ত গরিবদের খাদ্যসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি সরবরাহ করতে হবে।
এছাড়া এখন পর্যন্ত শনাক্ত করোনা রোগীদের অর্ধেকের বেশির অবস্থান রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ সন্নিহিত এলাকায়। গণমাধ্যমের খবর, করোনা পরিস্থিতিতে শুধু রাজধানী থেকেই কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরেছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। এই সব মানুষ ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের আনাচে-কানাচে। তারা যে করোনাভাইরাস বহন করে আনেননি, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? যদি তাই-ই হয়, তাহলে দ্রুতই গোটা দেশকে রেড জোন ঘোষণা করা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।
যশোরের জেলা প্রশাসক এবং করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শফিউল আরিফ এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় যোগ করেন। সুবর্ণভূমিকে তিনি বলেন, গত ঈদের আগে কড়াকড়ি শিথিল করায় বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামে আসেন। তাদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস।
নিয়ন্ত্রণের পথ কী?- এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট এলাকা লকডাউন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছি। অভয়নগরে এই বিষয়ে কড়াকড়ি করায় ফল পাওয়া গেছে।’
অণুজীববিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেনেরও একই মত। তিনি বলছেন, ‘সবচেয়ে ভালো পথ হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেট করে ফেলা। ১০০ জনকে মুক্ত রেখে একজনকে বিচ্ছিন্ন করা অনেক সহজ পথ। আর মানুষকে সচেতন হতে হবে। তা না হলে সরকার কোনোভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’
এই প্রসঙ্গে তার পরামর্শ, ‘নিজে বাঁচবো, অন্যকে বাঁচাবো- এভাবে না ভাবলে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। খুব দরকার না হলে আমরা বাইরে বেরুবো না। অপরিচিত মানুষের সাথে মিশবো না। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।’
এই ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশে ‘ফোন ট্রাকিং সিস্টেম’ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষ খুঁজে বের করতে এই পদ্ধতি বহু দেশে সুফল দিয়েছে বলে জানান ড. আনোয়ার।

আরও পড়ুন