সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে পাঠাননি আদালত

আপডেট: 09:25:41 24/11/2020



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা: একজন ‘প্রথম অপরাধীকে’ যখন অপরাধের দায়ে কারাগারে পাঠানো হলে সমাজের প্রতি তার শত্রুতামূলক মনোভাব সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে কারাগারে অবস্থানকালে অন্যান্য দাগী অপরাধীদের সংস্পর্শে গিয়ে সে মারাত্মক ধরনের অপরাধের অভিজ্ঞতা ও কুশিক্ষা লাভ করে থাকে। ফলে কারামুক্ত হয়ে সমাজের চোখে সে ‘দাগী’ বিবেচিত হয় এবং সমাজের সকলের ঘৃণার পাত্র হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ তার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং সুযোগ সুবিধা থেকে সে বঞ্চিত হয়।
এই অবস্থা বিবেচনা করে সাতক্ষীরার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসমিন নাহার আবারও একটি মামলার রায়ে একই পরিবারের ৪ জন আসামিকে সাজা দিয়ে জেলে না পাঠিয়ে নিজবাড়িতে থেকে সমাজের জন্যে কিছু ভাল কাজ করে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি প্রকাশ্য আদালতে ওই আদেশ দেন।
সংশোধনের সুযোগ পাওয়ারা হলেন, আশাশুনি উপজেলার মহিষাডাঙ্গা গ্রামের লক্ষীকান্ত গাইনের ছেলে গৌতম গাইন (২৪), তার মা মমতা গাইন (৪২), উর্মিলা গাইন (২৬) ও লতিকা মন্ডল (৩৯)। ওই মামলার বাদী ছিলেন একই গ্রামের সন্দিপ কুমারের স্ত্রী নমিতা মন্ডল।
নমিতা মন্ডলের অভিযোগ, যাতায়াতের পথ নিয়ে বিরোধের কারণে প্রতিবেশী আসামিরা তাদের মারপিট করে জখম করে। আসামিপক্ষেরও এটি ছিল জীবনে প্রথমবারের অপরাধ। বিচারে তাদের এক মাসের সাজা হয়। কিন্তু বিচারক জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসমিন নাহার আসামিদের জীবনে প্রথমবারের অপরাধ বিবেচনায় তাদের জেলে না পাঠিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে থেকে সামাজিক কিছু দায়িত্ব মেনে সংশোধন হওয়ার নির্দেশ দেন। শর্তগুলো হচ্ছে, আসামি গৌতম গাইনকে নিজ এলাকায় ১৫ দিন অন্তর ১ দিন মাদকবিরোধী প্রচার চালাতে হবে, ৩ জন নারী আসামিকে শর্ত দেওয়া হয়েছে ১৫ দিন অন্তর ১ দিন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। এছাড়া সকলকে বলা হয়েছে, নিজ খরচে বাদীকে ১০টি ফলদ ও ১০টি বনজ গাছ কিনে দিতে, সবার সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে, ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতে। এসব এসব শর্ত মানার ব্যাপারে দেখভালের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ জেলা সমাজসেবা অফিসের প্রবেশন অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসাথে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য প্রবেশন অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে আসামিরা একটি লিখিত মুচলেকাও আদালতে দিয়েছেন।
প্রবেশন অফিসার সুমনা সুলতানা জানান, কোননো অপরাধীকে তার অপরাধের জন্য ‘প্রযোজ্য দ-’ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে পরীক্ষামূলকভাবে একজন প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে সংশোধন হওয়ার সুযোগ প্রদান করাই হলো প্রবেশন। প্রবেশন চলাকালীন অপরাধীর আচরণ সন্তোষজনক বিবেচিত হলে আদালত তাকে তার অপরাধের দায় হতে স্থায়ীভাবে মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিনি আরও জানান, ইতোপূর্বে সাতক্ষীরা সদরের জনৈক হাসান আলীকেও প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তাকে দেখভাল করা হয়েছে। যথাসময়ে বিজ্ঞ আদালতে প্রতিবেদনও দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ১৮৪১ সালে আমেরিকার বোস্টন শহরের জনৈক মার্কিন নাগরিক আদালত থেকে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে নিজ জিম্মায় নিয়ে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলেন এবং ব্যক্তিটি মাদকমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এরপর মার্কিন ওই নাগরিক তাকে একটি কাজ দেন মর্মে তিনি আদালতে রিপোর্ট দাখিল করেন। আদালতের বিজ্ঞ বিচারক এতে খুবই উৎসাহিত হন এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন অপরাধীকে মার্কিন ওই নাগরিকের জিম্মায় দেন। এভাবেই প্রথম প্রবেশন কার্যক্রম শুরু হয়। এজন্য মার্কিন ওই নাগরিক লড়যহ অঁমঁংঃঁং কে ‘প্রবেশনের জনক’ বলা হয়। ১৮৭৮ সালে বোস্টন শহরে ঈধঢ়ঃধরহ ঝধাধমব কে প্রথম পেশাদার প্রবেশন অফিসার নিয়োগ করা হয়। ইংল্যান্ডে প্রবেশন চালু হয় ১৯০৭ সালে। উপমহাদেশে প্রথম প্রবেশন আইন চালু হয় ১৯৫৮ সালে ভারতে। আর বাংলাদেশে ১৯৬০ সালে ‘ঞঐঊ চজঙইঅঞওঙঘ ঙঋ ঙঋঋঊঘউঊজঝ ঙজউওঘঅঘঈঊ, ১৯৬০ ( ঙজউওঘঅঘঈঊ ঘঙ, ঢখঠ ঙঋ ১৯৬০)’ জারীর মধ্য দিয়ে সংশোধন মূলক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে দীর্ঘ ৬০ বছর পরে হলেও সাতক্ষীরায় শুরু হয়েছে এই আইনের চর্চা। ফলে সংশোধন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে প্রথম বারের অপরাধীদের জন্য।

আরও পড়ুন