শিক্ষা দিবসের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা

আপডেট: 02:32:58 17/09/2020



img

শ্যামল শর্মা

যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণ কল্পনামাত্র। একটি জতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিলেই হয়। পুর্বে দেখা গেছে, অনেক বড় বড় যুদ্ধে বিজয়ী শক্তি পরাজিত জাতির লাইব্রেরি ধ্বংস করে দিয়েছে, যাতে সেই জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম না জানতে পারে।
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হবার পর পাকিস্তান দুই অংশে বিভক্ত হলো- পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তান। এতে পূর্ব পাকিস্তানি মানুষের ভাগ্যাকাশে বজ্রপাত ঘটলো। নেমে এলো ঘোর অমানিশা। শুরু হলো ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও বঞ্চনা। অতঃপর ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে বিজয়ের মাধ্যমে বাঙালির মনে প্রথম স্বাধিনতার বীজ বপন হয়। তারপর থেকেই বাঙালির মনে একটু একটু করে স্বাধীন হবার বারুদ জন্ম নিতে থাকে। ঠিক এমন সময় ১৯৬২ সালে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার তার শিক্ষা সচিব এস এম শরিফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে প্রণয়ন করলেন চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি, যা ‘শরিফ কমিশন’ নামে পরিচিত। যার মাধ্যমে আইয়ুব শাহী মনের অজান্তে সেই বারুদে দেশলাইয়ের কাঠি দিয়েছিল।
‘সস্তায় শিক্ষা লাভ করা যায় না। যেমন দাম তেমন জিনিস, অবৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা কল্পনামাত্র। প্রাথমিক স্কুলই হবে আমাদের বেশির ভাগ ছেলে-মেয়ের শিক্ষাজীবনের শেষ স্তর। শিক্ষাব্যবস্থা হবে সাম্প্রদায়িক, পরিচালিত হবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, যাদের টাকা আছে তারাই পড়তে পারবে। উচ্চ শিক্ষার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে না। যারা নিশ্চিতভাবে ঝরে পড়বে তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষা উপকরণ নিজেদের কিনতে হবে এমনকি বিদ্যালয়টাও নিজেদের তৈরি করে নিতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করার মানসিকতা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সর্বোৎকৃষ্ট শ্রেণির আলেম তৈরির জন্য কাজ করতে হবে।’
এটাই ছিল শরিফ কমিশনের মূল মন্ত্র। মূলত এতে স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর ধর্মান্ধতা, পুঁজিবাদী, রক্ষণশীল, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও শিক্ষাসংকোচন নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল।

শিক্ষা দিবসের পটভূমি
সময়টা ছিল ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ‘টাকা যার শিক্ষা তার’- এই মূল মন্ত্রকে ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবসহ একটি সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি এদেশের শিক্ষার্থীদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইলেন তৎকালীন আইয়ুব শাহী সরকার। এই চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত ছাত্রসমাজ সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখ হরতাল আহ্বান করে এবং তার সাথে একাত্ম্যতা প্রকাশ করে পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। অবশ্য ততক্ষণে বাঙালি আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, এটা শুধু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সম্পর্কিত আন্দোলন নয়, স্বাধিকার আদায়ের অন্দোলনের একটা মাহেন্দ্রক্ষণ।
১৭ সেপ্টেম্বর সকাল নয়টায় বের হয় ছাত্র-জনতার বিরাট মিছিল। মিছিলটি যখন ঢাকার হাইকোর্ট পার হয়ে আব্দুল গনি রোডে প্রবেশ করে তখনই পুলিশ অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহসহ নাম নাজানা আরো অনেকে। সংকোচনমূলক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে না পেরে পিচঢালা রাজপথকে নরকপুরিতে পরিণত করে পিছু হটলেন স্বৈরাচার আইয়ুব শাহী। পরবর্তীতে একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। আর ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত দিনটি প্রতিষ্ঠা পায় ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসাবে।

বর্তমান বাস্তবতা
দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে আমরা পেয়েছি একটা মানচিত্র, স্বাধীন ভূখণ্ড, একটা লাল-সবুজ পতাকা, পেয়েছি একটা শিক্ষা দিবস। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই দিবসটা এখন বাম প্রগতিশীলরা ছাড়া কেউ মনে রাখে না। এমনকি এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে যে দিনটির গুরুত্বপর্ণূ ভূমিকা ছিল সেই দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করাও হয় না। শিক্ষা ও ছাত্রআন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ এই ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বঞ্চিত ইতিহাসের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের তাৎপর্য অনুধাবন থেকে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দিবসের ৫৮ বছর পার হলেও ছাত্রসমাজের সর্বজনীন শিক্ষার যে আকাঙ্ক্ষা তা আজো পূর্ণ হয়নি। কিছুটা সংশোধন হলেও সেই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি আমলে কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহাল আছে। শিক্ষা এখনো বাজারে ওঠে, তবে পার্থক্য একটাই- আগে বিক্রি হতো খোলাবাজারে আর এখন বিক্রি হয় শো-রুমে। সন্ধ্যাকালীন কোর্সের নামে করা হচ্ছে রমরমা ব্যবসা। তর তর করে বাড়ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, যেখানে পড়তে প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। এদিকে সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা আর জিপিএ-৫ পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তো চলছেই। পরিবেশের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে হোম টিউটরের সিরিয়াল লাগিয়ে তার সাথে যুক্ত হয়েছেন আমাদের বিজ্ঞ অভিবাবকগণ। এতে করে শিক্ষার্থীরা তো পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ছেই বরং হারিয়ে ফেলছে তাদের নিজস্ব সৃজনশীল শক্তি। আর এর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা গরিব মানুষের সন্তানের লেখাপড়া।
অবশেষে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে গিয়ে আমরা পেয়েছি জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০; যেখানে চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষার কৌশলে রয়েছে শুভঙ্কের ফাঁকি। শিক্ষা দিবসের চেতনায় উঠে আসা সর্বজনীন, বৈষম্যহীন, একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে করা হয়েছে শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যকরণ। এ যেন নতুন বোতলে সেই পুরনো মদ। যার প্রভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা সর্বস্তরেই চরম নৈরাজ্য চোখে পড়ছে। দেশে এখনো প্রাথমিক স্কুলের ঘাটতি রয়েছে, রয়েছে শিক্ষক ঘাটতি। এখনো জাতীয়করণের দাবিতে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক/ কর্মচারীদের আমৃত্যু অনশনে যেতে হয়; যা শিক্ষা দিবসের চেতনার পরিপন্থী। আমাদের স্মরণে রাখা উচিৎ সেদিন বাবুল, মোস্তফাদের রক্ত রাজপথে শুকিয়ে যায়নি, সঞ্চারিত হয়েছিল জাতির ধমনিতে, মস্কিষ্কের শিরা উপশিরায়। আর ওই রক্তস্রোত গিয়ে মিশেছিল আর এক রক্তগঙ্গায়, অবশেষে মেশে স্বাধীনতার মোহনায়। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সর্বজনীন মতামতের ভিত্তিতে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা, যাতে শিক্ষা হবে সবার জন্য অবাধ। ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা হলো অধিকার’- সর্বমহলে এটাই বোধগম্য হবে- শিক্ষা দিবসে এটাই প্রত্যাশা।

৫৯তম শিক্ষা দিবসে প্রত্যাশা
তাৎপর্যপূর্ণ মহান শিক্ষা দিবসের ইতিহাস মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা; প্রতিবছর রাষ্ট্রয়ীভাবে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা; করোনাকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শতভাগ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা ও প্রযুক্তি সহায়তার জন্য সরকারি প্রণোদনা দেওয়া; সংকটকালে শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়া মওকুফের জন্য যথাযথ উদ্যেগ গ্রহণ করা; করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেতন ও সেমিস্টার ফি মওকুফ করবে; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ড্রপআউট-রোধে যথাযথ উদ্যেগ গ্রহণ করা; পিছিয়ে পড়া ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হাওর, বাঁওড় ও দুর্গম অঞ্চলকে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের আওতায় আনা; স্বাস্থ্যখাতসহ সকল স্তরে চলমান দুর্নীতি বন্ধ করে বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া; বাস্তবতা বিবেচনা করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পুনঃনির্ধারণ করা; রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে সেগুলো সচল করে সরাসরি পাটচাষিদের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা; সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিল করে দ্বিতীয় শিফট চালু এবং সমন্বিত বা গুচ্ছ প্রদ্ধতিতে ভর্তি পরিক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী
যশোর জেলা শাখা

আরও পড়ুন