সমতলেও কমলা চাষ সম্ভব, দেখালেন রফিকুল

আপডেট: 06:26:24 29/12/2019



img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ঝিনাইদহের সমতল ভূমিতে কমলা চাষে সফলতা পেয়েছেন রফিকুল ইসলাম নামে এক কৃষক। এবছরই প্রথম তার বাগানে এ কমলালেবু ধরেছে।
চাষ হওয়া এই লেবু ভারতের দার্জিলিংয়ের কমলা বলে স্থানীয় কৃষি অফিস জানিয়েছে। দেশের সমতল ভূমিতে এবারই প্রথম এই কমলা চাষের সুসংবাদ পাওয়া গেল বলেও জানায় কৃষি অফিস।
গাছে ঝুলে থাকা দৃষ্টিনন্দন এই কমলা খেতে বেশ সুস্বাদু। বাজারে কিনতে পাওয়া লেবুর থেকে আকার ও স্বাদ অপেক্ষকৃত ভালো। ইতিমধ্যে রফিকুলের বাগান পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সম্ভাবনাময় এ ফলের চাষ সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তর।
রফিকুলের বাগানটির অবস্থান ঝিনাইদহ শহর থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে মহেশপুর উপজেলার স্বরুপপুর ইউনিয়নের চাপাতলা গ্রামে। এই কমলাবাগান থেকে ভারতীয় সীমান্ত মাত্র ৪০০ গজ দূরে। এই মাঠ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীই মূলত ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিভক্তির রেখা টেনে দিয়েছে।
রফিকুল মহেশপুর উপজেলার চাপাতলা গ্রামের আইনুদ্দীন মন্ডলের ছেলে। তিন ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে মেজ রফিকুল। তিনি বেশ আগে থেকে নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাঠে তার চাষযোগ্য কোনো জমি ছিল না। বর্গা নিয়ে চার বিঘা জমিতে কমলা চাষ করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি কমলা বিক্রির টাকায় দশ কাঠা জমি কিনেছেন।
রফিকুলের বাগানে কমলার গাছ রয়েছে ১২০টি। এর মধ্যে ৩০টি চাইনিজ জাতের কমলা ও ৫০০টি মাল্টা লেবুর গাছ রয়েছে। কমলা চাষে আশাতীত সফলতা পেয়ে চলতি বছর আরো পাঁচ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে দার্জিলিং জাতের কমলা চাষ করেছেন। সফলতা দেখে এলাকার অনেক চাষি তার কাছ থেকে চারা কিনে চাষ শুরু করছেন। এছাড়া প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থী রফিকুলের বাগানে কমলা দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন।
বাগানে গিয়ে দেখা যায়, দার্জিলিং জাতের কমলার গাছে দৃষ্টিনন্দন শত শত ফল ধরে আছে। হাত বাড়ালেই তা ধরা যাচ্ছে। হালকা হলুদ ও গাঢ় হলুদ রঙের কমলা সবুজ পাতার মধ্যে ঝুলে থাকায় তা ছবির মতো দেখা যাচ্ছে। সব থেকে বেশি ধরেছে চাইনিজ কমলা। গাছে ধারণক্ষমতার বেশি কমলা ঝুলে থাকায় তা ধরে রাখতে বাঁশের ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। বাগানে আসা দর্শনার্থীরা ‘সমতল ভূমিতে এর আগে কখনোই কমলাচাষ দেখেননি’ বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন।
কমলাবাগানের মালিক রফিকুলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে জমিতে তিনি কমলা এবং মাল্টার চাষ করেছেন, সেখানে আগে পেয়ারার বাগান ছিল। তিন বছর আগের কথা। ভারত থেকে ২০০ টাকা করে কমলা ও ১৪০ টাকা দরে মাল্টা লেবুর চারা কিনে রোপণ করেন। গত তিন বছরে চারা ক্রয়, রোপণ এবং বেড়া তৈরিসহ পরিচর্যায় প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এবছরই প্রথম ফল আসার পর তা বিক্রি করেছেন। দার্জিলিংয়ের কমলা কেজিপ্রতি ১২০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এ পর্যন্ত সাড়ে সাত লাখ টাকার কমলা ও মাল্টা বিক্রি করেছেন তিনি। এখনো দুই লাখ টাকার কমলা গাছে ধরে আছে। এছাড়া এখান থেকে কলম পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা বিক্রি করেছেন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার। ব্যপারিরা বাগান থেকে কমলা কিনে নিয়ে গেছে।
এক ব্যাপারি আগামী এক বছরের জন্য ২০ লাখ টাকায় বাগান কিনে নিতে চেয়েছেন। কিন্তুরাজি হননি রফিকুল ইসলাম।
রফিকুল জানান, কমলার বাগান করতে তেমন কষ্ট করতে হয় না। তবে জমির চারপাশে ভালো করে বেড়া তৈরি করতে হয়। পাঁচ বছর পর একটি গাছ ফল ধরার জন্য পরিপূর্ণতা লাভ করে। প্রতিটি গাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ভালোভাবে ফল পাওয়া যাবে। এছাড়া অনাবৃষ্টির সময়ে গাছে সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। আগাছা পরিষ্কার রাখতে হয়। গাছে ফল এলে ভ্রমর ও মাছিসহ বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। তখন বাড়তি নজরদারি করতে হয়।
মহেশপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. হাসান আলী ও কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার অমিত বাগচী রফিকুলের চাষ করা কমলার স্বাদ ভালো উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি সম্ভাবনময় এ চাষ সম্প্রসারণ করতে। ইতিমধ্যে অনেক কৃষক এই কমলা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমরা তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতার চেষ্টা করছি। নিয়মিত সরেজমিন তাদের সাথে যোগাযোগ করছি।’
সম্প্রতি রফিকুল ইসলামের এই কমলাবাগান পরিদর্শনে আসেন বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ড. আলহাজ উদ্দীন আহাম্মেদ। এই কর্মকর্তা বললেন, ‘আমাদের দেশের পাহাড়ি কিছু এলাকায় কমলা উৎপাদন হয় বলে জানা যায়। কিন্তু সমতল ভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে দার্জিলিং জাতের কমলার চাষ এবারই প্রথম।’
তিনি বলেন, রফিকুলের বাগানে উৎপাদিত কমলা খেতে বেশ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। ফলের আকারও তুলনামূলক বড়। তাছাড়া প্রতিটি গাছে ধরেছে অনেক। সম্ভাবনাময় এ কমলার চাষ ছড়িয়ে দিতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশের কৃষক। অন্যদিকে পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন