রঙিন মাছে পাল্টে গেছে সাইফুলের জীবন

আপডেট: 01:58:22 18/01/2021



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : একসময় চাকরির জন্য সাইফুল দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। টাকার জন্য হাত পেতেছেন পরিবারের কাছে; অভাবের কারণে তাও জোটেনি। আজ সেই সাইফুল এখন বেকার যুবকদের চাকরি দেন।
রঙিন মাছে স্বপ্ন পূরণ করেছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ব্রজবক্স গ্রামের সাইফুল ইসলাম। বদলে গেছে তার জীবন। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি তাকে পরিচিতিও এনে দিয়েছে। সবাই তাকে চেনে ‘রঙিন মাছের কারিগর’ হিসেবে।
মাত্র ৬২০ টাকা পুঁজি নিয়ে রঙিন মাছ চাষ করে সাইফুল এখন ২০ লাখ টাকার মালিক।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৭ সালে চাকরির জন্য ভারতে গিয়েছি। সেখানে টেক্সটাইল মিলে হেলপার হিসেবে ২বছর ৭ মাস কাজ করি। কাজের ফাঁকে অ্যাকুরিয়ামে রঙিন মাছের চাষ দেখে নিজেই স্বপ্ন বুনেছি। দেশে ফিরে রঙিন মাছের চাষ করবো। ১৯৯৯ সালে দেশে ফিরে আসি। পরিবারের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করি। কিন্তু অভাবের কারণর টাকা তো দেয়ইনি, বরং আমাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। বেকার জীবনের ধকল সামলাতে ২০০০ সালে চলে যাই রাজধানী ঢাকার মিরপুরে গার্মেন্টসে। সেখানে কাজ করতে করতে পরিচয় হয় লিংকন নামে এক রঙিন মাছ বিক্রেতার সাথে। তার মাধ্যমে পরিচয় হয় তামিম নামের আরও একজন রঙিন মাছ ব্যবসায়ীর সাথে। মাত্র ৬২০টাকা দিয়ে ৬ জোড়া মাছ কিনে শুরু করি কাজ। প্রথমে সাফল্য আসেনি। পরে আবার চেষ্টা করি। এবার সাফল্য এসে ধরা দেয় আমার হাতে। ডিম ফুটে রঙিন মাছের পোনা দেখে সেদিন যে আনন্দ পেয়েছিলাম তা কোনদিন ভুলতে পারি না।
তিনি আরও বলেন, চাকরির আশায় না থেকে শিক্ষিত যুবরা যদি তাদের ইচ্ছা শক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে, তাহলে তারা মানব সম্পদে পরিণত হবে। শুধু দরকার উদ্যোগ আর ইচ্ছাশক্তি।
সাইফুল বলেন, এক সময় শখের বসে রঙিন মাছে চাষ করলেও পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পুকুর লিজ নিই। সেই পুকুর থেকে রঙিন মাছ চাষের পরিধি বাড়িয়েছি। ৬২০ টাকার মূলধন আজ প্রায় ২০ লাখ টাকা। এক সময় বাবা-মা মিলে সবাই কুঁড়েঘরে থাকতাম, এখন দোতলা বাড়িতে আছি।
২০১৪ সালে পুকুর লিজ নিয়ে বেশি করে রঙিন মাছ চাষ শুরু। বিশেষ পদ্ধতিতে উৎপাদন করা মিল্কি কই কার্প, কিচিং গোরামি, কই কার্প, কমিটিসহ ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির রঙিন মাছ উৎপাদন হচ্ছে তার হ্যাচারিতে। এই মাছ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়।
এখন তার হ্যাচারির মাছ সাতক্ষীরার চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে।
সাইফুল বলেন, রঙ বদলিয়ে সিল্কি নামের একটি মাছের জাত তৈরি করেছি। অনেকটা জরির মতোই দেখতে। সে জন্যই নাম দিয়েছি সিল্কি। রঙ পরিবর্তন করা এ মাছের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে ১৬টি পুকুর লিজ নিয়ে রঙিন মাছ চাষ করছি। প্রতিটি সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবসাকে ঘিরেই বড় ছেলের নামে ‘রেজা অ্যাকুরিয়াম ফিস’ নামের একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান করেছি। এখন আমার অধীনে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন।
তিনি আরও বলেন, কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ মৎস্য বিভাগ ও সিটি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছি পুরস্কার ও সম্মাননা।
সাইফুলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘২০০৪ সালে স্বামীর সঙ্গে মাছ চাষ শুরু করি। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছ চাষের সম্প্রসারণ করি। এখন উৎপাদন করা মাছ রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে।’
সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকার অ্যাকুয়ামিয়ামের রঙিন মাছ সংগ্রহকারী মোবাশ্বির হোসেন বলেন, ‘দেশে উৎপাদনের সুবাদে অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য রঙিন মাছ আমদানি এখন অনেকটাই কমে এসেছে। এই খাতে দেশ ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণ  হচ্ছে।’
সাতক্ষীরা সুলতানপুর বড় বাজারের নাহার এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী আজমল হক বলেন, সাইফুল ইসলাম মাছ উৎপদন করার পর এখন খুব একটা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না। এছাড়া তার মাছ টেকসই, প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক সময় টিকে থাকে। তার অনেক বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীরা এখন রঙিন মাছের উৎপাদন করে ভাগ্য বদলে নিচ্ছেন।

আরও পড়ুন