ল্যাব-বিতর্ক : কী ভাবছেন যশোরের রাজনীতিকরা?

আপডেট: 11:49:02 13/05/2020



img

কবীর সাঁই : সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা পরীক্ষায় পাশাপাশি দুই জেলা যশোর ও খুলনার ল্যাবের ফলাফলের আকাশ-পাতাল ব্যবধান নিয়ে সমাজে জোর আলোচনা জারি রয়েছে। এখনো পর্যন্ত খুলনা মেডিকেল কলেজ ল্যাবে পরীক্ষিত নমুনার এক শতাংশেরও কম পজেটিভ রেজাল্ট দিয়েছে। আর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ১৫ শতাংশ পজেটিভ হয়েছে
এনিয়ে সুবর্ণভূমিতে বেশ কয়েকটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে; যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারীদের বক্তব্য সংযোজন করা হয়। যশোরে স্বাস্থ্য বিভাগের অন্তত এক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং একই বিভাগসংশ্লিষ্ট এক পেশাজীবী নেতা যবিপ্রবি ল্যাবে বেশি বেশি পজেটিভ আসছে বলে অসন্তোষ প্রকাশ করে সেখান পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছেন যশোরের রাজনীতিকরা?
জেলার শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিকের বক্তব্য নিয়ে সুবর্ণভূমি জানতে পেরেছে, তারা কেউই যশোর বা খুলনা- কোনো ল্যাব বন্ধ করার পক্ষে নন। বরং ল্যাব দুটির কোনোটিতে যদি কোনো টেকনিক্যাল ফল্ট থাকে অথবা যদি প্রায়োগিক সমস্যা থাকে, তা যাচাই করে সমাধান বের করার পক্ষে তারা। একই সঙ্গে যাতে আরো বেশি বেশি নমুনা পরীক্ষা করা যায়, তার জন্য দেশজুড়ে আরো ল্যাব স্থাপনেরও দাবি তাদের।
যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘বেশি বেশি পজেটিভ রেজাল্ট আসছে বলেই কি যবিপ্রবি ল্যাবে পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে? সরকারের পলিসি হলো আরো বেশি বেশি নমুনা পরীক্ষা করা। ল্যাব বন্ধ করা নয়।’
‘আমার বক্তব্য হলো, যবিপ্রবি ল্যাবে অথবা পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ফল্ট থাকে, তাহলে তা যাচাই করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য সচিবকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আমার মনে হয়, উনি এক্সপার্ট টিম যশোরে পাঠাবেন। যদিও করোনা পরিস্থিতিতে এক্সপার্ট সংকট রয়েছে বলে সচিব জানিয়েছেন।’
আওয়ামী লীগের এই নেতার সঙ্গে মতের সামান্য ভিন্নতা রয়েছে একই দলের যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের। যদিও তিনি ল্যাব বন্ধ হোক, তা চান না।
শাহীন চাকলাদার বলেন, ‘এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের কোথাও নমুনা পরীক্ষার কাজে লাগানো হয়নি। যেহেতু যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আধুনিক ল্যাব রয়েছে, সেই কারণে আমি জোর করে এখানে নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করিয়েছি।’
‘তবে এই ল্যাবে অনেক বেশি পজেটিভ রেজাল্ট আসছে বলে আমার মনে হয়। এতে সমাজে প্যানিক সৃষ্টি হচ্ছে। যদি কোনো টেকনিক্যাল ফল্ট থাকে, তা সমাধান করতে ঢাকা থেকে স্পেশালিস্ট পাঠানো উচিত। এরপরও যদি বিতর্কের অবসান না হয়, তাহলে এই ল্যাবে পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’
এক প্রশ্নের জবাবে সরকারি দলের এই জেলা সেক্রেটারি বলেন, 'প্রফেসর হলেই যে নমুনা পরীক্ষার কাজ ভালো করতে পারবেন, তা নাও হতে পারে। অনেক সময় টেকনিশিয়ানরাও ভালো করতে পারেন।’
যশোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘আমি তো এক্সপার্ট নই, তবে প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে বিভ্রান্তি যে আছে, তা বুঝতে পারছি। জনগণকে রিয়েল পিকচার জানাতে হবে। তথ্য বিভ্রাট হলে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। যবিপ্রবির ল্যাবটিও চালু রাখতে হবে এই অঞ্চলের মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে।’
‘সরকার তথ্য গোপনের চেষ্টা করছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। কিন্তু তথ্য গোপন করার চেষ্টা কোনো সমাধান দেয় না। সঠিক পরিস্থিতি অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে, তা সে যাই হোক না কেন,’ বলছিলেন অ্যাডভোকেট সাবু।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি রবিউল আলম বলেন, ‘কোনো ল্যাবে পরীক্ষা বন্ধ করার প্রশ্নই উঠতে পারে না। যদি কোনো ল্যাবে টেকনিক্যাল দুর্বলতা থাকে, তো তা দূর করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আইইডিসিআর-এর। এটি জনগণের জীবন-মরণের প্রশ্ন। হেলাফেলা করার বিষয় না।’
তিনি বলেন, ‘যশোর ল্যাবের ফলাফল যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখতে পাবো, দেশের সামগ্রিক ফলাফলের সঙ্গে মিল আছে। কিন্তু খুলনা ল্যাবের ফলাফল পুরোই উল্টো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত, খুলনার ল্যাবে কেন অস্বাভাবিক ফলাফল আসছে, তা যাচাই করা।’
জাসদ নেতা রবিউল আরো বলেন, ‘আমাদের ভাইরোলজি বিভাগ যে কত দুর্বল তা এই করোনা পরিস্থিতিতে বোঝা গেল। সরকারের উচিত এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া। কোনো ল্যাব বন্ধ তো করা যাবেই না, উপরন্তু ল্যাবের সংখ্যা বাড়িয়ে নমুনা পরীক্ষার কাজ বাড়াতে হবে।’
ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘জাতীয়ভিত্তিক ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, যশোর ল্যাবের ফলাফল ঠিকই আছে। এই ফলাফল সোসাইটিতে কোনো নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলছে বলে আমি মনে করি না। বরং খুলনার ল্যাবে কোনো সমস্যা আছে কিনা তা যাচাই করে সমাধান করা উচিত। গণমাধ্যমে দেখেছি, সেখানে আউটসোর্স করা টেকনিশিয়ান দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।’
টেকনিশিয়ান দিয়ে সন্দেহভাজন করোনা রোগীর নমুনা পরীক্ষা করানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বামপন্থী এই নেতা বলেন, ‘আমার জানা মতে, যবিপ্রবি ল্যাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতরা কাজ করছেন। সেকারণে এখানকার ফলাফল গ্রহণযোগ্য।’
কথা প্রসঙ্গে জাহিদ জানান, বুধবার তারা বিতর্কের বিষয়টি নিয়ে যশোরের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
এর আগে ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) প্রেসক্লাব যশোরের সামনে যে মানববন্ধন করে, সেখানে অন্যতম দাবি ছিল, যবিপ্রবি ল্যাবে সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা পরীক্ষার কার্যক্রম বহাল রাখা

আরও পড়ুন