যাদের খবর রাখেন না কেউ

আপডেট: 04:24:22 12/05/2020



img
img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : দুই সন্তানসহ কুলসুম বেগমকে ফেলে স্বামী ইয়াসিন হোসেন উধাও হয়েছেন ৮-১০ বছর আগে। অল্প বয়স হলেও নতুন সংসার না পেতে স্কুলগামী সন্তানদের বুকে নিয়ে পড়ে আছেন বাপের ভিটেয়। রাস্তায় কাজ করে, বেকারিতে রান্না করে এমনকি অন্যের বাড়িতে কাজ করে অনেক কষ্টে দিন যায় কুলসুমের। উপরন্তু দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ। করোনা ভাইরাসের কারণে গত দুইমাস সবধরনের কাজ বন্ধ কুলসুম বেগমের।
মানুষের এই দুর্দশার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কত লোককে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তা পৌঁছায়নি কুলসুম বেগমের হাতে।
একই বাড়িতে বসবাস কুলসুম বেগমের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলমের। বেকারির পণ্য ফেরি করে বৃদ্ধা মা ও স্ত্রী সন্তান নিয়ে কোনো প্রকার কেটে যাচ্ছিল তারও। করোনায় তিনিও গৃহবন্দি। সরকারি ত্রাণের জন্য জাহাঙ্গীর নেতাদের পিছে হেঁটেও একমুঠো চাল আনতে পারেননি।
একই গ্রামের ইমরান হোসেন মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালিয়ে সংসার চালান। বৃদ্ধা দাদি ইমরানের সঙ্গেই থাকেন। ত্রাণ জোটেনি তাদেরও।
ইমরানের পাশের বাড়ির বাসিন্দা নূর হোসেন ছুট্টি। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে কর্মহীন করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করলেও সমাজপতিদের কেউ এগিয়ে আসেনি একমুঠো ত্রাণ নিয়ে।
নূর হোসেনের পাশেই বাড়ি বিধবা আনোয়ারার। স্বামী ইব্রাহীম পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। অল্প বয়সী দুই ছেলেকে নিয়ে কষ্টের সাগর পাড়ি দিচ্ছেন তিনি।
এরা সবাই মণিরামপুর উপজেলার মাহমুদকাটি গ্রামের বাসিন্দা। ভিজিডি বা ফেয়ারপ্রাইস এমনকি সরকারি কোনো সহায়তায় নাম নেই। তাদের অভিযোগ, ৪-৫ বার করে আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়েছেন নেতারা। কিন্তু কপালে কিছুই জোটেনি।
খেদাপাড়া ইউপির সাত নম্বর (মাহমুদকাটি-কদমবাড়িয়া) ওয়ার্ডের কদমবাড়িয়া গ্রামের স্বামীহারা জামেলা, জাহানারা ও নূরজাহান বেগম। এদের সংসার দেখার কেউ নেই। আবার সমাজের জনপ্রতিনিধি বা নেতারাও ফিরে তাকান না।
কুলসুম ও জাহানারাদের মতো এমন বহু পরিবার মাহমুদকাটি-কদমবাড়িয়া গ্রামে রয়েছেন; যাদের খবর কখনো রাখেন না কেউ। সরকারি ত্রাণ বা কোনো সহযোগিতা এলে যাদের ওপর তালিকার দায়িত্ব পড়ে তারা নিজের পরিবার বা ঘনিষ্ঠদের নাম দিয়ে তা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ।
করোনা পরিস্থিতিতে ঈদ উপলক্ষে গৃহবন্দি কর্মহীন, দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য নগদ অর্থ ও চাল দিতে যাচ্ছে সরকার। মাসিক ২০ কেজি করে চাল পেতে পারেন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। সেই লক্ষে মণিরামপুরে ১২ হাজার লোকের তালিকা হচ্ছে। তার মধ্যে খেদাপাড়া ইউপির সাত নম্বর ওয়ার্ডে ৭৯ জনের তালিকা জমা হয়েছে। তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ওই ওয়ার্ডের মেম্বার তায়জুল ইসলাম নিজের ছেলের নাম দিয়েছেন। শুধু মেম্বার না, তালিকা প্রস্তুতির কাজে যারাই ছিলেন তারাই নিজের বা পরিবারের নাম দিয়ে রেখেছেন; যারা এই তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য নয়।
ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম মশিউর রহমান মুকুল তার পরিবারের সচ্ছল চারজনের নাম দিয়েছেন। যারা শিক্ষক দম্পতি ও প্রবাসীর স্ত্রী। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সরকারি সহায়তার তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মুকুলকে দলীয়ভাবে শো-কজ করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে তার কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডের ত্রাণ সংক্রান্ত সব দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান খেদাপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল আলীম জিন্নাহ।
এদিকে, মাহমুদকাটি-কদমবাড়িয়া ওয়ার্ডের মানবিক সহায়তার ৭৯ জনের তালিকার মধ্যে সচ্ছল ও অযোগ্য নয়জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সেখানে কুলসুম, জামেলা, জাহানারা ও নুর জাহানসহ নয়জনের নাম যুক্ত করা হয়েছে। তবু তালিকায় এখনো সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।
জানতে চাইলে খেদাপাড়া ইউপির সাত নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তায়জুল ইসলাম মিলন বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ; তাই ছেলের নাম তালিকায় দিয়েছি।’
খেদাপাড়া ইউপি সচিব মৃণালকান্তি বলেন, ইতিমধ্যে অভিযোগ তদন্ত করে সাত নম্বর ওয়ার্ডে নয়টি নাম সংশোধন করে নতুন নাম যুক্ত করা হয়েছে। যত অভিযোগ আসবে সেগুলো তদন্তসাপেক্ষে বাদ দেওয়া হবে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী বলেন, মেম্বারের ছেলের নাম তালিকায় দেওয়ার সুযোগ নেই। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া কোথাও কোনো অভিযোগ আসলে সেগুলো তদন্তসাপেক্ষে বাদ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সচিবদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।

আরও পড়ুন