সহস্র আকাঙ্ক্ষার মির্জা গালিব

আপডেট: 08:09:33 11/01/2020



img

ফাহরিন আলমগীর

Galib:A Thousand Desires রাজা মীরের সদ্য প্রকাশিত বইটি শুধু গালিবের জীবনচরিত এবং তার কাব্য আলোচনার মধ্যে সীমিত নয়, বরং এই বইটির মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং উর্দু ভাষার সাহিত্য সম্প্রসারণের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গালিবের সাহিত্য চর্চায় এ বইটুকু কতটুকু মূল্য সংযোজন করবে, তা সময় বিবেচনা করবে; কিন্তু, বইটি আমাদের ভেতর অন্য একধরণের অনুরণন তৈরি করে।
বইটি আমাকে স্মৃতিতাড়িত করে তোলে, মনে হয় যা কিছু ছিল একসময়, তা আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। বইটির বাংলা নামকরণ হয়ত হবে গালিব:সহস্র আকাঙ্খার সম্ভার। কিন্তু, যা কিছু হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে বলেই তা আমাদের কাছে আকাঙ্ক্ষিত। আর তাই আমার কাছে রাজা মীরের বইটি হয়ে ওঠে গালিব: সহস্র আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘশ্বাস। বইটি আমাকে নিয়ে যায় সেই ৯০-এর দশকে যখন গালিবের সাথে আমার প্রথম পরিচয় আবু সায়ীদ আইয়ুবের হাত ধরে। একইসাথে ভীড় করে কত হারিয়ে যাওয়া মুখ এবং সময়। সত্যজিত রায়ের চলচ্চিত্র ‘শতরঞ্চ কি খিলাড়ী’, ‘উমরাও জান’ এবং সেই জনপদ, সেই জীবনযাপন এবং ১৮৫৭-র সেই উত্তাল সময়কে চিনবার যেই আকুলতা ছিল আমাদের।
গালিবের বিভিন্ন পংক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে জীবনের প্রতি তাচ্ছিল্য, একইসাথে আগ্রহ, মৃত্যুর প্রতি তাচ্ছিল্য, রাজা অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। আমরা বহুভাবে গালিবের সাথে পরিচিত। তাহলে, রাজার বইটি কি ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছে, সে প্রশ্নটি উঠতে পারে। রাজার বইটির যে বিষয়গুলো আমার কাছে মনে হয়েছে ব্যতিক্রমী, সেগুলো হল-প্রথমত, রাজা ১৭০৭ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত একটি নাগরিক জীবনের পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন। সেই নগরটি আক্রান্ত হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে এবং সে পরিবর্তনের দীর্ঘশ্বাস কান পাতলেই শোনা যায়। উপমহাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল গালিবের জীবনকে উন্মোচনের মাধ্যমে রাজা মূলত: সেই সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইতিহাসকে আমাদের কাছে তুলে ধরেন। গালিবের নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদাগুলো এবং তা পূরণের জন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে তাঁর সমর্পণ, একটা ক্রান্তিকাল যা সাধারণ নাগরিক মানুষের জীবনযাপনের ধরণকে পরিবর্তিত করেছে, সেটাই প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
রাজার ভাষায়, এক ধরণের নিভৃতচারী গালিবের পরিচয় মেলে। বইটি শুরুই হয়েছে গালিবের কোলকাতা যাত্রা এবং জীবনের নতুন পরিবর্তনগুলো কিভাবে মানিয়ে নিচ্ছিলেন সেই বর্ণনায়। কোলকাতায় গালিব তাঁর ব্রাক্ষ্ম বন্ধুদের সাহচর্যে জীবনের আরেক দর্শনের সাথে পরিচিত হন, যা ধর্মীয় বিশ্বাসকে ছাপিয়ে উঠে প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে স্বাধীনতা এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নকে গালিবের জীবনদর্শন করে তোলে।
গালিবের দর্শনের মধ্য দিয়ে রাজা এই উপমহাদেশের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আচরণকে একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়েছেন। এই উপমহাদেশে ইসলামী মূল্যবোধ ও দর্শন প্রসারিত হয়েছে সুফী মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে, যে মূল্যবোধে মানুষের প্রতি ভালবাসা ও সম্প্রীতি ছিল, যার কারণেই এই ধর্মীয় মূল্যবোধে এসে মিশেছে বাউল এবং বৈষ্ণব দর্শন। গালিবের জীবন সেই ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকে প্রতিবিম্বিত করে যা রাজা অত্যন্ত সুকৌশলে উপস্থাপন করেছেন। এই উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে রাজা গালিবের জীবনদর্শনের সাথে নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবনকে একই সমতলে নিয়ে এসে এক নতুন গালিবকে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন।
রাজার এই বইটি গবেষকদের কাছে একটি উল্লেখ্যযোগ্য বই হয়ে উঠবে সময়ের পরিসরে।
রাজা মীর, পেশায় অধ্যাপক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে The Taste of Words: An Introduction to Urdu Poetry।
[বিডিনিউজ থেকে]