যশোরে নির্মিত হচ্ছে প্রথম মিত্র ও মুক্তিবাহিনী স্মৃতিস্তম্ভ

আপডেট: 11:04:44 05/12/2019



img

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন রাজাকারদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরায় নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম মিত্র ও মুক্তিবাহিনী স্মৃতিস্তম্ভ। স্বাধীনতা যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য ভারতীয় সাত সেনার আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছে।
স্মৃতিস্তম্ভটি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব গাথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
তবে, মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, ইতিহাস সংরক্ষণে দুই একটি অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সকল স্থানকে শনাক্ত করে প্রতীকী অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোর। এ জেলারই বাঘারপাড়া উপজেলার অন্তর্গত খাজুরা বাজার স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন রাজাকারদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসর রাজাকারদের সমন্বয়ে খাজুরা এন এম মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তখন স্থাপন করা হয়েছিল রাজাকার ক্যাম্প। এর নেতৃত্বে ছিলেন ডা. ইব্রাহিম; যিনি দ্বিতীয় টিক্কা খান নামে সমধিক সমালোচিত ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, ডা. ইব্রাহিমের নেতৃত্বে পুরো খাজুরা অঞ্চলে কায়েম করা হয় ত্রাসের রাজত্ব। এ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে চালানো হতো নির্মম-পৈশাচিক নির্যাতন ও নিপীড়ন। এরপর তাদের ক্যাম্পের পেছনের চিত্রা নদী পাড়ে নিয়ে হত্যা করে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার আগেই পরাজয় নিশ্চিত জেনে যশোর ক্যাম্প ছাড়তে শুরু করে পাক সেনারা। মিত্রবাহিনী ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত করে পাক সেনাদের পিছু নিয়ে পরের দিন চলে যায় খাজুরায়। এসময় তারা রাজাকার ডা. ইব্রাহিমের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এতে নিহত হন মিত্রবাহিনীর ভারতীয় ছয় সেনা সদস্য; আহত হন আরো একজন। যুদ্ধ শেষে নিহত ছয় সেনাকে ক্যাম্পের অদূরেই দাহ করা হয়।
তাদের সেই বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম মিত্র ও মুক্তিবাহিনী স্মৃতিস্তম্ভ।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা গবেষক অধ্যাপক গোপীকান্ত সরকার বলেন, মিত্রবাহিনী যখন এনএম মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছায় তখন রাজাকাররা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এসময় পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেন মিত্রবাহিনীর সদস্যরা। একপর্যায়ে রাজাকাররা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এসময় মিত্রবাহিনীর সদস্যরা তাদের ‘জয় বাংলা’ বলে আত্মসর্মপণের আহ্বান জানান। রাজাকাররা আত্মসমর্পণে রাজি হলে মিত্রবাহিনীর সাত সদস্য গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যান। তবে তারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। রাজাকাররা এনএম মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংকার থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ছয় ভারতীয় সেনা নিহত হন। এছাড়া অপর এক সেনা আহত হন। তাদের মৃত্যুর খবর পেয়ে ব্যাকআপ বাহিনীর সদস্যরা এগিয়ে আসেন। এসময় সেল নিক্ষেপ করে রাজাকার ক্যাম্পের একটি অংশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরওপর কয়েকটি ট্যাংক এসে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে থাকা বাংকারগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। এতে মাটিচাপা পড়ে মারা যায় অনেক রাজাকার। আর যারা জীবত ছিল, তাদের ধরে গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে কয়েকজন রাজাকার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
অধ্যাপক গোপীকান্ত সরকার আরো বলেন, কেবল মিত্রবাহিনীর সদস্যরা নয়, এ যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে একটি প্রতীকী অবকাঠামোর প্রয়োজন ছিল। সেটিই স্থানীয় শহীদ মিত্র ও মুক্তিবাহিনী স্মৃতি পরিষদের দাবির প্রেক্ষিতে নির্মাণ হচ্ছে।
শহীদ মিত্র ও মুক্তিবাহিনী স্মৃতি পরিষদের সেক্রেটারি মশিয়ার রহমান বলেন, ‘‘আমার বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। এছাড়া পরিবারের সবাই কমবেশি মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। রাজাকার ক্যাম্পের অদূরেই বাড়ি হওয়ায় তাদের নির্যাতনের চিত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়েছে। সর্বশেষ মিত্রবাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগের বিষয়টি আমাকে নাড়া দেয়। এরপর এ অবদানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগে গ্রহণ করি। নব্বইয়ের দশকে এসে ‘শহীদ মিত্র ও মুক্তিবাহিনী স্মৃতি পরিষদ’ গঠন করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। সর্বশেষ শেখ হাসিনার গত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নুহ উল আলম লেনিনকে একটি অনুষ্ঠানে আনা হয় এবং শহীদ মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের স্মৃতি রক্ষায় ‘শহীদ মিত্র ও মুক্তিবাহিনী ফলক’ উন্মোচন করা হয়। পরবর্তীতে তার পরামর্শে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। যার প্রেক্ষিতে এ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু হয়েছে।’’
খাজুরা এনএম মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দেওয়া পাঁচ শতক জমিতে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এ স্মৃতিস্তম্ভ; যা বিজয়ের এ মাসেই উদ্বোধন করা হবে।

আরও পড়ুন