সুর কী

আপডেট: 09:47:25 22/07/2020



img

গোলাম মুরশিদ

‘সা রে গা মা পা ধা নি’— এই সাতটি হলো মূল স্বর। এগুলো নানা রকম করে সাজানো যায়। যেমন, সা রে গা; রে গা মা; সা রে মা পা। হারমোনিয়ামে বাজালে প্রত্যেকটা আলাদা শোনাবে। কিন্তু ঐটুকু দিয়ে একটা সুর হয় না। তার জন্যে আরও অন্তত একটি, কি দুটি স্বর প্রয়োজন। বেশির ভাগে নির্ভেজাল লোকসংগীতে আগে থাকতো চারটি, কি পাঁচটি স্বর। তবে বিদগ্ধ সুর হতে হলে পাঁচটি, ছটি অথবা সবগুলো – অর্থাৎ সাতটি স্বরই থাকতে হয়।
সা, রে, গা, মা ইত্যাদি সাতটি স্বরের কয়টি দিয়ে এবং কোনগুলো দিয়ে একটা সুর তৈরি হলো সেটার ওপর নির্ভর করে সুরটা কেমন শোনাবে। তা ছাড়া, কোন স্বরের পর কোন স্বর ব্যবহার করা হলো তার ওপরও নির্ভর করে যে, সুরটা কেমন শোনাবে। যেমন, সা রে গা মা পা ধা নি র্স – সরাসরি এভাবে সাজালে যেমন শোনাবে, আর সা রে মা পা গা মা পা নি ধা র্সা— এভাবে সাজালে আদৌ তেমন শোনাবে না।
এভাবে স্বরগুলো নানা রকম সাজালে যেসব সুর তৈরি হয়, সেগুলোকে বলা হয় রাগ অথবা রাগিণী। নাম দিয়েই সুরটাকে চেনা যায়। একজন যখন বলে, এই সুরটা হলো ‘ভৈরবী’, তখন বোঝা যাবে যে, সুরটার মধ্যে সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি – সাতটি স্বরই আছে। তবে রে, গা, ধা, নি – এই স্বর চারটা ‘শুদ্ধ’ থাকবে না, ‘কোমল’ হবে; অর্থাৎ একটু নীচুতে থাকবে। যাঁরা সুরকার, তাঁরা কেবল পুরোনো রাগরাগিণী দিয়ে সুর সৃষ্টি করেন না, নতুন নতুন রাগরাগিণী বানিয়েও নিতে পারেন। তা ছাড়া, একাধিক রাগিণী মিশিয়েও নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করা হয়।
কিন্তু আমি বাংলা গান নিয়ে লিখছি না; আমি লিখছি বাংলা গানের ইতিহাস।
বাংলা গানের বেলায় দেখা যায়, অনেক কাল আগে যতোগুলো রাগরাগিণী ছিলো, এখন রাগরাগিণীর সংখ্যা তার থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার কোনো কোনো রাগিণী চিরতরে লোপও পেয়েছে। কোনো কোনো সময়ে একটা গানের সুরে রাগরাগিণীর এমন মিশ্রণ ঘটে যে, তাকে তখন আর কোনো একটা অথবা দুটো রাগরাগিণীর নাম দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না।
বঙ্গভূমির আদিবাসীরা কী ধরনের গান গাইতো, তাদের সুর, তাল এবং তাদের বাদ্যযন্ত্র পরবর্তী কালে কতোটা রক্ষা পেয়েছে ঠিক করে বলার মতো তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে নেই। এমন কি, গোড়াতে বঙ্গদেশে-আসা আর্যরা কী ধরনের গান ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এসেছিলো, তারও নিদর্শন নেই। এই অঞ্চলের বৃষ্টিপ্রধান আবহাওয়া হয়তো তার একটা কারণ। কিন্তু আর্যদের ধর্ম স্থানীয় ধর্ম-বিশ্বাস এবং আচার-আচরণের সঙ্গে মিশে একটা নতুন রূপ নিয়েছে। বাইরে থেকে ইসলাম এবং খ্র্রিস্টধর্ম এসে আর-এক দফা পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আমাদের ভাষাও আদিবাসীদের ভাষার সঙ্গে মিশে নতুন ভাষায় পরিণত হয়েছে। সংগীতের ক্ষেত্রেও সেই বৈশিষ্ট্য দেখা দিয়েছিলো বলে মনে করাই সংগত।
আর্যদের সংগীতের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের সংগীতের কতোটা সংযোগ এবং সমন্বয় ঘটেছিলো, তা জানা যায় না। এই মিশ্রণের ফলে কী কী রাগরাগিণীর জন্ম হয়েছিলো, তার কথাও বিস্তারিত জানা যায় না। তবে ‘বঙ্গাল’ এবং ‘ভাটিয়ালে’র মতো রাগিণীর নাম থেকে একটা জিনিশ বোঝা যায়— এই নামের স্থানীয় সুরের সঙ্গে আর্যদের সুরের মিশ্রণের ফলে এই রাগিণী দুটো তৈরি হয়েছিলো। এমন কি, এখনও অনেকগুলো রাগরাগিণীর নামের সঙ্গে ‘গৌড়’ শব্দটি যুক্ত দেখা যায়। যেমন, গৌড়মল্লার ও গৌড়সারঙ। এ থেকেও বোঝা যায় যে, এগুলো হলো মূল সুরের বঙ্গীয় সংস্করণ। মনে রাখা দরকার, বঙ্গদেশ হলো ভারতবর্ষের একেবারে পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। সেই প্রান্তে পৌঁছে আর্যদের সুরগুলো তাদের মূল রূপ বজায় রাখতে পেরেছিলো কিনা, সন্দেহ হয়।
দূর অতীতে যেসব রাগরাগিণী ছিলো, তার সুর কেমন ছিলো, তা জানার উপায় নেই। কারণ আমাদের দেশে তখন সুর লিখে রাখার কোনো পদ্ধতি ছিলো না। রেকর্ড করে রাখার ব্যবস্থা তো ছিলোই না। তাই মনে করা যেতে পারে যে, নামের মিল থাকা সত্ত্বেও, এখনকার সুরের সঙ্গে আদি সুরগুলোর মিল সামান্যই থাকতে পারে, অথবা হয়তো আদৌ কোনো মিল নেই। সেকালের বেশির ভাগ গানের কথাগুলোও লোপ পেয়েছে, অথবা সেগুলোর মূল চেহারা বজায় নেই। এ অবস্থায় বাংলা গানের ইতিহাস লেখা একেবারে অসাধ্য কাজ না-হলেও, দুঃসাধ্য কাজ।
কাজটা কঠিন হবার আরও একটা কারণ আছে – সেটা বাংলা ভাষার জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিলো কখন? তার নমুনাই বা পাই কোথায়? এর সহজ একটা উত্তর অনেকের জানা আছে – ‘চর্যাপদ’। বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিলো চর্যাপদ রচিত হওয়ার কালে। চর্যাপদ হলো বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের রচিত কতোগুলো গান। এই ধর্মগুরুদের বলা হয় সিদ্ধাচার্য। এখন আমরা যাকে বঙ্গদেশ বলে জানি (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা), সেই বঙ্গভূমিতে এক কালে বৌদ্ধ জনসংখ্যার প্রাধান্য ছিলো। বেশির ভাগ লোকই বৌদ্ধধর্ম পালন করতো। বাকি সবাই ছিলো আদিবাসী, হিন্দু এবং জৈন। দেশটা তখন ছিলো নানা ভাগে বিভক্ত। যেমন, রাঢ়, বরেন্দ্র, বঙ্গ, সুহ্ম, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি। সেই সব রাজ্যের রাজারাও সম্ভবত বৌদ্ধ ছিলেন।
তারপর ১০৫০ সালের দিকে দক্ষিণ ভারত থেকে এক সেন রাজা এসে বঙ্গদেশের পশ্চিম অংশ দখল করে নেন। তাঁদের রাজ্যের সীমানা, বিশেষ করে পুব দিকে, কতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো, তা জানা যায় না। তারপর আরও পরিবর্তন হয় ১২০৪ সালে। সে বছর রাজা লক্ষ্মণসেনের কাছ থেকে ইখতিয়ারউদ্দীন বক্তিয়ার খিলজি নামে একজন তুর্কী সেনাপতি রাজ্য কেড়ে নেন। তাঁরও রাজ্য কতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো, তা জানার উপায় নেই। তবে এর দেড় শো বছর পরে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ সালে এখনকার বঙ্গভূমির বেশির ভাগটাই জয় করে নেন এবং তারপর নিজেকে ‘শাহে বাঙ্গালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের রাজা বলে ঘোষণা করেন।
আগে যে-চর্যাপদগুলোর কথা বলেছি, সেগুলো বৌদ্ধ, হিন্দু অথবা মুসলিম – কোন আমলে রচিত হয়, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। কিন্তু এগুলোর পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে নেপালের রাজ-দরবারে। সেই থেকে ধারণা করা হয় যে, সেন রাজাদের অথবা মুসলিম সুলতানদের অত্যাচারে বহু বৌদ্ধ নেপালে পালিয়ে গিয়েছিলো। পণ্ডিতদের মতে, যাবার সময়ে তারা চর্যাপদগুলি সঙ্গে নিয়ে যায়। এর সাত-আট শো বছর পরে নেপাল থেকে ১৯০৭ সালে এগুলোর পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে ১৯১৬ সালে হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা নামে প্রকাশিত।) কিন্তু এ গানগুলো ঠিক কখন রচিত হয় এবং তারপর ঠিক কখন লিপিবদ্ধ হয়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তা আবিষ্কার করতে পারেননি। তিনি অনুমান করেন, এগুলো প্রায় হাজার বছর আগে অর্থাৎ দশম শতকে রচিত হয়েছিলো। তিনি যে-পঞ্চাশটি চর্যাপদ আবিষ্কার করেছিলেন, তা বারোজন বৌদ্ধ ধর্মগুরুর রচনা।
কেউ কেউ (যেমন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ) মনে করেন যে, চর্যাপদগুলোর রচনা শুরু হয় সপ্তম শতাব্দী থেকে। কিন্তু অতো আগে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিলো, এ কথা কেউ স্বীকার করেন না। অন্য দিকে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, চর্যাপদের রচনা কাল দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী। তিনি চর্যার ভাষা বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আর, সুকুমার সেনের মতে, তেরো শতকের পরেও চর্যাপদ রচিত হয়েছে। তাঁর মতে, চর্যাপদ-রচয়িতাদের একজন – ভুসুকুপাদ – প্রায় ১৩০০ সাল অবধি বেঁচে ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘বঙ্গে’র লোক। আর-একজন রচয়িতা কাহ্নপাদ। কারও কারও মতে তিনি ওড়িষার বাসিন্দা ছিলেন। তার অর্থ যে-চর্যাগুলো পাওয়া গেছে, তা দুতিন শো বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে রচিত হয়েছে। তাও একটা এলাকায় নয়— দেশের বিভিন্ন জায়গায়। গানগুলো তখন ছিলো মৌখিক। পরে সেগুলো লিখিত হয় – বঙ্গদেশে, না নেপালে, তা জানা যায় না। কাজেই এই চর্যাগুলোর ভাষাকে বাংলা বলে আখ্যায়িত করা যুক্তিসংগত কিনা, সে প্রশ্ন করা যেতে পারে। নীচে একটি চর্যা থেকে দুটি পংক্তি উদ্ধৃত করে দেখা যাক, তা বাংলা ভাষায় রচিত কিনা— কাহ্নপাদের:
আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা
তা দেখি কাহ্ন বিমন ভইলা
এখানে নটি শব্দের মধ্যে ‘বাট’ (পথ), ‘তা’ এবং ‘দেখি’ – এই তিনটি শব্দকে আমরা বাংলা বলে চিনতে পারি। ‘বিমন’ বাংলা না-হলেও শব্দটার অর্থ অনুমান করা যায়। কিন্তু বাকি শব্দগুলো আদৌ বাংলা নয়। বস্তুত, চর্যাপদের ভাষাকে পুরোপুরি বাংলা অথবা ওড়িয়া অথবা অসমীয়া – কোনোটাই বলা যায় না। রীতিমতো বাংলা হয়ে ওঠার আগে এ অঞ্চলে যে-ভাষা ছিলো, সেই ভাষায় চর্যাগুলো রচিত হয়েছিলো। ওপরের দুই পংক্তির অনুবাদ করেছেন সুকুমার সেন:
আজ কাল পথ রুদ্ধ করলো / তা দেখে কাহ্ন উন্মনা হলেন।
দেখা যাচ্ছে, যে-ভাষায় চর্যাপদ রচিত হয়েছিলো, তার সঙ্গে বাংলা ভাষার কিছু মিল আছে, কিন্তু তাই বলে একে দস্তুরমতো বাংলা বলা যায় না। পণ্ডিতদের মতে, সে ভাষা ষোলো-আনা বাংলা হয়ে ওঠার আগে যে-ভাষা ছিলো – প্রোটো-বেঙ্গলি বা বাংলা ভাষার ভ্রূণ, চর্যা রচিত হয়েছিলো সেই ভাষায়।
কিন্তু ভাষা যাই হোক, প্রশ্ন হচ্ছে: চর্যাপদ যে গান, তা বোঝা গেলো কী করে?
বংশানুক্রমিকভাবে নেপালের বৌদ্ধ ভিখারিরা চর্যাপদগুলোর কোনো কোনোটা গেয়ে বেড়াতো। এ থেকে বোঝা যায় যে, এগুলো আদিতে গানই ছিলো। তা ছাড়া, চর্যার পাণ্ডুলিপিতে প্রতিটি চর্যার ওপরে একটা করে রাগরাগিণীর নাম লেখা আছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, এগুলো গান এবং এগুলো গাইবার জন্যে রচিত হয়েছিলো। আরও বোঝা যায় যে, এ গান সমাজের এমন স্তরের মানুষের জন্যে, যে-স্তরের লোকেরা শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করতো। এগুলো সমাজের সেই স্তরের নয়, যে-স্তরের মানুষ কোনো শিক্ষা ছাড়াই মনের আনন্দে এক ধরনের ‘গান’ গায় – যে-গানে শাস্ত্রীয় সংগীতের বৈদগ্ধ্য থাকে না, এবং যে-গানকে আমরা এখনকার ভাষায় বলতে পারি, লোকগীতি বা সাধারণ মানুষের গান।
আমরা যদি চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা ভাষা বলে স্বীকার করে নিই, তা হলে বলতে পারি যে, দশম শতক থেকে তেরো শতকের মধ্যে বঙ্গীয় সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশে শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা হতো। কিন্তু তখনকার বৃহত্তর সমাজের লোকেরা গান গাইতো কি? গাইলে কী গান গাইতো? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। হয়তো গাইতো যাকে লোকসংগীত বলতে পারি। সেই সংগীত যা ‘লোকেরা’ অর্থাৎ সাধারণ লোকেরা সবাই মিলে অথবা আপন মনে গাইতো। যে-গান প্রচলিত ছিলো মুখে মুখে। যার কোনো বাঁধা-ধরা সুর ছিলো না। যা প্রচলিত ছিলো এক-একটা অঞ্চলে, সারা দেশে নয়।
[বিডিনিউজ থেকে]