সওজ’র সব কাজের ঠিকাদার আমিনুল!

আপডেট: 02:34:20 05/12/2020



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগ পিএমপি ক্ষুদ্র সড়ক মেরামত কাজে ১২ গ্রুপে প্রায় ছয় কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে; যার সবগুলোই পেয়েছেন একজন ঠিকাদার। আমিনুল হক নামের ওই ঠিকাদার খুলনা বিভাগের দশ জেলায় একই প্রকল্পে প্রায় একশ' গ্রুপ কাজের অধিকাংশই পেয়েছেন। ঠিকাদাররা বলছেন, খুলনা বিভাগ নয় গোটা দেশের ৬৪টি জেলাতেই এই প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ তার লাইসেন্সে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, 'আমিনুল হক প্রাইভেট লিমিটেড' নামে এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে গোটা দেশে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার কাজ করছেন।
সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, সড়ক বিভাগের বেঁধে দেওয়া ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির কারণে যোগ্যতার মাপকাঠি তার পক্ষে থাকায় পিএমপি (পিরিয়ডিক মেইন্টেন্যান্স প্রোগ্রাম) সড়ক ও মহাসড়কের মাইনর কাজগুলোর বেশির ভাগ তিনিই পাচ্ছেন। দেশের সব এলাকাতেই তার লাইসেন্সে কাজ চলছে। যে কাজগুলো তিনি ছোট ছোট ঠিকাদার দিয়ে সম্পন্ন করাচ্ছেন। অবশ্য আমিনুল হক দাবি করেছেন, তার লাইসেন্স অনেকে ব্যবহার করে কাজ করছেন। এটা সম্পর্কের কারণে দিয়েছেন। কাজ বিক্রি করেননি। দাবি করেন, শুধু তিনি একাই কাজ পাচ্ছেন এটা ঠিক নয়, অন্যরাও কিছু কিছু পাচ্ছেন।
সাধারণ ঠিকাদারদের বক্তব্য যেগ্যতা যাচাইয়ের এই পদ্ধতি আসলে কতটুকু কার্যকর হচ্ছে? একজন ঠিকাদারকে দেশের ৬৪টি জেলায় কাজ দেওয়া হচ্ছে। যা বিক্রির মাধ্যমে ছোট ছোট ঠিকাদারদের হাতে চলে যাচ্ছে। আর যারা কাজ কিনছেন তারা যোগ্যতার কারণে দরপত্রে অংশই নিতে পারছেন না। তাছাড়া সরকারের অন্য সকল দপ্তর দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে এলটিএম (সকল লাইসেন্স মালিক অংশ নিতে পারবেন) পদ্ধতি ব্যবহার করলেও সড়ক বিভাগ তা করছে না। ফলে ছোট ঠিকাদাররা কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি নতুন ঠিকাদার তৈরি হচ্ছে না। আর যারা অধিক টাকা দিয়ে কাজ কিনে করছেন তারা কাজের মান ধরে রাখতে পারছেন না।
সড়ক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা নাম প্রকাশ না করে জানান, অন্য সব দপ্তর উন্নয়ন কাজে দরপত্র গ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতি নিলেও সওজ এলটিএম পদ্ধতি গ্রহণ করে না। কাজের গুনগত মান ধরে রাখতে ঠিকাদার নির্বাচনে তারা কিছু নিয়ম মেনে চলে। তারা ক্ষুদ্র মেরামতের ক্ষেত্রে ওটিএম (অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদারের অংশগ্রহণ) পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদারের পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা, কত বেশি টাকার কাজ করেছেন এবং কত বেশি কাজ চলমান আছে- এ সকল দিক বিবেচনা করা হয়। আর এ সব কারণে গত তিনটি অর্থবছর এই বিভাগ থেকে আহ্বান করা টেন্ডার একজন করে ঠিকাদারই বেশি পেয়ে যাচ্ছেন। ওই কর্মকর্তারা আরো জানান, গত দুইটি অর্থ বছরে মোজাহার এন্টারপ্রাইজ, মঈন উদ্দিন বাঁশি, রানা বির্ল্ডাস- এরা বেশি কাজ করেছেন। এ বছর নওগাঁ জেলার বাসিন্দা আমিনুল হক সব কাজ পেয়ে যাচ্ছেন।
তারা দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ভালোর জন্য এই নিয়ম মেনে চলছেন। কাজের মান ধরে রাখতেই এটা করা হচ্ছে। তবে একজন ঠিকাদারের পক্ষে গোটা দেশের সব কাজ করা অসম্ভব। যে কারণে তিনি ছোট ছোট ঠিকাদারের কাছে কাজগুলো দিয়ে দিচ্ছেন। এতে কাজের মান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কাজগুলো সেই 'অযোগ্যদের' হাতেই চলে যাচ্ছে।
ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগে কাজ করেন এমন এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করে জানান, এ বছর ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় ছয় কোটি টাকার ১২ গ্রুপের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কাজগুলো সবই পেয়েছেন নওগাঁর ঠিকাদার আমিনুল হক। তিনি কাজগুলো ছোট ছোট ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করেছেন। এখন কাজ করছেন ছোট ছোট ঠিকাদাররা, যাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তর অযোগ্য মনে করছেন। তিনি আরো জানান, যারা কাজগুলো করছেন তাদের ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা টাকায় কিনতে হয়েছে। ফলে ১০ শতাংশ নিম্নদরের পর আবার এই খরচ করে যারা কাজ করবেন তারা কোনোভাবেই কাজের মান রাখতে পারবেন না। তাদের দাবি, ক্ষুদ্র মেরামতের কাজগুলো এলটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করলে নতুন নতুন ঠিকাদার তৈরি হবে। প্রকাশ্যে লটারির মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হলে শতকারা ১০ শতাংশ দরে ঠিকাদাররা কাজ পাবেন। তাহলে কাজগুলোর মানও ধরে রাখা সম্ভব হবে।
ঠিকাদররা বলেন, কার্যত ছোট ঠিকাদাররা কাজ করছেন, তবে তাদের অতিরিক্ত পয়সা গুনতে হচ্ছে। এতে তাদের কাজ করতে হচ্ছে নিম্নমানের, যার কারণে কাজের মান খারাপ হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা মুকুলজ্যোতি বসু জানান, এই পদ্ধতি সড়কের প্রধান কার্যালয়ের সিদ্ধান্তে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তারা কেন্দ্রীয় নিয়ম মেনেই দরপত্র আহ্বান করে থাকেন।
খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জর্জিস হোসেন জানান, সড়ক বিভাগের বর্তমান নিয়মের কারণেই একজন ঠিকাদার দেশের সব অঞ্চলের কাজগুলো পেয়ে যাচ্ছেন। তবে এটা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা তা নিয়ে ভাবছেন।

আরও পড়ুন