শীতে শিশুকে সুস্থ রাখার উপায়

আপডেট: 07:49:04 22/12/2019



img

মুন্নী আক্তার : সারা দেশেই হঠাৎ করে জেঁকে বসেছে শীত। শুষ্ক ও দমকা বাতাসে এর প্রকোপ আরো বাড়ছে।
শীতের এই সময়ে প্রায় সব বয়সের মানুষেরাই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক হিসাব বলছে, শীতের কারণে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে চার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
শীতের প্রভাবে বাদ পড়েনি শিশুরাও। এসময় নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা ফারুক তন্দ্রা বলেন, শীতের সময় দেখা যায় যে, শিশুরা পোশাক ঠিকমতো পরতে চায় না, কানটা হয়তো বাইরে থাকে, ঠান্ডা পানি পান করে। ফলে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, শিশুরা এ সময় ঠান্ডা পানি ও ঠান্ডা বাতাসের সাথে খাপ-খাওয়াতে পারে না। তখন বাচ্চাদের টনসিল ফুলে যায়।
শীতের সময় বাতাসে অনেক জীবাণু বেশি থাকে। বিশেষ করে ভাইরাস বেশি থাকে, যা শ্বাসনালীর মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও মামসের মতো রোগের সৃষ্টি করে।
"অনেক সময় দেখা যায় যে, বাড়ির বড় কারো ঠান্ডা লাগলে তারা শিশুদের সামনে হাঁচি বা কাশি দেয়। একটা বড় মানুষের হাঁচিতে লক্ষ লক্ষ জীবাণু থাকে। যা বাচ্চাদের শ্বাসের মাধ্যমে ঢুকে তাদেরকে আক্রান্ত করে ফেলে," তিনি বলেন।
বাইরের খাবার এ সময় একদমই খাওয়া উচিত নয়। যেমন ফুচকা, চটপটি, বাইরের পানি, চা-এগুলোতে এই সময়ে প্রচুর পরিমাণে জীবাণু থাকে যা শীতের সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া দেখা দেয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হেলেনা বেগম বলেন, "শীতের সময় এই রোগগুলো বেশি হয়। কারণ কিছু কিছু ভাইরাস থাকে যা শুধু শীতের সময়েই মাল্টিপ্লাই হয় বা আক্রমণ করে। এছাড়া বাতাসও অনেক বেশি শুষ্ক থাকে। ফলে ইনহেলেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রে চলে যায়"।
অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে বাতাসে ধুলার পরিমাণও বেশি থাকে। এ সময় বৃষ্টি কম হয় বলে বাতাসের ধুলা এবং অন্যান্য উপাদান ঝরে পড়ে না। ফলে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

কী কী রোগ হয়
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা ফারুক তন্দ্রা এবং অধ্যাপক ডা. হেলেনা বেগম বলেন, শীতের মৌসুমে শিশুদের সাধারণত সর্দি, ঠান্ডা, কানের সমস্যা, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি-কাশি এবং ভাইরাসজনিত রোগ বেশি হয়।
নবজাতকদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া এবং জ্বরও দেখা দিতে পারে। শীতকালে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ভাইরাল ডায়রিয়া হয়, যাকে রোটা ডায়রিয়া বলে।
এছাড়া যেসব রোগ দেখা যায় সেগুলো হলো-
•নিউমোনিয়া,
•ডায়রিয়া,
•গ্যাসট্রোএনটারাইটিস বা খাবারে বিষক্রিয়া,
•অ্যাজমা, আগে থেকে থাকলে এসময় সেটা আবার অ্যাটাক হয়,
•টনসিলাইটিস,
•প্যারোটাইটিস বা মামস,
•ইনফ্লুয়েঞ্জা
•যেসব শিশুর অ্যালার্জি থাকে তাদের শ্বাসকষ্ট হয়

প্রতিকার কী
এই সময়ে শিশুদেরকে রোগ থেকে দূরে রাখতে হলে সচেতনতা বেশি দরকার বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
তারা বলছেন, বাবা-মা বা স্বজনদের খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশু কোনোভাবেই ঠান্ডা লাগিয়ে না ফেলে।
এ বিষয়ে তারা কিছু সতকর্তা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলো হলো-
•প্রথম যেটি করতে হবে তা হলো, শিশুদের গরম রাখতে হবে। ঘরের পরিবেশ গরম রাখতে হবে।
•শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শিশুদের ঠান্ডা লেগে গেলে অনেক সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এসময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন নাক বন্ধ হয়ে না থাকে। নাক-মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে।
•একটা বাচ্চা অসুস্থ হলে তাকে অন্য বাচ্চাদের থেকে একটু সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
•এছাড়া পরিবারের অন্যদের রোগ হলে শিশুদের সামনে আসার সময় অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে।
•বাচ্চাদের উষ্ণ পানি খাওয়াতে হবে
•প্রতিদিন গোসল না করিয়ে দু-তিন দিন পর পর গোসল করাতে হবে এবং উষ্ণ পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে
•বাচ্চারা বাইরে বের হলে পুরো শরীরের সঙ্গে কানও ঢাকতে হবে, টুপি, হাত ও পা মোজা পরাতে হবে যাতে বাতাস না লাগে
•বাইরের খাবার খাওয়ানো যাবে না
•বাচ্চাদের সামনে এ সময় ধূমপান করাটা উচিত নয়। এতে অ্যাজমার সমস্যা বেড়ে যাওয়া আশঙ্কা থাকে।
•ঠান্ডা জাতীয় খাবার যেমন আইসক্রিম, কোমল পানীয় এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে
•অ্যালার্জি যাদের নেই, তাদের বয়স ৬ মাসের উপরে হলে, প্রতিষেধক দিতে হবে।

কখন চিকিৎসকের কাছে নেবেন
চিকিৎসকরা বলছেন, কিছু কিছু সময়ে দেখা যায় যে, সর্দি বা ঠান্ডা লাগলে তা বাসাতেই কিছু ব্যবস্থা নিলে সেরে যায়। আবার অনেক সময় এগুলো সহজে ভালো হতে চায় না।
তারা বলছেন, শিশুদের মধ্যে নির্দিষ্ট ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে তাদেরকে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সেগুলো হলো-
•শিশু যদি খাওয়া কমিয়ে দেয়
•প্রস্রাব যদি কমে যায়
•ত্বকে বা অন্য কোথাও ব্লিস্টার বা চর্মরোগ দেখা দিলে
•বাচ্চার ডায়রিয়া হলে যদি পানি শূন্যতা দেখা দেয়
•উচ্চমাত্রায় জ্বর অর্থাৎ তাপমাত্রা যদি ১০০ বা ১০১ থাকে এবং সেটা না কমে
•শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং এর জন্য বাচ্চা ঘুমাতে না পারলে
•অতিরিক্ত বমি করলে
•বাচ্চা যদি নেতিয়ে পড়ে বা দুর্বল হয়ে যায়
•বাচ্চা মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে না পারলে
•অথবা বাচ্চার যদি যেকোনো কারণে খিচুনি হয়
এসব লক্ষণ দেখা দিলে বাচ্চা কোনোভাবেই বাসায় রাখা যাবে না। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

হোম রেমেডি কী
ঠান্ডার সমস্যা হলে আগে যে সর্ষের তেল এবং রসুন দিয়ে গরম করে বাচ্চাদের শরীরে দেওয়ার যে প্রচলন ছিল, সেটি এখন ব্যবহার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
ডা. ফারহানা ফারুক তন্দ্রা বলেন, সর্ষের তেল ব্যবহার করলে শিশুর ত্বকে ডার্মাটাইটিস বা বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ দেখা দেয়। তাই এটা ব্যবহার না করাই ভালো।
এ সময়ে বাচ্চাদের যদি হালকা ঠান্ডা বা সর্দি লাগে সে ক্ষেত্রে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানো যেতে পারে। সর্দি-কাশিকে দূরে রাখতে বাসায় বসে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা হলো-
•বাচ্চাদের লেবুর শরবত গরম পানি দিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। এতে সর্দি-ঠান্ডা ভালো হয়
•শিশুদের তরল খাবার বেশি দিতে হবে
•সর্দি-ঠান্ডা লাগলে আদা বা মধু দিয়ে মাল্টা খাওয়ানো যেতে পারে
•তুলসীপাতা দিয়ে রঙ চা খাওয়ালে সর্দি ও ঠান্ডায় বাচ্চারা অনেক আরাম পায়
•ঠান্ডা বা গলা ব্যথা হলে গরম পানিতে লবণ দিয়ে কুলকুচি করানো যেতে পারে

নবজাতকদের যত্ন কেমন হবে
আদি যুগের মতো আতুরঘরের মতো এখনো নবজাতকদের একটু আলাদা করে রেখে বাড়তি যত্ন নেওয়ার কথা বলেন চিকিৎসকরা।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হেলেনা বেগম বলেন, নবজাতকদের গরম পরিবেশে এবং জীবাণুমুক্ত অবস্থায় রাখতে হবে।
"যেসব শিশু অপরিপক্ব অবস্থায় জন্ম নেয় তাদেরকে আরো বেশি খেয়াল রাখতে হবে"।
তিনি বলেন, এসব শিশু সূর্যালোকে কম থাকে বলে তাদের রোদে রাখতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে শিশু যাতে হলুদ হয়ে না যায়।
সূত্র : বিবিসি