সন্তানসম্ভবা কিশোরী মুখ লুকিয়ে, ‘ধর্ষক’ বীরদর্পে

আপডেট: 06:57:38 12/10/2020



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : গর্ভে চার মাসের বাচ্চা নিয়ে এক কিশোরী যখন নিজ ঘরের মধ্যে মুখ লুকিয়ে রেখেছেন, তখন কথিত ধর্ষক ও তার সহযোগীরা মামলার আসামি হয়েও বীরদর্পে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। মাঝে মধ্যে ‘ধর্ষিতা’র পরিবারের ওপর চড়াও হয়ে মামলা মিটমাট করে নিতে চাপ দিচ্ছেন। তাদের এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় একদফা লাঠিসোটা দিয়ে বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরও করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বড়বাড়ি-বগুড়া গ্রামের।
অবশ্য ‘ধর্ষিতা’ কিশোরী তার এই অবস্থার জন্য যাকে দায়ী করছেন ওই গ্রামের সায়ামত মোল্লার ছেলে মিলন মোল্লা, মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ঘটনাটিকে সামাজিক দ্ব›েদ্ব রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনায় তার সঙ্গে গ্রামের আরো চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এখন একটি পক্ষ বলছেন, তাদের দলে যোগ দিলে মামলা মিটিয়ে নেওয়া হবে। যেটা আদৌও সম্ভব নয় জানিয়ে বলেন, তাই তিনি মেয়েটিকে বিয়ে করে অন্যদের বাঁচাতে চান। কিন্তু তারা সবাইকে ফাঁসাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে বড়বাড়ি-বগুড়া গ্রামের ওই কিশোরীর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার মায়ের (৫৪) সঙ্গে।
ওই নারী জানান, এই গ্রামের মেয়ে তিনি। পাশের কুশবাড়িয়া গ্রামে তার বিয়ে হয়। তার দুটি কন্যাসন্তান আছে। বড় মেয়ের (২২) বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে।
তিনি জানান, বড় মেয়ে জন্ম নেওয়ার পর তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেন। এরপর তিনি রাগ করে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। এখানে আসার পরও স্বামীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। স্বামী এখানে আসতেন এবং খোঁজ খবর রাখতেন। এখানেই জন্ম হয় রিজিয়া খাতুনের।
ওই নারী আরো জানান, তিনি খুবই কষ্ট করে সংসার চালান। গ্রামের এক প্রতিবন্ধী নারী শাহিদা খাতুনের (৫৫) সেবা করার কাজ করেন। মাসে ৫০০ টাকার চুক্তিতে তিনি এই কাজ করেন।
তিনি জানান, অন্যদিনের মতো গত জুলাই মাসের ৫ তারিখ ওই নারীর বাড়ি গিয়েছিলেন তিনি। বাড়িতে ছোট মেয়ে একাই ছিল। কাজ শেষে তিনি বাড়ি ফেরেন। বাড়িতে এসে তার মেয়েকে ঘরেই দেখতে পান। তবে তার আচরণ ভালো ছিল না। সবকিছুতে কেন যেন ভয় পাচ্ছিল। এভাবে এক মাস পেরিয়ে যায়। হঠাৎ একদিন দেখতে পান মেয়ে বমি করছে। এটা দেখে তার সন্দেহ হয়। তখন মেয়েকে প্রশ্ন করলে মেয়ে ভয়ে কিছু বলতে চায়নি। পরে চাপাচাপি করলে বলে, তাদের বাড়ির পাশের সামায়াত মোল্লার ছেলে মিলন মোল্লা (৩৫) জুলাই মাসের ৫ তারিখ ঘরে একা পেয়ে তাকে ধর্ষণ করেছে। এই কথা বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং জানায়, একথা জানাজানি হলে তাদের মেরে ফেলবে। যে ভয়ে সে এতোদিন মুখ বন্ধ করে ছিল। তবে সারাক্ষণ চিন্তিত ও ভীত ছিল।
সন্তানসম্ভবা কিশোরী জানায়, ঘটনার দিন সে ঘরের মধ্যে একা ঘুমিয়ে ছিল। ওই সময় মিলন মোল্লা তার ঘরে আসে। তাকে দেখে চিৎকার দিতে গেলে মুখ চেপে ধরে মিলন। এরপর জোর করে তার সঙ্গে খারাপ কাজ করে। সে বাধা দিয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি।
সে আরো জানায়, মিলন মোল্লা হুমকি দিয়ে যায়, এই কথা কাউকে বললে মা-মেয়ে দুইজনকেই জবাই করে ফেলবে। ফলে ভয়ে সে কাউকে কিছু বলেনি। এখন মিলন মোল্লা বিয়ে করতে চাচ্ছে। কিন্তু এই বিয়েতে সে রাজি নয়। সে ধর্ষকের উপযুক্ত বিচার দাবি করছে।
কিশোরীর মা জানান, এই ঘটনা জানার পর তিনি মেয়েকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সেখানে পরীক্ষা শেষে তার গর্ভে বাচ্চা আছে বলে নিশ্চিত হন। বয়স মাত্র ১৩ বছর হওয়ায় তিনি মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত। গর্ভের বাচ্চাটি নিয়ে আছেন আরো বেশি চিন্তায়। কখন কী ঘটে তা নিয়ে সারাক্ষণ আতংকে থাকেন। এই অবস্থায় সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখ তিনি ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে একটি মামলা করেন। যে মামলায় মিলন মোল্লাকে প্রধান আসামি করে এবং যারা তাকে সহযোগিতা করেছে- এমন আরো চারজনকে অভিযুক্ত করেছেন। আদালত তার আরজিটি এজাহার হিসেবে থানায় নথিভুক্ত করতে শৈলকুপা থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ এই নির্দেশ পেয়ে মামলাটি নথিভুক্ত করলেও আজও কোনো আসামিকে গ্রেফতার করেনি। উল্টো আসামিরা মাঝে-মধ্যেই তাদের বাড়িতে এসে নানা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। মীমাংসা না করে নিলে আরো বড় ক্ষতি হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে মিলন মোল্লা বলেন, তার স্ত্রী মিতা মোল্লা মারা গেছেন আনুমানিক দুই মাস হয়েছে। ১৪ বছর বয়সের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তিনি এখন পথে পথে। তিনি এই ঘটনার একটা সমাধান চান।
এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আরেক আসামি স্থানীয় আবাইপুর ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ফরিদ মুন্সি জানান, তাকে সামাজিকভাবে ক্ষতি করতে এই মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি এই ঘটনার কিছুই জানেন না।
এ বিষয়ে শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, আদালতের নির্দেশ পেয়ে তারা মামলাটি নথিভুক্ত করেন। এরপর আসামি গ্রেফতারে জোর চেষ্টা করছেন। আশা করছেন, দ্রুত তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন