শ্যামনগরে বাঁধ কাটার ঘটনায় পাউবো নীরব

আপডেট: 02:24:46 11/01/2020



img

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : চিংড়িঘেরে পানি আসা-যাওয়ার স্বার্থে বুড়িগোয়ালিনীর ‘জাপান হ্যাচারি’-সংলগ্ন খোলপেটুয়া নদীর উপকূল রক্ষা বাঁধ কাটার ঘটনার তিনদিন পরও কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে নীরবতা পালন করে চলেছে। দুর্যোগপ্রবণ শ্যামনগর উপকূলের পাঁচ নম্বর পোল্ডার-সংলগ্ন অংশের বাঁধ কেটে বিশালাকারের আটটি পাইপ বসানোর পরও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এলাকাবাসী সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন।
মাত্র এক মাস আগে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল-এর প্রভাবে পশ্চিম কৈখালী এলাকার জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয়রা বাঁধের ওপর দিয়ে ‘নাইনটি’ নামে বিশেষ পাইপ স্থাপন করেছিলেন। ওই ঘটনায় পাউবোর পক্ষ থেকে বাবলু, ফজলুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সংশ্লিষ্ট অংশের সেকশন অফিসার মাসুদ রানা বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে সংশ্লিষ্ট ঘের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।
কিন্তু জাপান হ্যাচারি-সংলগ্ন এলাকায় পাইপ মেরামতের নামে উপকূল রক্ষা বাঁধ সম্পূর্ণ কেটে সেখানে আটটি পাইট বসানোর পরও চুপ মেরে রয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমনকি সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা সেকশন অফিসার শাহানাজ পারভীন শুরুতে তাকে জানিয়ে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ঘের মালিকরা নদীর লোনা পানি ওঠানোর জন্য পাইপ মেরামত করছে বলে দাবি করেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় ‘পাইপ মেরামত করার কথা, কিন্তু বাঁধ কাটার কথা নয়, বাঁধ কাটা হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে সংবাদকর্মীদের জানান। কিন্তু ঘটনার তিনদিন পরেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি।
বাঁধ কাটার সঙ্গে জড়িতরাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় সব ঘের সরকার দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। বিত্তশালী এসব ঘের মালিকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বয়ং শাহানাজ পারভীন ওই স্থানের বাঁধ কেটে চিংড়ি ঘেরের পানি আসা-যাওয়ার কাজে ব্যবহারের জন্য পাইপ বসাতে মৌখিক অনুমতি দেন।
এদিকে পাউবো কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছামতো বাঁধ কাটার অনুমতি দেওয়ায় ভাঙনকবলিত শ্যামনগর উপকূল আবারো ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে পড়তে পারে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা।
পরিমল রায় ও সুধীর মণ্ডলসহ অনেকেই জানান, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। পশ্চিম কৈখালীতে বাঁধের উপর দিয়ে পাইপ বসানোর ঘটনায় মামলা হলেও বুড়িগোয়ালিনীতে বাঁধ কাটার পরও ঘের মালিকদের পক্ষে পাউবো কর্তৃপক্ষের অবস্থান বিস্ময়কর।
নীলডুমুর গ্রামের আকবর আলী ও আব্দুল হালিমসহ অনেকের অভিযোগ, পাঁচ ও ১৫ নম্বর পোল্ডার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ সেই পাঁচ নম্বর পোল্ডারের ভাঙনকবলতি অংশে পাইপ মেরামতের নামে নতুন করে বাঁধ কেটে আটটি পাইপ স্থাপনের কারণে সংলগ্ন অংশের ভাঙন আরো ত্বরান্বিত হবে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং বুড়িগোয়ালিনী আওয়ামী লীগের সভাপতি ভবতোষকুমার মণ্ডল নিজে ঘের মালিকদের পক্ষে বাঁধ কাটার দায়িত্ব নিয়ে জনৈক শাহাজান আলীকে কাজ তদারকির দায়িত্ব দেন বলে অভিযোগ।
আতংকিত এলাকাবাসীর মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সংবাদকর্মীরা গিয়ে বাঁধ কাটার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পাউবোর সেকশন অফিসার শাহানাজ পারভীনকে বিষয়টি অবহিত করেন। তবে তিনি সংবাদকর্মীদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে বরং তার মৌখিক অনুমতিতে ঘের মালিকরা নিজেদের পুরনো পানি ওঠানামার কল সংস্কার করছে বলে দাবি করেন। এক পর্যায়ে বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে গেলে শুধু দায় এড়াতে তিনি ‘বাঁধ কাটলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে আশস্ত করেছিলেন।
কিন্তুশুক্রবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পাশের চর থেকে মাটি নিয়ে পাইপ ঢেকে দিয়ে কর্তনকৃত বাঁধ আড়াল করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি জানান, সংলগ্ন অংশে একাধিক স্থানে ভাঙন। যদি কোনোক্রমে একবার বাঁধ ভেঙে যায়, তাহলে তাদের এলাকা পানিতে ডুবে যাবে। ঘের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং পাউবোর কর্মকর্তারা বিত্তবান ঘের মালিকদের সহায় হওয়ার কারণে তাদের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পোল্ডারের সেকশন অফিসার শাহানাজ পারভীন বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বাঁধ কাটার বিষয়ে ঘের মালিকদের পক্ষে স্থানীয় চেয়ারম্যান আমার স্যারদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।’
তাহলে অন্য ঘের মালিকরাও চেয়ারম্যানের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বাঁধ কেটে পাইপ মেরামত করতে পারবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিরুত্তর থাকেন।
স্থানীয়রা বলছেন, মুজিবর মাস্টার, আবুল কাশেম, সুকুমার মণ্ডল, রুহুল আমিন ও সাবেক চেয়ারম্যান প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আনিছুর রহমানসহ আরো কয়েকজনের শত শত বিঘা জমির পানি যাওয়া-আসার জন্য পাইপটি ব্যবহার হয়। কিন্তু ছোট পাইপ দিয়ে আশানুরূপ পানি ওঠানামা না হওয়ায় পাউবোর নির্দিষ্ট কয়েকজনকে ‘ম্যানেজ’ করে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহয়োগিতায় সেখানে নতুন করে আটটি পাইপ বসানোর জন্য বাঁধ পুরো কেটে ফেলা হয়।

আরও পড়ুন