শিরিন সুলতানার পাঁচটি কবিতা

আপডেট: 02:39:51 13/06/2020



img

প্রিয় শাপলা এক্সপ্রেস

এমন উসকানিমূলক বৃষ্টিতে
ভেতরে সাদা লালপাড়
শাড়ি, হাতে লাল চুড়ি,
লালটুকুস্বপ্ন আর চুলে
জুঁইফুলের গন্ধ নিয়ে
ভেজার জন্য হলেও
কেউ থাকা দরকার
অথচ কখনও কোথাও
কেউ ছিলো না

এখন বদলে যায় সময়ের
ভালো লাগার ধরন
ইশারা ছড়িয়ে ফুটে ওঠে
আঁশচুবড়ির গন্ধ।
একটা বৃষ্টিঝরা দুপুর
চুপচাপ বসে থাকে
ভেজা শালিকের অপেক্ষায়।
 
বদলে যায় কদমফুলের হৈচৈ
বাঁধানো বাসর যাপনের স্বপ্ন।
উৎরানো অনুরাগে
কাটে ছন্নছাড়া রাত
দ্বিঘাত অন্ধকারে বুকের ফালিতে
জমে দীর্ঘ হুইসেল।

তবুও টুকিটাকি জীবনের মুগ্ধতায়
পালবাড়ির মোড়ে
র্নিজলা অভিমানে দাঁড়িয়ে থাকে
‘প্রিয় শাপলা এক্সপ্রেস’



কাসুন্দী ফুল

হৃদয়ের খুব কাছে জমা রাখি গ্রাম্যমুখি ফুল
ঝিমধরা রাতে মৌলিকজ্বরে
জাবরকাটে বুনোশালিক
কলিজাভরে উঠে আসে কাগুজে লেবুর গন্ধ
খুদের জাউভাতের ওম-
তপ্তউঠানের বীজধানে তৈরি হয় আগামীর অঙ্কুর
বিকেলের হাতধরে ফিরে আসে যুবতীসময়
চন্দ্রফুলের মতো এইসব দৃশ্যের পর দৃশ্য
একদম খড়খড়ে মেজাজে ভেসে যায়

আকলিমার থলথলে বুকে সৈয়দ আলীর জবজবে ভালোবাসার
হলুদ হলুদ স্বপ্ন বোধের ফাঁদে আটকে পড়ে
কেটে যায় অবাকমাখা খতিয়ান
কমিউনিস্ট প্লাবনের এই যুগে এখন আর কেউ কুড়ায় না
এই সব কাসুন্দী ফুল

কৌণিকদূরত্বে মাপে ধনীগরিবের জ্যামিতিক ধারাপাত
আকলিমার মোমবাতিজীবনের ঢেঁকিছাঁটা
চাল খেয়ে বেঁচে থাকে নগ্নসভ্যতার বালিহাঁস
যৌবনের মুখে লাথি মেরে সৈয়দরা হৃদয়ের
কলকান্দায় পোষে বেদনার শোল

তবু!
তর্ক বাড়ে
রাজায় রাজায় যুদ্ধ বাড়ে
মিয়্রমান বসন্তে আকলিমা গেয়ে যায়
"আপনি আমায় করবেন গুরু,
...করবেন চরণদাসী"



শুদ্ধতার গান

যে জীবন অন্যরকম হতে পারতো
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সুরের মতন
ঠোঁটের ভূগোলে জমিয়ে জমিয়ে সুষম নৈবেদ্য
তার বদলে প্রতিদিন শুনে যাই শব্দ পানের মতো মৃত্যুর আয়ুরেখা।
করুণদৃষ্টির ইশতেহারে ভরে যায়
মন খারাপের গোলাঘর।
যে জীবন অন্যরকম হতে পারতো
অশুদ্ধতা ধুয়ে ধুয়ে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চুম্বনে
ভরে দিতে পারতো
ভালোবাসার শেওলায় জড়ানো বিশ্বস্ত সহচর।
তার বদলে নিঃসঙ্গতার হাত ধরে এলো
নিশিকাব্যের অলিখিত কাঁশবন।
যে জীবন অন্যরকম হতে পারতো
তা হয়ে গেলো মৃত্যু আর কবিতার।
তবু প্রকৃতির ব্লাউজের বোতাম খুলে সতেজ
বাতাসে আশায় মোড়ানো আলো জেগে উঠলে
জেগে ওঠে বদমাশ শিহরণ শুদ্ধতার গান গাইতে গাইতে।



বোধ-১

আমাদের নীল আকাশ
জাবরকাটা মেঘের পালকিতে ছেঁয়ে গেলে
কষ্টের উঠোনে হাফায় ধাবন্ত খরগোশ
অষ্টাদশীর মাদকতায় ডুবে তুমিও হয়ে গেলে কাগজের পাখি।
থৈ থৈ সুখের শৌখিন বাসনায় আটকে গেছে
স্মৃতিপাতা পৃথিবীর পুরোনো পথের ভাঁজে।

বেঁচে থাকার বুকভাঙ্গা আবিষ্কার
হয়ে উঠলো অনুপম ঢেউ।
ঝিনুকের বুকে কান্না লুকিয়ে আমরা
পরস্পর দাঁড়িয়ে থাকি কবিতার অধ্যক্ষ হয়ে।
শুদ্ধশোকে শোনা হয় না দোলনার গান।।

বিশ্বাস করো
ভুল মানুষের কাছে বিনয়ী হবার স্বাধ নেই আর
আমি তো সেই অবহেলা
ঘোলাটে চাঁদ।

যার একরাশ আকুতিতে
শান্তপালে হাওয়া লেগেছে খুব তালপাতার সড়সড়ে শব্দের মতোন
বেদনার মন্থনে সেজেছে বাসন্তী উৎসব
আলভাঙ্গা বিষণ্নতায় ফুটলো ইচ্ছের আলো

একে তুমি প্রেম বলো না
একে ভালোবাসা বলো
পান্নার মতো সবুজ।।



ভবিষ্যৎ বলে কিছু ছিলো না

ষড়যন্ত্রকারী বাতাসে বিশুদ্ধ শ্বাস নিতে ভয় হয়
কেননা আমাদের অতীত ছিলো
ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই

জীবনের বাসন্তী উৎসবেও আশ্বিনের জোছনা
গর্ভবতী হয়ে ওঠে চাঁদের সীমাহীন যন্ত্রণায়।
সূর্য ঘুমিয়ে গেলে ধুলোবালির অভিযোগে ভরে যায়
পরমপিতার সাদা পানজাবি।

আদিবাসী কান্নার মতো ডুকরে ওঠে প্রজন্মের বীজ
আমাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই
অলৌকিক অভিমানের কালচে অজুহাতে
হারিয়ে যাচ্ছে পুতুলের শহর।
অভাবের শরীর চিরে চিরে রক্ত
শুষে খাচ্ছে খোড়া শকুনের দল।

করুণার বড়শীতে ওঠে নিদারুণ সুখ
রোদের পাশঘেঁষে আকাশ সাঁতরে আসে
অন্তদহনের রক্তমাখা বোবা মিছিল।
ইকরি বিকরি মন-এ উচ্চারণ করতে করতে
ভেসে যাচ্ছে সংসার সেলুলয়েড
ভেসে গেলো ছায়ানদীর নির্মল শয্যা।
আমাদের ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু থাকলো না।