যেভাবে জীবন বদলে দেবে ফাইভজি

আপডেট: 10:25:37 04/10/2021



img
img

জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: প্রযুক্তির বিভিন্ন উদ্ভাবনী আবিষ্কার আমাদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি প্রতিদিনের জীবনকে সহজ করেছে। আমাদের জীবনযাত্রা আরও সহজ করতে বিশ্বব্যাপী চালু হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুততম নেটওয়ার্ক ফাইভজি। একবার চিন্তা করুন অগমেন্টেড রিয়েলিটি, মোবাইল ভার্চুয়াল রিয়েলিটি-সহ উন্নত মানের ভিডিও কনটেন্ট আমাদের জীবনকে কত স্মার্ট করে তুলছে। ফাইভজির কল্যাণে আগামী দিনে এমন অনেক নতুন সেবা আসবে, যা আমরা এখনও ভাবতেই পারছি না।
পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস যোগাযোগ বিশ্বব্যাপী বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে, যার ফলে অনেক শিল্পে এটি বড় পরিসরে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ফাইভজি একটি ব্যাপকভিত্তিক তারবিহীন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রযুক্তি, যার গতি এতটাই বেশি যে, এটা প্রায় রিয়েল টাইমে তথ্য পাঠানো এবং এর প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করতে সক্ষম। ফাইভজি মানুষের আগামী দিনের জীবনযাপনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
বর্তমানের অনেক কিছুকেই ফাইভজি সম্পূর্ণভাবে রূপান্তর ঘটিয়ে আমাদের অভিনব অভিজ্ঞতার স্বাদ দেবে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, রিমোট রোবোটিক্স, এআর-ভিআর, গেমিং এবং আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংসের মতো সেবা- যেগুলোতে তাৎক্ষণিক এবং সর্বক্ষণিক তথ্যের আদান-প্রদান প্রয়োজন হয়।
ফাইভজিতে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ জিবিপিএস পর্যন্ত বেশি ডেটা ট্রান্সমিশন স্পিড পাবেন গ্রাহকেরা, এতে মোবাইল ডেটা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। ব্যবহারকারীরা তাদের যে কোনও তথ্য, ডেটা এবং প্রোগ্রাম সুপারফাস্ট গতিতে ব্যবহার করতে পারবেন। আগামীতে আমাদের শরীরে লাগানো ফিটনেস ডিভাইসগুলো নিখুঁত সময়ে সংকেত দিতে পারবে, জরুরি চিকিৎসা বার্তাও পাঠাতে পারবে।
আগামী দিনে হয়তো ড্রোনের মাধ্যমে গবেষণা এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা হবে, অগ্নিনির্বাপণে সহায়তা করবে। আর সেসবের জন্যই ফাইভজি প্রযুক্তি সহায়ক হবে। এমনকি চালকবিহীন গাড়িতে লাইভ ম্যাপ ও ট্রাফিক তথ্য রিয়েল টাইমে সমন্বয় করার জন্যও ফাইভজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাসাবাড়ির গ্যাজেট ব্যবহার পাল্টে দিচ্ছে ফাইভজি। বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা সব ধরনের ডিভাইস দিয়েই রিয়েল-টাইমে তথ্য শেয়ার করতে পারা যাবে। ডিভাইসের মধ্যে সংযোগ নির্বিঘ্ন হবে; কারণ, ফাইভজি ডিভাইসগুলো সহজেই ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করে একে অপরের সঙ্গে রিয়েল-টাইমে তথ্য শেয়ার করে নিতে পারে। এতে সহজেই বাসার নিরাপত্তাসহ পুরো আইওটি ইকোসিস্টেম উন্নত করা যাবে।
আগামী দিনে যেসব শিল্পে ফাইভজি-সম্পন্ন ডিভাইস থাকবে, তারা এগিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। কারণ, এতে সহজেই এক ডিভাইস অন্য ডিভাইসের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করতে পারবে। ফাইভজি রিয়েল-টাইমে দূর থেকে কার্যক্রম সম্পন্ন করতে দেওয়ায় দূরে বসে কোনও কারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতিসহ লজিস্টিক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
সারা বিশ্বই এখন মোবাইল-নির্ভর হয়ে উঠছে এবং প্রতিদিনই আমরা আরও বেশি তথ্য ব্যবহার করছি। বিশেষ করে আমাদের জীবনযাত্রায় ভিডিও-নির্ভর কনটেন্টের পরিমাণ অনেক বাড়ছে। বর্তমান নেটওয়ার্কে অনেক সময় এসব সেবা নিতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়। বিশেষ করে যখন কোনও একটি এলাকায় একসঙ্গে অনেক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখন বেশি সমস্যা দেখা যায়। এ রকম পরিস্থিতিতে ফাইভজি অনেক ভালো সেবা দিতে পারবে।
বর্তমানে আমরা আমাদের স্মার্টফোন দিয়ে যা-ই করি না কেন, ফাইভজি হলে তা আরও দ্রুত গতিতে এবং ভালোভাবে করতে পারব। ফাইভজি-নির্ভর স্মার্টফোনে ব্যবহারকারীরা অসামান্য ডাউনলোড গতিও পাবেন। রিয়েল-টাইম স্ট্রিমিং এবং দ্রুত ডেটার অ্যাক্সেস সুবিধা ফাইভজিতে সহজেই পাবেন ব্যবহারকারীরা। এখন ডিভাইস ব্যবহারের অন্যতম অসুবিধা এর ল্যাটেন্সি। যেহেতু ফাইভজিতে ল্যাটেন্সি সর্বকালের সর্বনিম্ন থাকবে, তাই বিশ্বের যে কোনও দেশের ব্যবহারকারীরা তাদের ডিভাইসে পাবেন বিদ্যুৎগতির ইন্টারনেট সুবিধা।
বর্তমানে যেসব ভিডিও গেমস খেলা হয়, ফাইভজি প্রযুক্তি সেসব গেমসের ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ফাইভজি প্রযুক্তির বহুমুখী রূপান্তর ক্ষমতার কারণে যারা মাল্টিপ্লেয়ার গেমিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, তারা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাবেন। উচ্চগতি, অধিক শক্তিশালী ব্যান্ডউইথ, এমএম ওয়েভ ফাইভজির আল্ট্রা লো লেটেন্সি গেমারদের আরও উন্নত গেমিং অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। যেখানে গেমাররা বাস্তবধর্মী গ্রাফিক্স অভিজ্ঞতা পাবেন। ফাইভজি প্রযুক্তি চালু হলে গেমাররা ক্লাউড গেমিং সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন। ফলে গেমাররা যে কোনও স্থান থেকে তাদের স্মার্ট পারসোনাল ডিভাইসে প্রিমিয়াম গেমিং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। এ জন্য গেমারদের গেমিং হার্ডওয়্যারে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। ফাইভজি প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলে ক্লাউড গেমিংয়ে ল্যাটেন্সির যে সমস্যা রয়েছে সেটি অনেকাংশে কমে যাবে।
বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারি আঘাতের মধ্যেও ফাইভজি প্রযুক্তির সঙ্গে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংকস) বাধাহীনভাবে বিকাশ লাভ করেছে। এটা প্রয়োজনের তাগিদ থেকেই হয়েছে। একটা নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্যে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের চ্যানেলগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল হয়ে ওঠে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইকোসিস্টেম এখন অনেকটাই দৃশ্যমান হয়েছে।
বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডাব্লিউসি)-এর মতে, ঠিক এই মুহূর্তে ফাইভজি শিল্পখাতে বড় পরিসরে বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রস্তুত। এর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার ১৩ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ওয়্যারলেস ডিজিটাল নেটওয়ার্কের উন্নয়নে বিপ্লব ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানে ফাইভজির গতি এবং কাভারেজের ক্ষেত্রে তার পূর্বসূরিদের ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
বাংলাদেশ সরকার যে ফাইভজি নেটওয়ার্ক চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি খুবই সময়োপযোগী ও সঠিক পদক্ষেপ বলেই মনে করি। এটি ভার্চুয়াল যুগে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে এবং বাংলাদেশের জন্য একটি প্রজন্মকে তাদের আত্মপ্রকাশ করতে আরও অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব, ফাইভজি এখন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে, নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সামনে আরও কিছু নতুনত্ব আশা করতে পারি, এতে বিশ্বের নতুন প্রান্তে নতুন উদ্ভাবনের উদ্ভব ঘটবে।
[লেখক : কান্ট্রি ম্যানেজার, শাওমি বাংলাদেশ। এনটিভি থেকে।]

আরও পড়ুন