যশোরে ‘কাগুজে লকডাউন’ এবার কঠোর হচ্ছে!

আপডেট: 12:45:25 24/06/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোরে ‘কাগুজে লকডাউন’ এবার কঠোর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে যেভাবে শহরের ওয়ার্ড বা গ্রাম পর্যায়ে ইউনিয়নজুড়ে লকডাউনের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, কার্যকরের ক্ষেত্রে তেমনটি হবে না। যে বাড়িতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি অবস্থান করছেন, সেটিকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট এলাকায় কড়াকড়ি লকডাউন কার্যকর করা হবে। গেল সপ্তায় যশোর শহরের তিন নম্বর ওয়ার্ডের (ঘোপ) সীমিত এলাকায় যেভাবে লকডাউন কার্যকর হয়েছে, দৃশ্যত সেইটাকে ‘আদর্শ’ হিসেবে ধরে এগুচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। বেশি করে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের।
আজ দুপুরে অনুষ্ঠিত ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটি’র সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। জেলা প্রশাসক ও কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শফিউল আরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এর বাইরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভা শেষে জেলা প্রশাসক সুবর্ণভূমিকে জানিয়েছেন, যশোরে উদ্বেগজনক হারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, লকডাউন কার্যকর করতে জনপ্রতিনিধিদের আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করা হবে। লকডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের তা অবহিত করা হবে। জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে লকডাউন কার্যকর ও সংশ্লিষ্ট এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকায় এই সংক্রান্ত সতর্কতা মাইকেও প্রচার করা হবে।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে শহরের একটি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। ওই ক্লিনিককে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সভা শেষে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন সুবর্ণভূমিকে বলেন, যশোর শহরের বকচরে অবস্থিত বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতাল ছাড়াও কেন্দ্রীয় বাসটারমিনালের কাছে অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতাল গ্রিন ড্রিম লিমিটেডকে (জিডিএল) করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হবে। বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতালে থাকা করোনা রোগীদের জিডিএলে আনা হবে। এই সময়কালে বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতালটির দরকারি সংস্কার করা হবে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলছেন, বেসরকারি হাসপাতালটিরও কিছু সংস্কার করা দরকার। সেটিও করা হবে।
যশোর বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২৮। আর জিডিএলের শয্যা ৩০টি।
সভায় উপস্থিত পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু সুবর্ণভূমিকে বলেন, শহর এলাকায় সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলদের মাধ্যমে লকডাউন কার্যকর করা হবে। গোটা বিষয়টি দেখাশুনা করার জন্য একটি মনিটরিং টিম আগেই গঠন করা হয়েছে। এই টিমে একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন ডাক্তার, পৌরসভার একজন কর্মকর্তা, গণমাধ্যম প্রতিনিধি রয়েছেন। তারা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি অফিসে বসে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
মেয়র জানান, প্রত্যেক এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে করোনা প্রতিরোধ কমিটি কাজ করবে। কয়টা বাড়ি লকডাউন করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন। লকডাউন হয়ে যাওয়া এলাকায় বসবাসরত গরিবদের পৌরসভার পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। অন্যান্য এলাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই কাজটি করবে।
সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত আজকের সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন যশোরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন, করোনা সংক্রান্ত সেনা তৎপরতায় যশোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লে. কর্নেল নিয়ামুল, পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন, প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুনসহ সংশ্লিষ্টরা।
সভা থেকে ইবনে সিনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে করোনা প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা যেমন ডাক্তার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মীদের চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানানো হয়। ইবনে সিনা কর্তৃপক্ষ দ্রুতই তাদের সিদ্ধান্ত জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান সিভিল সার্জন।
গত ২৭ এপ্রিল যশোর জেলাজুড়ে প্রথমবারের মতো লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এরপর গেল ১৬ জুন জেলার ১৭টি এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করে ওই সব অঞ্চল লকডাউনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে আরো কিছু ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই মুহূর্তে যশোর শহরের প্রায় অর্ধেক অংশ রেড জোনভুক্ত। এসব এলাকাকে লকডাউনের আওতায় আনা হলেও সিদ্ধান্ত মূলত কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জনজীবন আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলছে। অভিযোগ করা হয়, সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে একতরফাভাবে রেড জোন ঘোষণা করা হওয়ায় এবং এর সঙ্গে জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয়দের সম্পৃক্ত না করায় ঘোষণা কার্যকর করা যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে আজকের বৈঠকে জনপ্রতিনিধিদের বেশিমাত্রায় সম্পৃক্ত করে ‘সুনির্দিষ্ট এলাকায়’ কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলো। লকডাউন বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি ছাড়াও স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবীসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভূমিকা রাখবেন বলে আজ সিভিল সার্জন জানান।
গেল রাতে পরীক্ষা করে আজ যশোর জেলার ২৮টি নমুনা করোনা পজেটিভ বলে জানিয়েছে যবিপ্রবি জেনোম সেন্টার। এই জেলায় এখন করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা সাড়ে তিনশ’য়ের বেশি।

আরও পড়ুন