সাজেকের রাত

আপডেট: 11:16:42 29/10/2019



img
img
img

আহসান কবীর

কড়-কড় কড়াৎ- বিজায় জোরে দিয়ার ডাক। শুনে পিলে চমকে যাতি লাগলো। মন কচ্চিলো, নিচে নাইমে ঘরে পলাই। আবার লোভ লাগার কতাও না কলি মিত্যে হয়। দিয়ার আলোয় যিরাম সুন্দর দেখতি এই আকাশ-পাহাড়, বোন- তা কি আর দেকতি পাবানে কোনোদিন!
সব দোষ ওই মুটা বিটার। কলে, ‘ভাই, দারু খাবেন?’
কলাম, ‘দিবানে এট্টু মুখি।’

বিকেলে বেরোইলাম যশোরতে। ঢাকা ঘুরে ফেনী হয়ে খাগড়াছড়িতি পা পড়লো ব্যানব্যালা। সুমুন্দির ছাওয়াল ডিরাইবার খাগড়াছড়ি যায়ে কলো, ‘ছার, আমি আর পারবান না। আপনারা চান্দের গাড়িতি যান।’
মিজাজ খচে গিলিও কওয়া যাচ্চে না কিচু। ডিরাইবাররে খ্যাপালি বিপদে পড়তি পারি। পাহাড়ি রাস্তা, কনে নামাতি কনে নামায় দেবেনে, শেষে পরান নিয়ে বাড়ি ফিরাই দায় হবেনে।
২০-২৫ মিনিটির মদ্যি একটা ব্যবস্তা হলো। আরেকটা মাইক্রোয় উটে সাজেকের দিকি চললাম। খাগড়াছড়ি শহরের এই ২০-২৫ মিনিট সুমায়ের মদ্যি দুইজন এক হোটেলে যাইয়ে হাগা-মুতা সাইরে নিলো, তা আর নাইবা কলাম।
নতুন ডিরাইবার সেইরাম জোরে গাড়ি চালাতি লাগলো। সকাল সাড়ে দশটার মদ্যি আর্মি ক্যাম্পে হাজির হতি হবে। না পারলি দাঁড়ায়ে থাকতি হবেনে বিকেল সাড়ে তিনডে পয্যন্ত। এইডেই নিয়ম। ডিরাইবার সুমায়মতোই হাজির কল্লো। সে তো বেকায়দা চালাক! শেষে আইসেও অনেক গাড়ির সামনে যাইয়ে একেবারে ক্যাম্পের সুমুকি হাজির। পুঙায় দুটো রুলির বাড়ি দিলিও দিতি পারতো আর্মিরা। ভাগ্য ভালো এইরাম কিচু হোইনি। আবার চললো গাড়ি। সাজেকের ঠিক আগের উঁচু পাহাড়ে উঠতি যাইয়ে ক্যালাই পড়লো এক্কান চান্দের গাড়ি। ব্যাস, কম্ম সাবাড়! ঘণ্টাখানেক দাঁড়াই থাকো পাহাড়ি খাড়া রাস্তার ’পর। অত উপরে, তাও বাতাস লাগে না শরীলি। ঘাইমে কাহিল অবস্তা। তার উপর ঘুরে-ফিরে লম্বাডা এসে কতি লাগলো, ‘রাস্তারতে নিচে নামবেন না কেউ। এই সব জাগায় কিন্তুক জোঁক থাকে। বসান দেবেনে।’ দুপুরি সাজেকের হোটেলে প্যান্ট খুলতি যাইয়ে সেই লম্বাডাই দেখলো, তার পায়ই সিন্দোইছে জোঁক! রক্ত খাইয়ে ট্যাপা।

পিরাই ২০ ঘণ্টা একটানা গাড়িতি। পতও তো কোম না, ৫০০ কিলোমিটার তো হবেই। শরীল আর চলার মতোন নেই। তাও কি বসার জো আছে? বাইড়েডার জুত সবচাইয়ে বেশি। কয়, ‘চলেন বেড়াইয়ে আসি। গাড়িও আছে নিচেই।’ তা সবাই কি নামলো? চালাকগুলো ঠিকই খাটে চিৎ। ঘুমোয়ে নেছে খাইনটে।
নিচে নাইমে ডিরাইবাররে কওয়াও সারা, গাড়ি জুড়াও সারা। খাইনটে গাড়িতি। তারপর ডিরাইবার কলো, ‘গাড়ি আর উঠোতি পারবান না। এবার হাঁইটে যান।’
হাঁটা ধরলাম। তকোন কি জানতাম, এইডেই সেই কংলাক পাহাড়ের রাস্তা! মাজাভাঙাডা অবস্তা বুজে একটা লাটি জুগাড় কল্লো। আশপাশে সব বুনো গাছপালা। দুরি বড় বড় পাহাড়। তাকাই আর মোনডা ভরে যায়। কিন্তুক রুগা-পটকা এই আমার অবস্তা কাহিল; পাই আর জোর পাচ্চিনে। মনে হচ্চিলো, কোনো জাগায় বসে পড়ি। সেই উপায়ও কি আচে! মনের মদ্যি যে জোঁকের ভয়! মাজে-মদ্যি প্যান্ট উঁচো করে দেকি জোঁক লাগলো কি-না।
সন্দের ঠিক আগে আগে খুঁজতি খুঁজতি মুটাডা আইসে হাজির। রাগে গজ গজ কত্তেচে, ‘সামনেই তো কংলাক পাহাড়। কাল সকালে তো আমরা ওইডেই ওটপো। একন আসার কী দরকার ছিল? ফেরেন। চলেন হেলিপ্যাডে যাই।’
কোনো কতা না কয়ে হাঁটা ধল্লাম। যাইয়ে দেকি, হেলিপ্যাডে অনেক লোক। সবাই সেলপি তুলতি ব্যস্ত। আমরাও তুললাম। কেউ কেউ কিচু মুকিও দিলো।
উকেনতে দেখা যায়, গোটা সাজেক, রুইলুইপাড়া। দুরি দুরি পাহাড়ের সারি। আবার অনেক নিচে ঝাঁপসা; মেঘের উড়াউড়ি। মোনে আসচিলো হেমন্ত মুখার্জির বিখ্যাত গান-
নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী
আর পৃথিবীর ’পরে ওই নীলাকাশ
তুমি দেখেছ কি?

সইন্দের পর হেলিপ্যাডেরতে নামলাম। পাশেই আর্মির একটা খাওয়ার দুকান। একজন কলো, ‘একেনে রাতির খাবার খালি কীরাম হয়?’ সবাই সায় দিলো। অডার দিয়া হলো, পুড়া মুরগি, বাঁশের মদ্যি রান্না করা কুকড়ো আর পরাটা। আগেও ক’বার খাইছি, রাঙামাটির পেদা টিং টিংয়ি। পাহাড়িগের খাবার। ভালোই লাগে।

হাঁটা ধরলাম সাজেকের রুইলুইপাড়ার দিকি, যেকেনে আমাগের হোটেল। আইসে দেকি একেবারে হাট বয়েচে। চারিদিকি রাস্তার ধারে হাইনসেলের আগুন। সবগুলোয় কুকড়ো পুড়াচ্চে, বাঁশের মদ্যি ঢুকোয়ে খাবে। কীরাম করে বানাচ্চে তা উঁকি-ঝুকি দিয়ে দেকার চিষ্টাও কল্লাম। এক দুকানে দেকলাম, কয়ডা ছ্যামড়া কিছু কিনতেছ। কাছে যাইয়ে ব্যাপার জানতি চালাম। বুঝলাম, বাঁশের চপ। কচি বাঁশের মুতা দিয়ে বানানো। খাইয়ে ফেললাম দুডো। আরেক দুকানে দেখি, বাঁশের আগা মুখি দিয়ে কী যেন খাচ্ছে মানুষ। সেকেনে যাইয়ে জানলাম, বাঁশের মদ্যি চা। অবাক ব্যাপার! কলাম, ‘আমরাও ইট্টু খাই।’ চা বানায়ে বাঁশের মদ্যি ঢাইলে দিলো। খাওয়ার সুমায় বুজলাম, লেবু দিয়া। কাগজিলেবু না, বাতাবি। চা খাচ্চি না কী খাচ্চি, বুজতি পাল্লাম না। টক টক স্বাদ।

এই সব কত্যি কত্যি রাত আটটা বাজলো। মুটা আর আইবুড়ো ভাই গুঁতোতি লাগলো- হোটেলে যাতি হবে। তিনতালা হোটেলের ছাদে চিয়ার নিয়ে গোল হয়ে বইসে গ্যালাম। দুই মুছল্লি এট্টু দুরি থাকলো। তবে তাগের উৎসায়ে কুমতি নেই। সেইরাম জোরে গান বাজাতি লাগলো। আর সাতে ভাজা-পুড়া যা ছিল তা সাবাড় কত্তি থাকলো। হটাৎই কালো মেঘে ঢাইকে গেল আসমান। শুরু হলো বাজ পড়া। দিনেমানে যে পাহাড়ে মেঘ দেকিলাম, বাজের আলোয় তা এখন ফকফকা। তাকায় থাকতি মন চায়।

দলবল নিয়ে পাহাড়ে গিইছি অনেকবার। সত্যি কতি কী, পাহাড়ের রাস্তাগুলোই পরান কাইড়ে নেয়। উঁচোনিচো, অ্যাকাব্যাকা। রাস্তার কোনো কোনো জাগা পাহাড়ের মাতায়, আবার কোনো কোনো জাগা যেন পাতালে। মাজে মাজেই চোক টানে বিরাট উচো পাহাড়; ঢালে কুটি কুটি বাড়িঘর। ঝাকা পিটি নিয়ে নাইমে আসচে বিটা-বিটিরা। আবার চোকে বাদে ঝরনা-ছড়ায় মেয়ে-বুড়োর চ্যান। এইরাম সুন্দর, যেন বইয়ের কোনো ছিন। চোক ফিরোনো যায় না।

পাহাড় ঠ্যাঙায়ে কংলাকপাড়ায় উটার যে কষ্ট, মানষি তা ভুলে যায় ছিন দেকে। পাঁচ মিনিটির মদ্যি আমাগেরও তাই হলো। কংলাকপাড়া এতো উচো, সেকেনতে দেখা যায় ম্যালা দূর। কোনডা ইনডিয়ার পাহাড় আর কোনডা বাংলাদেশের, চিনোয় না দিলি কতি পারবেন না। কী সুন্দর! সাজানো পাহাড়, অজানা-অচেনা গাছপালা, পাহাড়িদের কুঁড়ে। এতো উচোয় যারা থাকে, তারা তো মনের দিকতে রাজা! আসলে কিন্তুক প্রজারও অধম। ৭০-৮০ডে পরিবার। বেড়াতি আসা লোকগের জন্যি দোকান খুলে বয়েছে কেউ; আবার কেউ কেউ রেস্ট হাউজ চালাচ্চে। তা রেস্ট হাউজগুলোন কিন্তুক ওগের না। মালিকরা বাঙালি, ঢাকায় থাকে। আর পাহাড়ের ত্রিপুরা-লুসাইরা নিজির জমিতি রেস্ট হাউজ খুলে কর্মচারী হইছে। চোকি-মুকি গরিবি। অবস্তা খারাপ দেকে লুসাইদের প্রায় সবাই পগার পার; সীমানার ওইপারে ইনডিয়ায় আস্তানা গাইড়েছে। গুটিকয় যে পাহাড়ি পরিবার আছে, তাগের আব্রু বলতি কিচু নেই। প্রতিদিন হাজারে হাজারে লোক ওটে ওই পাড়ায়। উঁকি মারে ঘরের মদ্যিও। য্যানে-স্যানে বিড়ি-সিকারেট ফ্যালে। ছেলেপিলেগের হাতে কিছু ধরায় দ্যায়। ছেলেপিলেগুলো জানতিও পাচ্চে না ককোন ফকির হয়ে যাচ্চে। যাওয়া-আসার পথে দেকিচি, পাহাড়ি ছেলেপিলেরা হাত নাইড়তেচ চকলেট-চিপসের আশায়। হায় বাঙালি! তুমরাও যে আরবদেশে যাইয়ে ভিখিরি হয়ে যাও, তা হয়তো জানে না এই লুসাই-ত্রিপুরা ছেলেপিলেগুলো।

যাই হোক, আসর জমায়ে যকন বসলাম, তকন চোকজুড়ে শুদুই ঘুম। অবস্তা খাইনটে ওই ‘নাতি-খাতি বেলা গেল শুতি পারলাম না’র মতোন। ওই অবস্তায় হটাৎ যদি মেঘ গুড় গুড় শুরু হয়, মনডা তো আগেই ভিজে যায়। শুনলাম, একেনে নাকি যেকোনো সুমায় ঝড় শুরু হয়। ভাইঙেচুরে দেয় বাড়িঘর। তা হোকগে। চোকজুড়োনো দৃশ্য দেকতি দেকতি মল্লিও শান্তি। অবশ্য যদি চোক খুলে রাকতি পারি।
দুই ছটাক মতো পেটে পড়েছে, তকনই শরীলি ঠান্ডা হাওয়া লাগলো। গুমোট গরমেরতে খাইনটে রিহাই। এরপরের ঘণ্টা দুয়েক শুদুই আবেশের। সে কতা কলি ভাই-ভাগাররা লাটি নিয়ে তেড়ে আসবেনে।

লেখক : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি ও প্রেসক্লাব যশোর