সুশীল এনজিও গণমাধ্যমের কণ্ঠ নমনীয় কেন

আপডেট: 08:53:46 04/12/2020



img

রাকিব হাসনাত

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা এবং নারী অধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে দীর্ঘকাল ধরেই সোচ্চার ছিল সুশীল সমাজ, আর্থ-সামাজিক খাতে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা অর্থাৎ এনজিও এবং গণমাধ্যম। রাজনৈতিক দল এমনকি সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতেও তাদের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে নানা সময়ে। কিন্তু সিভিল সোসাইটি, এনজিও ও গণমাধ্যমের সেই 'শক্তিশালী কণ্ঠ' ক্রমশ ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশে প্রবল রাজনৈতিক সহিংসতার জের ধরে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসার আগের কয়েক বছরে নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আন্দোলনের ব্যানারে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে বেশ সংঘবদ্ধ হয়ে উঠেছিল সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের একটি অংশ, যার সঙ্গে ছিল ঢাকার প্রভাবশালী দুটি সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এবং একটি বেসরকারি সংস্থা সিপিডি আর টেলিভিশন চ্যানেল আই।
তারও আগে বিশেষ করে ৮০ ও ৯০-এর দশকে দেশের পেশাভিত্তিক বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা ইস্যুতে যে দলবদ্ধ বক্তব্য বা বিবৃতি দিতেন তা আলোচনার ঝড় তুলতো।
আবার ৯০-এ জেনারেল এরশাদের পতনের পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মোট তিনটি আমলেই গণমাধ্যমকেও নানা অনিয়ম দুর্নীতি বের করতে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। জোটবদ্ধ থেকে শক্তি দেখিয়ে জনস্বার্থে কথা বলেছে এনজিও খাতও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং পেশায় উন্নয়ন কর্মী সানজিদা খানের অভিযোগ, গত প্রায় এক দশক ধরে সিভিল সোসাইটি, এনজিও কিংবা গণমাধ্যমের সেই ভূমিকা আর দেখা যায় না।
"আমাদের দেশে জাতীয় পর্যায়ের সুশীল সমাজ জাতীয় ইস্যুতে সোচ্চার থাকতেন। তারা যখন সোচ্চার হতেন সেটি আবার ঠিকভাবেই মিডিয়াতেই প্রতিফলিত হতো। কিন্তু এখন সুশীল সমাজকে সেই ভূমিকায় দেখা যায়। তাদের সেই ভূমিকা এখন কোথায়? কেন তাদের কণ্ঠ আগের মতো নেই? আগে জাতীয় ইস্যুতে সুশীল সমাজ, এনজিও ও মিডিয়া একযোগে কথা বলতো। কেন এখন তাদের কণ্ঠ শোনা যায় না।"
সানজিদা খান বলছেন, ৯০-এর দশকের শুরুতে দিনাজপুরে এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল সুশীল সমাজ, এনজিও ও গণমাধ্যম মিলেই। কিন্তু এখন এমন অনেক ঘটনাতেই এমনকি কোনো বিবৃতিও দেখা যায় না।
মূলত এ অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলেই সাংস্কৃতিক বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এর ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই গড়ে ওঠে পেশাভিত্তিক নানা সংগঠন।
বাস্তবতা হলো, এখন অনেক ঘটনায় সিভিল সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বরং খুব একটা দৃষ্টি দিতে চান না বলেও অভিযোগ ওঠে। আবার যারা কথা বলার চেষ্টা করেন, তাদের অনেককে সংগঠিত আক্রমণের মুখে থাকতে হয় রাজনৈতিক মঞ্চ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বলছেন সানজিদা খান।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলছেন, বাংলাদেশে সেই অর্থে সিভিল সোসাইটি কখনো তৈরিই হয়নি বরং সামরিক শাসনের অবসানের পর রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়ে সুশীল সমাজের অধিকাংশ ব্যক্তির রাজনৈতিক চরিত্র যেমন পরিষ্কার হয়ে গেছে, তেমনি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো নানা আইন ও কালাকানুনে চুপসে গেছে গণমাধ্যম আর সংকুচিত হয়েছে এনজিওগুলোর জাতীয় স্বার্থে কথা বলার সুযোগ।
"বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি দলবাজিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। এখন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা বিবৃতি- এগুলো তরুণরা পড়তেও চায় না। ক্রেডিবিলিটি চলে গেছে। এর বড় কারণ হলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে কোনোদিনই তেমন করে পরিচর্যা করা হয়নি"।
অথচ এ ভূখণ্ডে প্রবল রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও সোচ্চার হওয়ার অনেক উদাহরণ আছে প্রথমে পাকিস্তান ও পরে স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক শাসনের সময়েও। এমনকি সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ, এনজিও এবং গণমাধ্যম- বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে কখনো আলোচনা, কখনো সমালোচনা কিংবা কখনো আবার রাজনীতির গতি প্রকৃতির মোড় ঘুরানোর অনুঘটক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে অনেকের কাছে।
অথচ এখন অনেক বিষয়েই কথা বলতেই অনাগ্রহ দেখান সিভিল সোসাইটি এমনকি গণমাধ্যমের একটি অংশও। ঢাকায় সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য তৈরির বিরোধিতা করে ইসলামপন্থীদের বক্তব্যের পর সরকারি দলের তরফ থেকে কোনো কথা না আসা পর্যন্ত মুখ খোলেননি সিভিল সোসাইটির বড় একটি অংশ।
যদিও দিলারা চৌধুরী বলছেন, পাকিস্তান আমলে মানুষ কথা বলতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, যেটি এখন কঠিন। সে সময় পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় নিয়েও আলোচনার ঝড় হতো, কিন্তু এখন তেমন অবস্থান নিয়ে কোনো সংবাদপত্র টিকতে পারবে কি-না সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
"যদিও আইয়ুব খান একজন সামরিক একনায়ক ছিল, কিন্তু সে সময় লোকের কথার সাহস ছিল। মানুষ কথা বলতো। সেজন্য খুব মূল্য দিতে হতো, তা নয়। কিন্তু যে ধরনের বাধা-বিপত্তি, ভয়-ভীতি ও আইন-কানুন এখন তৈরি হয়েছে, সেখানে সিভিল সোসাইটির অস্তিত্ব বলতে কিছু আছে বলে আর মনে হয় না।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকেই বলেন, জেনারেল এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সরকারগুলোর সময়ে ক্রমশ দলীয় বিভক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনেকে নিজেরাই পছন্দনীয় দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিলীন হয়ে গেছেন।
আবার ৮০ ও ৯০-এর দশকে বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছিল বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও খাত। এনজিওদের সংগঠন ‘অ্যাডাব’ বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠে জাতীয় নানা ইস্যুতে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল শক্তভাবেই। যদিও পরে বিভক্তির জোয়ারে ভেঙে যায় সেটিও।
উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবির বলছেন, নানা আইন-কানুন কিংবা বিধিবলে এনজিও কার্যক্রম অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। তারপরেও অনেক সংস্থাই জনস্বার্থে কথা বলার চেষ্টা করছেন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, "বিরোধীদলগুলো কোণঠাসা। তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না। ছাত্র সংগঠনগুলো একপেশে। পার্লামেন্ট রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সে কারণেই অনেকে মনে করেন, কথা বললে সমস্যা হতে পারে। অনেকে গুম হচ্ছে। জেল হচ্ছে। জামিন হচ্ছে না। এনজিওর রেজিস্ট্রেশন আটকে রাখা হচ্ছে। সার্বিকভাবে সব সেক্টরেই প্রভাব পড়েছে। কয়েকটি পত্রিকা লেখে, তবে অধিকাংশ পত্রিকাই সেলফ সেন্সরশিপ করে।"
আবার একটি গোষ্ঠী রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে দলগুলোর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বিরাট জনগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হয়েছেন, ফলে সিভিল সোসাইটির একটি অংশের বিরুদ্ধে বিরাজনীতিকরণের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই।
খুশি কবির বলেন, এসব কারণেই মূলত এখন সিভিল সোসাইটি, এনজিও বা গণমাধ্যমের ভূমিকায় অনেকে খুশি নন। আর এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় বিভাজন এতো প্রকট হয়ে উঠেছে যে, নিজস্ব পরিমণ্ডলেই তারা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।
যদিও এক দশক আগেও এনজিও ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও প্রয়াত ফজলে হাসান আবেদের মতো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বরা দারুণ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। তবে কিছু এনজিওর মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা তৈরি হওয়ায় এনজিও খাতের ভূমিকা নিয়ে পাল্টা প্রশ্নও উঠেছিল ২০০৫ সালের দিকে।
অন্যদিকে গণমাধ্যমগুলোর রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে এবং এ ধারাতেই ভাগ হয়ে গেছে সব খাতের পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলো। বাংলাদেশের সাংবাদিক ইউনিয়নের সরকার সমর্থক অংশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একজন মনজুরুল আহসান বুলবুল বলছেন, রাজনীতি আর পেশাদারিত্বকে গুলিয়ে ফেলার কারণেই মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
"সাংবাদিকরা যে রাজনীতি করতো না তা নয়। অনেক বিখ্যাত সাংবাদিক দলীয় রাজনীতিও করতেন। কিন্তু তারা রাজনীতির সাথে সাংবাদিকতাকে মিলিয়ে ফেলতেন না বলে মানুষ বিভ্রান্ত হতো না। তবে এখন রাজনীতি আর সাংবাদিকতাকে গুলিয়ে ফেলায় বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়েছে," বলছেন মনজুরুল আহসান বুলবুল।
তবে এরপরেও মূলধারার গণমাধ্যম এখনো পুরোপুরি আস্থা হারায়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, সময় ও প্রেক্ষাপটকেও বিবেচনা নিয়ে হয়তো অনেকে পরিবেশনার ধরন পাল্টিয়েছে।
আবার এটিও সত্যি যে, সুশীল সমাজ, এনজিও ও গণমাধ্যম এক দশকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল থেকে তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছে ধারাবাহিকভাবে, বলছেন তিনি।
বেসরকারি সংস্থা হিসেবে টিআইবি বা সুশাসনের জন্য নাগরিকের মতো সংগঠনগুলো মাঝে মধ্যে বিশেষ কিছু ইস্যুতে সরব হলেও এবং তা মাঝে মধ্যে আলোচনায় এলেও সেটি কর্তৃপক্ষের ওপরে প্রবল চাপ তৈরির ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
কিন্তু কেন সিভিল সোসাইটি বা গণমাধ্যম এমন গুরুত্বহীন হয়ে উঠলো- এমন প্রশ্নের জবাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলছেন, রাজনৈতিক বিভক্তি ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী শাসন- দুটি মিলেমিশে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে ক্রমবিকাশমান সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমকে।
তিনি বলেন, মূলত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা থেকে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকে চাপে ফেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। সরকার নিজেরা রাজনীতিকে সংকুচিত করে সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে বিরাজনীতিকরণের চেষ্টার অভিযোগ তুলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
"বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে আমরা বিএনপি বা আওয়ামী লীগের অনুগত সিভিল সোসাইটি করেছি। আমরা যারা নিরপেক্ষভাবে কথা বলার চেষ্টা করি তাদেরও বিভিন্নভাবে চিত্রিত করে অপপ্রচার করেছে।
''৯০-তে সাংবাদিক, এনজিও, চিকিৎসক কেউ তো বিভক্ত ছিল না। এখন সব বিভক্ত করে দিয়েছেন। সিভিল সোসাইটি তো দুর্বল হবেই। সাথে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-সহ নানা আইন-কানুন করে সব সংকুচিত করেছেন। রাজনীতিতে অপরাধী কর্মকাণ্ডে পরিণত করা হয়েছে," বলছেন বদিউল আলম মজুমদার।
আর সুশীল সমাজ কিংবা গণমাধ্যমের এমন দুর্বল হওয়ার সুদূরপ্রসারী প্রভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামো বা প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো দুর্বল হলে তা উগ্রপন্থার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ তৈরি করে এবং আজকের বাংলাদেশকে সেটিরই প্রতিচ্ছবি মনে করছেন অনেকে।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন