সুন্দরবন অঞ্চলের হাজারো জেলে পরিবার দুর্দশায়

আপডেট: 10:10:48 29/10/2019



img

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : সুন্দরবনে প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত জেলেদের জীবনে চরম দুঃসময় ভর করেছে। রোজগার না থাকায় বেকার হয়ে পড়া জেলেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। মুষ্টিমেয় জেলে চড়াসুদে মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ আর দাদনের অগ্রীম টাকায় দিন পার করলেও অধিকাংশেরই পরিবারে চলছে হাহাকার।
আইলার পর থেকে এলাকাজুড়ে কর্মসংস্থান সংকটের তীব্রতায় আপদকালীন এ সময়ে তারা বিকল্প কোনো কাজও পাচ্ছে না। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদের প্রায় দশ হাজার জেলে পরিবারে দুর্দিন নেমে এসেছে।
সুন্দরবন-সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলবর্তী গাবুরা, কৈখালী, মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রের দেখা মিলেছে। জেলেদের দাবি, ইলিশের প্রজনন মৌসুমের কারণে নদ-নদীতে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার জেলেরা অন্য মাছ ও কাঁকড়া ধরেন। তীব্র লবণাক্ততার কারণে এতদাঞ্চলের নদীসমূহে ইলিশের দেখা মেলে না উল্লেখ করে তারা জানান, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলে পরিবারগুলোর জন্য সরকারঘোষিত প্রণোদনা সুবিধাও পাচ্ছেন না তারা।
সুন্দরবন তীরবর্তী মুন্সিগঞ্জের কদমতলা গ্রামের মো. ফজের আলী জানান, তিন সন্তান আর নির্ভরশীল বাবা-মা নিয়ে সাত সদস্যের সংসার তার। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নিষেধাজ্ঞার কারণে বনে যেতে না পারায় বাড়িতে চুলা জ¦লছে না তিন দিন ধরে। দোকান থেকে বাকিতে নিয়ে আসা চিড়া-মুড়ি খেয়ে সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন।
অসহায়ত্বের সুরে প্রায় একই কথা জানালেন সুন্দরবনের কোলে গড়ে ওঠা জনপদ গোলাখালী গ্রামের বাবুরাম আর কালিঞ্চির সুমিত মুন্ডাসহ স্থানীয় জেলেরা। ঋণ করে অনেকে পরিবারের সদস্যদের মুখে দুই বেলা দুই মুঠো খাবার যোগান দিতে সমর্থ হলেও অধিকাংশেরই দাবি, স্ত্রী সন্তান নিয়ে তারা অর্ধাহারে-অনাহারে রয়েছেন।
রাস্তার ওপর বসে জাল মেরামতে মনোযোগী দাতিনাখালী গ্রামের শোকর আলী ও আবু সালেহ বলেন, ইলিশ সংরক্ষণ ও বংশ বিস্তারের জন্য মাছ শিকার বন্ধ। কিন্তু ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িতরা সরকারি ঘোষণায় চাল পেলেও তারা সে সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ ইলিশের বংশ বিস্তারের কারণে তাদেরকে সুন্দরবন-সংলগ্ন নদ-নদীতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। পরিবার পরিজনের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে তারা দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়েছেন। পরবর্তীতে বনে যাওয়ার অনুমতি মিললে মালিকের বেঁধে দেওয়া দামেই তাদেরকে শিকার করা মাছ-কাঁকড়া তুলে দিতে হবে।
সুন্দরবন-সংলগ্ন নদ-নদীতে মাছ শিকারে বিধি-নিষেধ থাকায় অসংখ্য জেলে পরিবার-পরিজান নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করলেও অনেকে আবার কাজের সন্ধানে এলাকার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। মহাজনের চড়াসুদের ঋণ আর দাদন ব্যবসায়ী থেকে নেওয়া অগ্রীম টাকা পরিশোধ করার তাড়নায় ঢাকা-সংলগ্ন গাজীপুর এলাকার ইটের ভাটায় কাজ করতে যাচ্ছেন আবুজার ও ফরিদ হোসেন নামের দুই জেলে।
কদমতলা গ্রামের ওই দুই জেলের দাবি, অক্টোবরের শুরু থেকে নদীতে যাওয়ার অনুমতি না মেলায় রোজগার বন্ধ। তাই মহাজনের কাছ থেকে সুদে নেওয়া টাকায় পরিবারের খোরপোষ চলছে। সুদের হার বেশি হওয়াতে মাছ-কাঁকড়া ধরে দেনা থেকে মুক্তি মিলবে না ভেবে জাল-দড়া তুলে রেখে উত্তরে যাচ্ছেন।
একই অবস্থা গোলাখালী, মীরগাং, কৈখালী, কালিঞ্চি ও গাবুরাসহ বিস্তৃত এ উপকূলীয় জনপদের সমগ্র জেলেপল্লীতে অভিন্ন দৃশ্য। আয়-রোজগারের খাত বন্ধ থাকায় দিন এনে দিন খাওয়ায় অভ্যস্ত হাজার হাজার জেলে পরিবারে এখন যেন এক নীরব দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে।
জেলেদের অভিযোগ, ইতিপূর্বে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জুলাই-আগস্ট প্রায় দুই মাস নদীতে নামতে দেওয়া হয়নি। নুতন করে ইলিশের প্রজনন মৌসুমের কারণে আবার তারা তুলে রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের বন্ধের সময়ে সরকারি প্রণোদনা পেলেও এবার কোনো সাহায্য না মেলায় তাদের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে।
এবিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের কোবাদক স্টেশন অফিসার বেলাল হোসেন বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমের কারণে আপাতত তিন সপ্তাহের জন্য বনে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নভেম্বরের শুরু থেকে জেলেদের পুনরায় সুন্দরবন-সংলগ্ন নদ-নদীতে মাছ কাঁকড়া শিকারের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ফারুক হোসাইন জানান, পূর্বঘোষণা না দিয়ে আকস্মিকভাবে সুন্দরবন-সংলগ্ন নদ-নদীতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার ফলে জেলেরা কষ্ট পাচ্ছে। আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হলে জেলেরা প্রস্তুতি নিতে পারতেন। সরকারিভাবে আপাতত জেলেদের কোনো সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেই।

আরও পড়ুন