রোগীর চাপে বেহাল যশোর জেনারেল হাসপাতাল

আপডেট: 09:52:12 08/02/2020



img

শহিদুল ইসলাম দইচ : যশোর জেনারেল হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজনরা পদে পদে হয়রানি ও ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের আউটডোর টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ অথবা ক্যাশ কাউন্টার থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রুম- সব জায়গা মানুষে ঠাসা।
বিপুল সংখ্যক মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে হিমসিম অবস্থা প্রতিষ্ঠানটির। রোগীদের অনেকের অভিযোগ, তারা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন না। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, সেবার মান বেড়েছে বলেই এতো রোগীর চাপ।
মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা গ্রামের আব্দুল গফুর, সদরের চুড়ামনকাটি বাগডাঙ্গার জামিলা বেগম, বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মনিরুল ইসলাম, যশোর শহরের পূর্ববারান্দিপাড়ার আমেনা বেগম, বেজপাড়ার রুনা আক্তার, শংকরপুরের রুবেল হোসেনরা অভিযোগ করে বলেন, তারা যশোর জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসে টিকিট নিতে এক ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু এরই মধ্যে বিভিন্ন লোক নানা কায়দায় কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে চলেও যাচ্ছে। ফলে লাইন আর শেষ হচ্ছে না। তিনটি টিকিট কাউন্টারেরই একই অবস্থা বলে তাদের অভিযোগ।
শার্শা উপজেলার টেংরাখালি গ্রামের মমিন বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে এসেছি। ডাক্তার সাহেব আমাকে দেখলেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দিলেন। রিপোর্ট এনে দেখি ডাক্তার সাহেব নেই। বলেন তো কোন ভোগান্তিতে পড়লাম!’
বাঘারপাড়া উপজেলার ভিটেবল্লা গ্রামের আক্তার হোসেন ও সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুরের জাকির হোসেনের অভিযোগ, ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বলেছেন। কিন্তু ডাক্তার দেখাতে, ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা দিতে- সবখানে লম্বা লাইন। রক্ত দিতে ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। রিপোর্ট কখন পাবেন, তারা তাও জানেন না। যদি রিপোর্ট একদিন পর নিতে হয়, তাহলে আরেক ভোগান্তি।
জানতে চাইলে সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার মো. আহাদ আলী মহলদার বলেন, ‘সকাল থেকে বহু রোগী দেখতে হয়। যে সব রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলা হয়েছে, তারা রিপোর্ট আনলে সবাইকে দেখবো। রিপোর্ট হাতে না পেলে তো কিছুই করার থাকে না। তবে তারা পরের দিন অন্য কোনো ডাক্তারকে দেখাতে পারবেন।’
মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের শারমিন সুলতানা ও কেশবপুর বাজার এলাকার শাহাদত হোসেন- দুইজনই অর্থোপেডিক বিভাগের ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। এক্স-রে করানোর জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন; কখন ডাক পড়বে তা জানেন না এই দুই রোগী।
এই প্রসঙ্গে অর্থোপেডিক বিভাগের ডাক্তার মোহাম্মদ আলী বলেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন কম করে হলেও দুই হাজার রোগী আসেন সেবা নিতে। হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ ইচ্ছা করলেও দিনের দিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দিতে পারে না।’
হাসপাতালটিতে জনবল বাড়ানোর দরকার বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।
শহরের মোল্লাপাড়ার কবির, শেখহাটির শিরিন সুলতানা, খড়কি এলাকার মাহতাব হোসেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডাক্তারদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ, জরুরি রোগী না দেখে কর্তব্যরত ডাক্তার প্রায়ই ভেতরের কক্ষে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে খোশ-গল্প করেন। আবার জরুরি বিভাগে প্রাথমিকভাবে দেখে রোগীকে পাঠিয়ে দেন ওয়ার্ডে ডাক্তার। সেখানে ইন্টার্ন ডাক্তার রোগী দেখেন। তাদের চিকিৎসায় ভরসা নেই অনেক রোগীর।
তবে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত ডাক্তার আহম্মেদ তারেক শামস ও ডাক্তার এম আব্দুর রশিদ সুবর্ণভূমিকে বলেন, তারা হাসপাতালে একটানা আট ঘণ্টারও বেশি সময় রোগী দেখেন। রোগীর সংখ্যা কখনো কখনো দুইশ’ থেকে তিনশ’। ফলে মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণে রোগীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যায় না।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলীপকুমার রায় বলেন, সব সময় ইন্টার্ন ডাক্তার থাকেন- তার অর্থ এই নয় যে, ইন্টার্ন ডাক্তার দিয়ে হাসপাতাল চলে। সব সময় বিশেষজ্ঞ একজন ডাক্তার থাকেন। রোগীর অবস্থা বিবেচনার পর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে কল দেওয়া হয়। এ ছাড়া দিনে ও রাতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার তো দুইবার করে রাউন্ড দেন।
মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার গৌতম ঘোষ বলেন, ‘আমরা চাই রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে তা হচ্ছে না। এখানে রোগী অনেক বেশি; তুলনায় ডাক্তার কম।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার দিলীপকুমার রায় সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘আমি মিটিং করে সব বিভাগের প্রধান ডাক্তারদের বলে দিয়েছি দুপুর দুইটা পর্যন্ত রোগী দেখতে। ডাক্তাররা তাই করছেন। বৃহত্তর যশোরের সব জায়গা থেকে রোগীরা সেবা নিতে আসে এই জেনারেল হাসপাতালে।’
তিনি দাবি করেন, এই হাসপাতালে সেবার মান বেড়েছে। সেই কারণে রোগীর চাপও বেশি।

আরও পড়ুন