সাতক্ষীরায় ৩৩৩ গরিবের করোনাকালীন অর্থ আত্মসাৎ!

আপডেট: 08:05:32 18/01/2021



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় করোনাকালে দরিদ্রদের জন্য দেওয়া সরকারি অর্থ সহায়তা কার্যক্রমে তছরুপের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার চাম্পাফুল ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ একটি মোবাইল অপারেটরের একই সিরিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ৩৩৩ জনের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। তালিকায় দেওয়া বিভিন্ন নম্বরে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইউনিয়নটিতে ৩৯১ জনকে ওই সুবিধার আওতায় আনতে তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল। সুবিধাভোগীদের জন্য সরকারি তহবিল থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আড়াই হাজার টাকা করে বরাদ্দ ছিল।
অভিযোগ উঠেছে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তথা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজ্জাম্মেল হক এ অর্থ তছরুপের সাথে জড়িত এবং তিনি প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।  
তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর আলোকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনে আবেদন করে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়,  কালিগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে তিন হাজার ৫৭৪টি পরিবারকে করোনাকালে নগদ আড়াই হাজার টাকা করে সরকারি অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে ১৮৮ জন, বিষ্ণপুরে ৩৮৯ জন, চাম্পাফুলে ৩৯১ জন, দক্ষিণ শ্রীপুরে  ১২৮ জন, কুশলিয়ায় ৪২১ জন, নলতায় ৫৭৮ জন, তারালীতে ১৬৬ জন, ভাড়াশিমলায় ৩৩৭ জন, মথুরেশপুরে ১৪১ জন, ধলবাড়িয়ায় ৩৮০ জন, রতনপুরে ১২৯ জন এবং মৌতলায় ৩২৬ জনকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তালিকা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চাম্পাফুল ইউনিয়নে ৩৯১টি পরিবারের নামের মধ্যে ৩৩৩টি পরিবারের নামে একটি মোবাইল অপারেটরের একই সিরিজের নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে। ৫৯ নম্বর সিরিয়ালে ০১৭৫৭৫১২২৫৫ নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে। তারপরে ব্যবহার করা হয়েছে পরবর্তী সিরিয়াল নাম্বার ০১৭৫৭৫১২২৫৬, ২৫৭, ২৫৮, ২৫৯। এইভাবে ৫৮৭ নম্বর পর্যন্ত। এসব নাম্বারে ফোন করে দেখা যায়, এর সব নাম্বার ইউনিয়নের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ব্যবহার করছেন।
০১৭৫৭৫১২৫৮০ নাম্বার ব্যবহারকারী তারিক হোসেন জানান, তিনি যশোর শহরের ইজিবাইক চালান। তিনি সরকারি কোনো টাকার খবর জানেন না। এবং সাতক্ষীরার চাম্পাফুল ইউনিয়নে তার কোনো যাওয়া-আসা নাই।
০১৭৫৭৫১২৫৮৭ নম্বর ব্যবহারকারী কথা বলতে রাজি না হলেও ঠিকানা জানান কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলা অঞ্চলের। তিনি কোনো দিন সাতক্ষীরা জেলায় আসেননি বলে উল্লেখ করেন।
০১৭৫৭৫১২৩৭৪ নাম্বার ব্যবহারকারী জানান, তিনি একজন ব্যবসায়ী। ভোলা জেলায় বাড়ি। তিনি বলেন, 'আমার নাম্বারটি বন্ধ ছিল। সম্প্রতি আমি নাম্বারটি খুলেছি। তবে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না বা সাতক্ষীরা অঞ্চলের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নাই।'
০১৭৫৭৫১২২৫৮ নাম্বারটি ব্যবহার করছেন একজন নারী। তিনি কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা। ০১৭৫৭৫১২৪০১, ০১৭৫৭৫১২৫০২ নাম্বার ব্যবহারকারী উভয়ই ঢাকা জেলার বাসিন্দা। সাতক্ষীরা অঞ্চলের সাথে তাদের কোনো কানেকশন নাই।
স্থানীয়রা বলছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ব্যাপক সংকটে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই প্রধানমন্ত্রী নগদ টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ধরনের অনিয়মের কারণে বঞ্চিত হয়েছেন অনেক অসহায় মানুষ। গুরুত্বপূর্ণ এই কাজে অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
স্থানীয়দের ধারণা, ইউনিয়ন পরিষদের লোকজনই এ অনিয়মের সাথে জড়িত। না হলে একই সিরিজের মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে কালিগঞ্জের চাম্পাফুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক বলেন, 'তালিকা মোতাবেক প্রায় সকলে টাকা পেয়ে গেছে। দুই একজন নাম্বার ভুলের কারণে নাও পেতে পারেন।' অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'তালিকায় একই সিরিয়ালের নাম্বার ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নাই। যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে খোঁজ-খবর নিয়ে দেখবো।'
চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক উপজেলা কৃষকদলের সাবেক সভাপতি। পরে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হন।

আরও পড়ুন