সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

আপডেট: 08:07:50 18/07/2021



img

কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: ঝিনাইদহ-৩ আসনের সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নাম করে অগণিত মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
টাকা ফেরতের দাবিতে রোববার বেলা ১১টার দিকে 'ভুক্তভোগী পরিবার'-এর ব্যানারে কোটচাঁদপুর উপজেলা চত্বরে মানববন্ধন হয়েছে।  
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০১৪ সালে নবী নেওয়াজ ঝিনাইদহ-৩ আসনে (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। সে সময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরীর চাকরির প্রলোভন দেখান এমপি। তার প্রলোভনে চুক্তি অনুযায়ী জমি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এমপির কথামতো তার স্বজনদের হাতে নগদ টাকা তুলে দেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও তাদের চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত পাননি। 
কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর- এই দুই উপজেলায় কয়েক বছর বিষয়টি চাউর থাকলেও গত ১০-১২ দিন ধরে ভুক্তভোগীরা নড়েচড়ে বসেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর অভিযোগপত্র দেওয়া ছাড়াও অভিযোগের ফটোকপি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন।  
অভিযোগ হাতে পেয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে সুবর্ণভূমি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে চাকরির নামে টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মেলে; যা এ প্রতিবেদকের সংরক্ষণে রয়েছে। এতদিন জমি হারিয়ে অনেকে অন্যের জমিতে কামলা খেটে বা বহু কষ্টে কিস্তির টাকা দিয়ে গেলেও করোনার দুঃসময়ে তারা খুবই অসহায় অবস্থায় রয়েছেন।
ভুক্তভোগী কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের ধোপাবিলা গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ৮৪ বছর বয়স্ক শুকুর আলী মাস্টারের ছেলে আহসানুল হক সাবু সুবর্ণভূমিকে বলেন, '২০১৫ সালে আমাকে নৈশপ্রহরীর চাকরি দেওয়ার কথা বলেন সাবেক এমপি নবি নেওয়াজের আত্মীয় মহেশপুর উপজেলার আলামপুর গ্রামের মান্নান। তার মাধ্যমে ছয় লাখ ২০ হাজার টাকা নেন সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ।'
তিনি দাবি করেন, মান্নানের সাথে ঢাকা গিয়ে ন্যাম ভবনে (সংসদ সদস্যদের আবাসস্থল) এমপির হাতে টাকা দেন তিনি।
তিনি বলেন, 'এমপি টাকা তার স্ত্রীর হাতে দিয়ে আলমারিতে তুলে রাখতে বলেন। আমার সে চাকরি তো হয়ইনি বরং টাকা চাওয়ায় নবী নেওয়াজ তার আত্মীয় মান্নান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে ও আমার শ্বশুরকে মারধর করেছে। এমনকী পুলিশ দিয়ে একাধিকবার হয়রানিও করিয়েছে।' কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন ভুক্তভোগী সাবু।
কোটচাঁদপুর উপজেলার ফাজিলপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম সরদার বলেন, 'আমার এতিম ভাইপো রুহুল আমিনকে খুব ছোটবেলা থেকে আমি বড় করেছি। সার্কুলার দেখে এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রুহুল আমিনের চাকরির জন্য সে সময় এমপি নবী নেওয়াজের সাথে যোগাযোগ করি। তিনি আশ্বাস দিয়ে দরখাস্ত করতে বলেন। সেইসময় ওখানে (এমপি নবী নেওয়াজের মহেশপুরের গ্রামের বাড়ি) উপস্থিত প্রতিবেশী পাতানো ভাগ্নে আতিয়ার রহমানের কাছে টাকা লেনদেনের পরামর্শ দেন তিনি। ভাইপোর এক বিঘা ও আমার দশ কাঠা জমি বিক্রি এবং এনজিও থেকে লোন নিয়ে পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার টাকা যোগাড় করে কোটচাঁদপুর কলেজস্ট্যান্ডের সিরাজুল ইসলামের বাসায় আতিয়ার রহমানের হাতে তুলে দিই। তখন এলাকার বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সার্কুলারটা স্থগিত হয়ে যায়। পরে টাকা ফেরত দিতে টালবাহানা করে এমপি নবী নেওয়াজ। পরবর্তী নির্বাচনে নবী নেওয়াজ আর দলীয় মনোনয়ন পাননি। ফলে তিনি আর এমপি-ও থাকেননি। পরে মহেশপুরের কাদবিলা গ্রামে এক শালিস-বৈঠকে বাধ্য হয়ে আতিয়ার পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার টাকার একটি চেক দেন। বেসিক ব্যাংকের চেক নম্বর ০২০৯২০১৯ । কিন্তু তারিখ অনুযায়ী চেকটি ব্যাংকে জমা দিলেও অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি পাশ হয়নি। পরে আবারও শালিসে ডিডের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা নগদ ফেরত দেন তারা। এরপর থেকে বাকি টাকা নিয়ে টালবাহানা করছে। বর্তমানে আমার ভাইপো জমি হারিয়ে পরের জমিতে কামলা দিচ্ছে।'
তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'পরে জানতে পেরেছি একটি পদে একাধিক আওয়ামী পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক এমপি নবি নেওয়াজ ও তার স্বজনরা।'
এদিকে অভিযুক্ত আতিয়ার নিজেই এ প্রতিবেদকের কাছে মোবাইল ফোনে বলেন, টাকা সাবেক এমপি নবি নেওয়াজ নেননি। টাকা তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে টাকা ফেরত দিয়েছেন। তার দাবি, এমপি নিজে যে টাকা নিয়েছিলেন, তাদের সবারই চাকরি দিয়েছেন।
বিষয়টি জানতে চাইলে বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট শফিকুল আজম খান চঞ্চল বলেন, 'এ ধরনের একাধিক অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। তিনি তো সাবেক এমপি, আমি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি না। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতারা দেখবেন।'
কোটচাঁদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি শাহাজাহান আলী বলেন, 'নবী নেওয়াজ এমপি থাকা অবস্থায় চাকরির দেওয়ার কথা বলে গণহারে টাকা নেওয়াসহ অন্যান্য অপকর্মের কথা জেলা মিটিংয়ে তুলে ধরেছিলাম। সেখানে জেলা নেতৃবৃন্দ ছাড়াও অনেক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।'
মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সেক্রেটারি, উপজেলা চেয়ারম্যান ময়জদ্দিন হামিদ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেন। বলেন, গরিব অসহায় পরিবারদের সাথে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। এর একটা সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ বলেন, 'আমি টাকা নিইনি। রাজনৈতিকভাবে আমাকে হেয় করতে প্রতিপক্ষ একটি মহল এসব অপপ্রচার করছে।'  

আরও পড়ুন