রাঙ্গা-মেননদের উইথড্রয়াল সিনড্রোম

আপডেট: 02:59:02 16/11/2019



img

মাসুদ কামাল

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার কিছু বক্তব্য নিয়ে হইচই হচ্ছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদ নূর হোসেনকে তিনি ‘ইয়াবাখোর, ফেন্সিডিলখোর’ বলে মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি নিয়েই সোশ্যাল মিডিয়া বেশ গরম। রাজনৈতিক নেতাদের মুখের মতো সামাজিক এই মিডিয়াতেও যেহেতু সেন্সরশিপ তেমন একটা কার্যকর নয়, তাই অনেকে দেখি রাঙ্গাকে উল্টা ‘ইয়াবাখোর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু করেছেন।
ঘটনাটি গত ১০ নভেম্বরের। তার দলের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে রাঙ্গা যে কেবল শহীদ নূর হোসেনকে নিয়েই মন্তব্য করেছেন তা নয়, একইসঙ্গে তিনি শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এমনকি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েও নেতিবাচক কিছু মন্তব্য করেছেন। ঠিক কী বলেছেন,  তা জানতে ইউটিউবে রাঙ্গার সেই বক্তৃতার বেশ ক’টি ভিডিও পেলাম। সবচেয়ে বড় যেটি, সেটি ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের। খুব মন দিয়ে শুনলাম। ভদ্রলোক সেখানে যে দাবিগুলো করলেন, তার মধ্যে ছয়টি পয়েন্ট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
১) নূর হোসেন ইয়াবা ও ফেনসিডিল সেবন করতেন। তিনি অ্যাডিকটেড ছিলেন।
২) নূর হোসেন পুলিশের গুলিতে মারা যাননি। তার পিঠে গুলি লেগেছে। একটা লাশ পেতে মিছিলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা কেউ এই গুলি করেছে।
৩) এরশাদ স্বৈরাচারী ছিলেন না, স্বৈরাচারী হচ্ছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।
৪) গণতন্ত্রকে হত্যা করে এর কফিনে শেষ পেরেকটি মেরেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু।
৫) এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকারী।
৫) ১৯৮২ সালে যখন এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তখন শেখ হাসিনা অখুশি হননি।
৬) একুশ বছর অপেক্ষার পর, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পেরেছিল এরশাদ সাহেবের অনুগ্রহে।
মসিউর রহমান রাঙ্গা জাতীয় পার্টির মহাসচিব। জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শরিক দল। কেবল এবারই নয়, সেই ২০০৮-এর নির্বাচনের সময় থেকেই তারা একই জোটের অংশী। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে আবার মেরুকরণ থাকে। সেই মেরুকরণের বিবেচনায় জাতীয় পার্টির আওয়ামীঘেঁষা অংশটির শীর্ষে রয়েছেন এই রাঙ্গা। হয়তো সে কারণেই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর জেলা পর্যায় থেকে তুলে এনে রাঙ্গাকে একেবারে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই রাঙ্গা যদি বলেন, শেখ হাসিনা একজন স্বৈরাচারী, গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তখন সেটা আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হওয়ারই কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি সেই আঘাতটি অনুভব করতে পেরেছে?
জাতীয় পার্টিরই কেউ কেউ বলছেন–এটি নিছকই রাঙ্গার নিজস্ব বক্তব্য, তাদের দলের বক্তব্য নয়। কিন্তু বাস্তবে এসব বক্তব্য নিছক অজুহাত হিসাবেও কি উৎরানোর মতো? প্রচলিত রাজনীতি রাঙ্গাকে যে জায়গায় তুলে নিয়ে এসেছে, তাকে তো আর এলেবেলে লোক বলা যাবে না। তিনি জাতীয় পার্টির মহাসচিব। এছাড়া, রাঙ্গা যে সমাবেশে এসব আপত্তিকর কথা বলছিলেন, তখন সেই সমাবেশে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও উপস্থিত ছিলেন। কোনও প্রতিবাদই করেননি তিনি। এর অর্থ কী? আসলে কথাগুলো কেবল রাঙ্গাই বলেননি। এটা পুরো জাতীয় পার্টিরই বক্তব্য। বিষয়টিকে এভাবে দেখলেই বরং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছা যাবে।
রাঙ্গা নিজে অবশ্য দুই দফা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমবার তিনি বললেন, ‘ইয়াবাখোর ও ফেনসিডিলখোর এই শব্দ দু’টি তার বলা ঠিক হয়নি। কারণ তখন ইয়াবা বা ফেনসিডিল পাওয়া যেতো না। ভুলে বলে ফেলেছেন। স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে।’ এই পর্যন্ত বলে থামলে হতো। কিন্তু তিনি এরপর আরও কিছু কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘তবে সে (নুর হোসেন) সুস্থ প্রকৃতির মানুষ ছিল না। সে মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল। কারণ তা না হলে কেউ বুকে পিঠে ওসব লিখে মিছিলে আসতে পারে?’ এসব কথা বলার মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের মানসিক অবস্থার পরিচয়টাই প্রকাশ করেছেন।
সবশেষে গত বুধবার (১৩ নভেম্বর) রাঙ্গা নিজে একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। স্বীকার করলেন,  তার ভুল হয়ে গেছে। নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনাও করলেন। প্রশ্ন হচ্ছে,  যে জাতির পিতার আদর্শেই পরিচালিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি, তার বিষয়ে এমন কঠিন মন্তব্যের তিনদিন পর চাপে পড়ে হালকা একটি ক্ষমা প্রার্থনাই কি সমাধান? জাতির পিতাকে কটূক্তি এর আগেও অনেকে করেছেন। তাদের ক্ষেত্রেও কি এমন সমাধান দেখা গেছে? এই অপরাধে অনেকের বিরুদ্ধে কি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়নি? তাহলে রাঙ্গার ক্ষেত্রে কেন নিয়মের ব্যত্যয় হবে? জোটের শরিক বলে?
এই যে জোটের শরিক, ইদানিং তাদের কর্মকাণ্ড দেখে বিভ্রান্তই হতে হয়। তারা যেন জোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগকে বিব্রত করা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকছে। স্মরণ করা যেতে পারে আর এক শরিক দলের প্রধান রাশেদ খান মেননের কথা। কদিন আগে তিনি বরিশালের এক সমাবেশে প্রকাশ্যে ‘সাক্ষ্য’ দিয়ে বললেন এবারের সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইত্যাদি। তার এসব কথার মধ্যে সত্য-মিথ্যা কতটুকু কী আছে, তা ভিন্ন বিতর্ক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—তার এই ‘সাক্ষ্য’ জোট প্রধান শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে কতটুকু প্রীত অথবা বিব্রত করেছে।
বিগত নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি–এই অভিযোগ বিএনপি এবং তার সমমনা দলগুলো নিয়তই করছে। মানুষ সেসব শুনে শুনে অভ্যস্ত। কিন্তু সেই একই অভিযোগ যদি জোটের শরিক মেননের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়, তখন তার অর্থটি কী দাঁড়ায়? এটা কি নির্বাচন বিষয়ে সরকারের বক্তব্যের নৈতিক ভিত্তিকে দৃঢ় করে? সরকারকে বিব্রত করতে এরচেয়ে বড় কোনও মন্তব্য কি আর থাকতে পারে?
সমালোচনায় পড়ে  রাশেদ খান মেনন  অবশ্য তার বক্তব্য ও আচরণের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, বরিশালের ওই সভায় তিনি যা কিছু বলেছেন, তা নাকি মিডিয়াতে ঠিকভাবে আসেনি। খণ্ডিতভাবে এসেছে বলে তা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আমি তার ওই বক্তৃতার ভিডিওগুলো বারবার দেখেছি, তার কথা শুনেছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি—এর আগে অথবা পরে কী এমন কথা তিনি বলেছিলেন, যা থেকে তার ‘সাক্ষ্য’ দেওয়া বাক্যগুলোর ভিন্ন অর্থ হতে পারে। আসলে এইসব নেতা বোধকরি জনগণকে নিতান্তই বোকা  মনে করেন। নইলে এমন অজুহাত দেন কী করে? তবে মেননের  চেয়ে বেশি হতাশ আমি হয়েছি ১৪দলের আচরণে। ১৪দলকে মেনন তার কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা হিসেবে একটা চিঠি দিয়েছেন। তাতে এমন কিছুই লেখা নেই, যা পড়ে মনে হতে পারে যে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে তার যে বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে–তা খণ্ডিত ছিল। তাহলে, এরকম সব খোঁড়া অজুহাতকে ১৪ দল গ্রহণ করলো কোন বিবেচনায়? নাকি তারাও জনগণের জ্ঞান-বুদ্ধিকে থোড়াই কেয়ার করে?
এখন আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে। রাঙ্গা সমালোচনা করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডের। বলেছেন,  বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরেছেন, আর শেখ হাসিনা একজন স্বৈরাচারী। মেনন বলছেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারেনি। ভোট দিতে না পারলে নির্বাচনের কি আর বৈধতা থাকে? অর্থাৎ মেনন এই সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। আমার কথা হলো—শরিক দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতা হঠাৎ করেই এমন কথাবার্তা কেন বলছেন? তাদের নিশ্চয়ই মতিভ্রম হয়নি। আর ঠিক এখানেই আসছে উইথড্রয়াল সিনড্রোমের বিষয়টি। মাদকাসক্তি থেকে নিরাময়ের ক্ষেত্রে যখন মাদক বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন এই সিনড্রোমটি দেখা যায়। সরকারের বিগত মেয়াদে এই দুই ভদ্রলোক মন্ত্রিসভায় ছিলেন। মন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার যে মাদকতা তারা ভোগ করেছেন, তা আর অব্যাহত না থাকার কারণেই কি তাহলে তাদের এই এলোমেলো আচরণ? উইথড্রয়াল সিনড্রোম মোকাবিলায় বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। একটি পদ্ধতি হচ্ছে,  দুই-একবারের জন্য সামান্য করে মাদক সরবরাহ এবং পাগলামিকে সাময়িক সময়ের জন্য থামানো। আর একটি পদ্ধতি হচ্ছে—এমন কঠিন আচরণ করা, যেন আর মাদকের নামই উচ্চারণে ভয় পায়। তাদের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়,  সেটাই এখন দেখার বিষয়।
[বাংলা ট্রিবিউন থেকে]